চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

খেলাপি ঋণের ‘ক্যান্সার’ সারাতে ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠনের পরামর্শ

ব্যাংক ঋণ নিয়ে ‘পাতানো খেলা’ চলছে

খেলাপি ঋণের ‘ক্যান্সার’ সারাতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠনসহ খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কটের পাশাপাশি তাদের শাস্তি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যাংকিং ও অর্থনীতি খাতের সংশ্লিষ্টরা। জরুরি প্রয়োজনে ৩ বছরের জন্য একটি খেলাপি ঋণ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠারও পরামর্শ দেন তারা।

শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাত নিয়ে উল্টোপাল্টা পদক্ষেপ বন্ধ করুন: ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠন করুন’ শীর্ষক বৈঠকে উপস্থাপিত এক প্রবন্ধে তারা এসব পরামর্শ দেন।

বিজ্ঞাপন

প্রবন্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, তিনি আর খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়তে দেবেন না। অতএব, একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট কৌশল প্রয়োগ করে মন্দ ঋণ রাইট-অফ বা অবলোপন করার পদ্ধতি সহজ করে দিয়েছেন, যাতে খেলাপি ঋণের এ শিথিল পদ্ধতি প্রয়োগ করে বিভিন্ন ব্যাংক ‘মন্দ ঋণ অবলোপন’ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। অবলোপন করা মন্দ ঋণ বাড়ার মানেই হলো এর ফলে খেলাপি ঋণ ওই পরিমাণ কম দেখানো যাবে।

মন্দ ঋণ আদায়ের জন্যে খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে ২ শতাংশ ঋণ প্রাথমিক কিস্তিতে পরিশোধ করে ১০ বছরের সময় দেয়ার যে ব্যবস্থা করলেন, সে সুবিধা নিয়মনিষ্ঠ ঋণ ফেরতদাতারা পান না। কিন্তু, এ-ধরনের পরিবর্তন খেলাপি ঋণ সমস্যাটিকে আড়াল করার পন্থা হলেও মন্দ ঋণ আদায় করার কোনো নিষ্ঠাবান প্রয়াসের মাধ্যমে জোরদার করার লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উল্টো একজন ‘ব্যবসায়ী অর্থমন্ত্রী’ তার ঋণখেলাপি ব্যবসায়ী বন্ধুদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত দরদ দেখিয়ে উল্টোপাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে চলেছেন।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতাগ্রহণের ৯ মাস অতিক্রান্ত হলেও এখনও তিনি কমিশন গঠনের ঘোষণা দেননি, কিন্তু কেন? এতদিনে তার বোঝা উচিত যে অর্থমন্ত্রীর টোটকা দাওয়াই দিয়ে খেলাপি ঋণের ক্যানসার সারানো যাবে না। দেশের বেশির ভাগ ব্যাংকের অবস্থা ভালো নয়। যার মূল কারণ খেলাপি ঋণ। এমন অবস্থায় প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সুপারিশ করার জন্য অবিলম্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠন করার দাবি জানানো হয় অনুষ্ঠানে।

ব্যাংক ঋণ নিয়ে ‘পাতানো খেলা’ চলছে মন্তব্য করে অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, সমস্যার প্রকৃত রূপটি সরকার, ব্যাংকার এবং ঋণখেলাপি সবারই জানা আছে। সমস্যার সমাধানের উপায় সম্পর্কেও এ তিনপক্ষের সবার স্পষ্ট ধারণা আছে। কিন্তু, জেনেশুনেই সরকার সমাধানের পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ফলে, এখনও দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা রয়ে গেছে রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিদের কাছে আটকে থাকা বিপুল খেলাপি ঋণ। এ ঋণখেলাপিদের প্রায় সবাই ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’, মানে যারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে তারা তাদের ঋণ ফেরত দেবেন না। কারণ, তাদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি এবং আর্থিক প্রতাপ দিয়ে তারা শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, দেশের সংসদকেও দখল করে ফেলেছেন।

বিজ্ঞাপন

এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানানো হয়, গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের ৬১ দশমিক ৭ শতাংশই ব্যবসায়ী। তাদের সিংহভাগই ব্যাংকের মালিক বা পরিচালক। সংসদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য প্রকৃতপক্ষে ঋণখেলাপি হলেও বিভিন্ন পন্থা অনুসরণ করে তারা তাদের খেলাপি ঋণ আড়াল করে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।

মইনুল প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টার নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ আদায়ে যে পাতানো খেলা চলছে, এতে করে কখনো দেশে খেলাপি ঋণ আদায় হবে না। তার বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? না হয়নি, আর হবেও না।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ওই উপদেষ্টাকে ইঙ্গিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গর্ভনর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘ক্যাসিনোর সম্রাট একজন, ব্যাংকের সম্রাট আরেকজন। আর এই সম্রাট যদি থাকেন, তাহলে কোনো কাজ করা যাবে না। এই সম্রাটকে ধরতে পারলে সবকিছু ঠিক হবে। শেয়ারবাজার তদন্ত প্রতিবেদনে তার নাম সবার ওপরে রেখেছিলাম। তিনি সব জায়গায় লুট করেছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, বাংলাদেশ সারাবিশ্বের মধ্যে এক নম্বর ঋণখেলাপির দেশে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভালো হয়, যদি আমরা ব্যাংকে টাকা না রাখি। মানুষ বোকার মতো ব্যাংকে টাকা রাখছে। আর ঋণখেলাপিদের সুবিধা করে দিচ্ছে।

এ সময় বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সমস্যা নিঃসন্দেহে খেলাপি ঋণ। এ ঋণ আদায়ের জন্য বিদ্যমান বিচার প্রক্রিয়া বাংলাদেশে খুবই অকার্যকর এবং দীর্ঘসূত্রতা-সাপেক্ষ। এখন সুপ্রতিষ্ঠিত যে, এ দেশের রাজনীতি ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি কালচারকে’ লালন করে চলেছে। তাই, সংশোধনও শুরু করতে হবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে। এজন্য জরুরি প্রয়োজন হলো তিন বছরের জন্য একটি খেলাপিঋণ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করে প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ ১০ ঋণখেলাপিকে চূড়ান্ত বিচারে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা।

অনুষ্ঠানে সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এমডি আবু নাসের বখতিয়ার, অধ্যাপক আবু সাঈদ, বিএনপির সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

Bellow Post-Green View