চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

খোকার ছেলে ইশরাকের প্রশ্ন ও একজন আবি আলী

বিএনপির প্রয়াত নেতা মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশের অন্যতম অভিভাবক উল্লেখ করে দেশের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। গত ৭ নভেম্বর দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাদেক হোসেন খোকার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠানে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়ে কিছু বলতে চাই। বাংলাদেশে প্রতিহিংসার যে রাজনীতি চর্চা, তার ভুক্তভোগী আমার বাবা, আমার পরিবার। বাবার সঙ্গে গত পাঁচ বছর কাটিয়েছি। অনেক কিছু শিখেছি। তিনি বলতেন, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। এখানে আজকে যে হানাহানির রাজনীতি চলছে, এর জন্য বাবা মুক্তিযুদ্ধ করেননি। রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকবে, বহু রাজনৈতিক দল থাকবে, আমাদের লড়াই হবে ভোটের মাধ্যমে।’

ইশরাক আরও বলেছেন, ‘বাংলাদেশে দু’জন অভিভাবক আছেন—একজন খালেদা জিয়া, যিনি জেলে আছেন। আরেকজন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমি প্রশ্ন রাখতে চাই, আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়? আপানারা এর সমাধান করে দেন।’

বিজ্ঞাপন

ইশরাকের এই কথাগুলো তরুণ প্রজন্মের অনেকেরই মনের কথা। আমাদের দেশে চলমান হিংসা আর প্রতিশোধের রাজনীতি সত্যিই আমাদের ভবিষ্যৎকে উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। দেশে কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, হিংসা আর প্রতিশোধের রাজনীতি কারা চালু করল, কেন এখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সাধারণ মানুষের চোখে ‘ধুলো-পড়া’ দিয়ে ক্ষমতায় থাকার আরাধনা চলছে, এসব নিয়ে অনেক বিতর্ক হতে পারে। এজন্য বর্তমান ক্ষমতাসীনরা কতটুকু দায়ি, আর সাবেক ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট কতটা দায়ী, এটাও তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো দেশে এক ধরনের হিংসা আর প্রতিশোধের রাজনীতির চর্চা চলছে। ভবিষ্যতে তা কমবে-এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং ক্ষমতার বাইরে যারা আছেন, তাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে প্রায় সময়ই সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার স্পষ্ট হুমকি লক্ষ করা যায়। চিরদিন কেউ ক্ষমতায় থাকবে না। আজকের ক্ষমতাসীনরা এক সময় ক্ষমতাবলয়ের বাইরে যেতে পারেন। কিন্তু তাদের মধ্যে এই আশঙ্কা প্রবল হয় যে, ক্ষমতা হারালে তাদের জান-মাল ও পিঠের চামড়া থাকবে না, তাহলে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার জন্য তারা আরও মরিয়া হয়ে উঠবে। সেই লক্ষণ কিন্তু স্পষ্ট।
কিন্তু এটা কোনো গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজের আচরণ হতে পারে। রাজনীতিতে প্রতিশোধ ও হিংসার চর্চা চিরতরে বন্ধ হওয়া দরকার। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোকেই উদ্যোগী হতে হবে। এ জন্য ক্ষমতাসীনদের যেমন এগিয়ে আসতে হবে। ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোকেও ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে হবে। সকলে মিলে যদি হিংসা এবং প্রতিশোধের রাজনীতিকে কবর রচনার দৃঢ় অঙ্গীকার যদি ঘোষণা করা না হয়, তাহলে এক সময় হয়তো আমাদের দেশটিও রোয়ান্ডায় পরিণত হবে।

এ ব্যাপারে আমরা এ বছর শান্তিতে নোবেল জয়ী ইথিওপিয়া প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ আলীর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারি। পূর্ব আফ্রিকার এই দেশের মাটি দীর্ঘদিন ধরেই রক্তে ভেজা। দুর্নীতি, একনায়কতন্ত্র, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত-সংঘর্ষ, বাক স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ, সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর নিজেদের মধ্যে বিবাদ— এটাই ছিল ইথিওপিয়ার পরিচয়। দেশটি যখন গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, তখনই তার আবির্ভাব। তিনি ইথিওপিয়ায় ক্ষমতায় এসেই যেন জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় বদলে দিলেন সবকিছু। প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরেই রক্ষা পেয়েছিল আফ্রিকা মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশটি। ইথিওপিয়ার মানুষ আজ মনে করেন, আবি আহমেদ আলি আর কেউ নন, স্বয়ং ভগবানের দূত! তাদের রক্ষাকর্তা!

