চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গণতন্ত্রের পুস্তকে বালিশ চাপা দিয়ে মার্ক্সবাদের চর্চা

শেখ হাসিনা গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সেরে দেশে ফিরেই বড় একটা মন্তব্য ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। তা ছিল: “বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের মাথাব্যথা নেই, তারা দেখতে চান বাংলাদেশের উন্নয়ন।” এ নিয়ে আমাদের মিডিয়ায় মোটেও তোলপাড় সৃষ্টি হয়নি। কারো ঘাড়েই দুটো মাথা গজায়নি যে তারা প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করবেন, তিনি আসলে তার এ মন্তব্যে কি বুঝাতে চেয়েছেন?

বিজ্ঞাপন

দিন গড়াচ্ছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যাত্রা আরো স্পষ্ট হচ্ছে। তাই উন্নয়নের সূত্র নিয়ে এখন বেশ শোরগোল শুরু হয়েছে। আজ দেখলাম আকাশ ভাইয়ের একটি লেখায় রীতিমত আওয়ামী লীগকে ব্ল্যাঙ্ক চেক দেয়া হয়ে গেছে। আমি আকাশ ভাইয়ের মেধা ও যোগ্যতা নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় রাখি না। তবে ফেসবুকের কল্যাণে মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবীদের লেখা এখন আরো সুখপাঠ্য। মার্ক্সবাদকে দেশীয় উপযোগী করতে যেয়ে গত একশ বছর এই উপমহাদেশে, কিংবা বিশ্ব পরিমণ্ডলে হিসাব-নিকাশ এবং গবেষণা কম হয়নি। আমাদের দেশেও গণতন্ত্রের পুস্তকে বালিশ চাপা দিয়ে মার্ক্সবাদের চর্চা হয়েছে! ফলে একসময় তথাকথিত মার্ক্সবাদীদেরও ব্যর্থ মনোরথে বলতে হয়েছে, “হারামজাদা জনগণ, আমরা গেলাম সুন্দরবন”!

আকাশ ভাই তার এতোকালের সাধনা উৎরে বেশ যুতসই করে বলছেন, “পৃথিবীতে খারাপ ও ভালো আছে, আবার খারাপের মধ্যে ভালো ও ভালোর মধ্যে খারাপ আছে। ভালোকে তাই সব সময়ে বিনয়ের সঙ্গে ভাবতে হয়_ আমি ভালো কিন্তু আরও ভালো কীভাবে হতে পারি এবং আত্মসমালোচনাকে বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করে নিতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে খারাপের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময় তার ভালো দিকগুলোর কথাও ভাবতে হয়, কীভাবে খারাপের খারাপ দিকটাকে পরাজিত করতে হয় সেই কৌশল খুঁজে বের করতে হয়।”

কথাগুলো মন্দ নয়। কিন্তু গণতন্ত্রে চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের জন্য যে বিরোধীদলের উপস্থিতি অপরিহার্য, তা কি আমরা এতো সহজে ভুলে যাব? আজ যদি আমরা একটি কার্যকর মেধানির্ভর, উন্নয়নবান্ধব তরুণ প্রজন্মের চাহিদা উপযোগী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হই, তবে বর্তমানের ভাঙ্গাচোরা গণতন্ত্রও একসময় মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য! সব উন্নয়ন কর্মসূচি লোক দেখানো কর্মসূচিতে পরিণত হতে বাধ্য হবে, এবং দেশ দীর্ঘ মেয়াদী দুর্নীতির শিকলে বাঁধা পড়বে।

একটি সহজ প্রশ্ন করতে চাই। আমাদের জীবন যাত্রা উন্নত হয়েছে, মধ্যবিত্ত, নিম্ন বিত্তের আয় বেড়েছে, একই সঙ্গে বেড়েছে ক্রয় ক্ষমতা, সবটাই সত্য। কিন্তু আমরা কি দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পেরেছি? বরং দুর্নীতি উন্নয়নের সব আয়োজনে ভাগ বসাচ্ছে। মানুষের জীবন মান উন্নয়নের সঙ্গে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও পরিবেশের বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের রাজনীতিকরা কি নিজেরা উল্লেখিত বিসয়গুলোর উপর আস্থা রাখতে প্রস্তুত। নাকি এখনো নিজের সন্তানদের ইউরোপ-আমেরিকায় পড়াশুনার জন্য পাঠাতে পারলে স্বস্তিতে থাকেন, এখনো সামান্য চোখের চিকিৎসায় দৌড় দেন সিঙ্গাপুরে? আমাদের রাজনীতিকরা, এমনকি প্রধানমন্ত্রীও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো একটি শব্দ উচ্চারণ করেন না। অথচ সাধারণ মানুষ ভূমি অফিস থেকে শুরু করে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইন-আদালত সর্বত্র হিংস্র দালাল-বাটপারের চক্করে পড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে!

আমাদের প্রয়োজন একটি দেশপ্রেমিক মেধাবী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। যারা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকতা দেবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবে। দেশের তরুণ ও যুব সমাজের মধ্যে সেই শক্তির সম্ভাবনা আছে। আমাদের সেই তরুণ প্রজন্ম আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি-জামাত কোনো পক্ষকেই নিজেদের পছন্দের শক্তি হিসেবে মনে করে না।

বিজ্ঞাপন

অমর্ত্য সেনের সেই বিখ্যাত কথাগুলো যেন আমরা ভুলে না যাই। ঢাকার এক সমাবেশে দাঁড়িয়েই তিনি বলেছিলেন- “There may be limitations in all political settings but discussion and debate are essential to overcome those in any democratic country. Journalists should have a better focus on human and development issues that go undermined, such as child trafficking experienced mostly by the poorer segment of the society.” (রাজনৈতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশকে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমেই এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে হবে। মানবিক ও উন্নয়নের বিষয়গুলোতে সাংবাদিকদেরও বড় ভূমিকা আছে, বিশেষত সমাজের উপেক্ষিত অংশের পক্ষে কথা বলার।)

সময়ের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের রাজনীতি ও মিডিয়ার এই আত্মজিজ্ঞাসার প্রয়োজন আছে।

সৌভাগ্য বশত অমর্ত্য সেন নোবেল পেয়েছিলেন ১৯৯৮ সালে, সোভিয়েত রাশিয়া ভাঙ্গনের পর। তা না হলে তাকেও সাম্রাজ্যবাদের দোসর উপাধি পেয়ে শ্রোতার আসনে বসতে হতো। আর সে সব সভায় একমাত্র বক্তা হতেন হালের মার্ক্সবাদীরা!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের
নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে
প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View