ইথিওপিয়ায় ৯০টিরও বেশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রয়েছে। সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো ছিল একটি অন্যটির সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত। দশকের পর দশক ইথিওপিয়ার রাজনীতি যে ঘূর্ণাবর্তে ছিল, তাতে এই বিভেদ আরও বেড়েছে। সামরিক একনায়ক মেঙ্গিস্টু হাইলে মারিয়াম সেই ১৯৭৪ সাল থেকে দেশে সেনা শাসন জারি করে রেখেছিলেন এবং ক্ষমতায় থাকাকালীন হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন। তার সময়ে দুর্ভিক্ষে কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষ মারা গিয়েছে। টাইগারি নৃ-গোষ্ঠী থেকে কিছু গেরিলা যোদ্ধা নিয়ে দ্য টাইগারিয়ান পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ) সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ শুরু করে।

বিজ্ঞাপন

টিপিএলএফের ক্ষমতা যখন দিন দিন বাড়ছিল, তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় দেশের বড় বড় নৃ-গোষ্ঠীগুলোকে তাদের দলে টানতে হবে। তাহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। ১৯৮৯ সালে টিপিএলএফ ওরোমো এবং আমরাহার মতো সবচেয়ে বড় দু’টি নৃ-গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট করে। জোটের নাম দেওয়া হয় ইথিওপিয়ান পিপলস রেভ্যুলুশনারি ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইপিআরডিএফ)। দেশের অস্থিরতা দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০১৮-র ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হাইলে মারিয়াম পদত্যাগ করেন। ১৮ মাসের মধ্যে দেশে দ্বিতীয়বারের মতো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়। একটা সময় অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, ওরোমো থেকে কেউ প্রধানমন্ত্রী না হলে গৃহযুদ্ধ নিশ্চিত। ইথিওপিয়ায় সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাম ‘ওরোমো’। দেশের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ মানুষই এই সম্প্রদায়ের। প্রধানমন্ত্রী আবিও এই সম্প্রদায়ের।

প্রধানমন্ত্রী আবি বিস্ময়করভাবে সব নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে সমান জনপ্রিয়। তার বাবা ছিলেন ওরোমো মুসলিম এবং মা ছিলেন খ্রিস্টান। তিনি ওরোমো, আমরাহা, টাইগারি ও ইংরেজি ভাষায় সমান পারদর্শী। ১৯৯০-এর দশকে আবি রুয়ান্ডায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর একজন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ইথিওপিয়ার সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি আইএনএসএর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন এবং দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ওরোমিয়া অঞ্চলের ডেপুটি প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন ৪৩ বছর বয়সি আবি আহমেদ। সেদিনের ঘটনা প্রসঙ্গে সংবাদসংস্থা বিবিসি বলছে, ‘বারাক ওবামার জয়ের পর এমন দৃশ্য আর কখনও দেখা যায়নি। ইথিওপিয়ার মানুষ কাঁদছে, কারণ এই প্রথম তারা আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। মানুষ অবশেষে তাদের মনের মতো একজন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে, সেই খুশিতে কাঁদছে। না দেখলে আপনি ভাবতেই পারবেন না।’
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আফ্রিকা মহাদেশের সর্বকনিষ্ঠ এই রাষ্ট্রনেতা খুব দ্রুততার সঙ্গে এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, যেগুলো দেশে-বিদেশে ইথিওপীয়দের মনে আশার সঞ্চার করেছে। ক্ষমতায় এসেই তিনি হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিয়েছেন। সেন্সরশিপের নামে বন্ধ থাকা শত শত ওয়েবসাইট চালু করেছেন। রাষ্ট্রের জরুরি অবস্থা তুলে নিয়েছেন। দেশের অর্থনীতি ও ইথিওপিয়ার রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করেছেন। প্রতিবেশী ইরিট্রিয়ার সঙ্গে ২০ বছর ধরে চলা যুদ্ধের ইতি টেনেছেন।

২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে আবি আহমেদ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথমেই সচেষ্ট হন ইরিট্রিয়ার সঙ্গে হিংসা অবসানে। একই সঙ্গে চলতে থাকে অর্থনৈতিক সংস্কারের কাজ। প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যে আবি আহমেদ দেখা করেন ইরিট্রিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান ইসআইআস আফওয়ের্কির সঙ্গে। শুরু হয় সীমান্ত সমস্যা নিয়ে মত বিনিময়। ২০১৮ সালের ৮ জুলাই আসমারায় গিয়ে প্রেসিডেন্ট আফওয়ের্কির সঙ্গে সাক্ষাতের একদিন আগে তিনি ঘোষণা করেন, ‘ইরিট্রিয়া এবং ইথিওপিয়ার মধ্যে আর কোনও সীমান্ত নেই, ভালোবাসার সেতু সীমান্ত ধ্বংস করে দিয়েছে।’ শান্তি চাইছিল ইরিট্রিয়াও। সদর্থক আলোচনার শেষে দুই দেশের প্রধান ৯ জুলাই একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। আবি আহমেদ বাদমে অঞ্চলকে ইরিট্রিয়ার হাতেই সমর্পণ করেন। স্থির হয়, দুই দেশের মানুষ, পণ্য ও অন্যান্য পরিষেবার জন্যে সীমান্ত খুলে দেবে উভয় পক্ষই। এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনেকটাই বদলে দিয়েছে দুই দেশের সম্পর্ক। ইরিট্রিয়ার সঙ্গে বছরের পর বছর যুদ্ধের কারণে এডেন উপসাগর এবং আরব সাগরের দিকে যাবার জন্য ইথিওপিয়াকে ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হচ্ছিল বাব আল-মানদাব প্রণালীর উপর অবস্থিত জিবৌতির উপর। শান্তি চুক্তির ফলে ইরিট্রিয়ার বন্দর ইথিওপিয়ার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়।
গত কয়েক মাসে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবার চিত্রটাই পাল্টে যায়। আবি আলীকে নোবেল বিজয়ী হিসেবে ঘোষণার পর পুরো ইথিওপিয়ার মানুষের মধ্যে বাঁধভাঙ্গা আবেগের জোয়ার সৃষ্টি হয়। আদ্দিস আবাবার রাস্তা-ঘাট থেকে শুরু করে গাড়ির সামনে-পিছনের গ্লাসে এখন প্রিয় প্রধানমন্ত্রীর ছবির স্টিকার সেঁটে রাখে সবাই। তার ছবি আঁকা টি-শার্টের পিছনে মানুষ দেদার টাকা খরচ করছে। প্রধানমন্ত্রী আবিকে নিয়ে দেশটিতে এখন যা চলছে, ব্রিটিশ সাংবাদিক টম গার্ডনার এই উন্মাদনার নাম দিয়েছেন ‘আবিম্যানিয়া’।

একজন আবি আলী যদি গোটা ইথিওপিয়াকে পাল্টে দিতে পারেন, তবে আমাদের নেতানেত্রীরা কেন পারবেন না?

পরিশেষে আবারও ইশরাক প্রসঙ্গ। ইশরাক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছে, আমাদের ভবিষ্যৎ কি? দেশের ভবিষ্যৎ বর্তমান নেতৃত্বকেই ঠিক করতে হবে। হ্যাঁ, এটা ঠিক করার সময় কিন্তু দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে। এক সময়ের রাজপথ কাঁপানো নেতা সাদেক হোসেন খোকার এই নীরব প্রস্থান কিন্তু এটাও প্রমাণ করে যে ক্ষমতা কারো চিরস্থায়ী না! মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার ক্ষমতারও মৃত্যু ঘটে, তাই ক্ষমতাকে জনকল্যাণেই ব্যবহার করা শ্রেয়। এটা বর্তমান ক্ষমতাসীন, দাপুটে লোকজনের জন্য একটি বার্তা। প্রতিটি ঘটনাই ইতিহাসের সাক্ষী কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃখজনক সত্যিটা হল, কেউই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View