চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষেরা কিভাবে ভ্যাকসিন পাবেন?

করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর থেকেই নানা ধরনের গুজব তৈরি হচ্ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সেসব ভুয়া খবর দ্রুত বেগে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ‘মুসলমানদের করোনা হবে না’ বাণীসহ মাস্ক না পরার বিভিন্ন ভিডিও দেখা গেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এসব ভিডিও যারা করেছিলেন, তারা সমাজের অনেকাংশেই ছিলেন প্রভাব বিস্তারকারী। সেসব ভুয়া খবর ও গুজব প্রতিরোধ করে বাংলাদেশ করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বিশ্বে এখন রোল মডেল।

এরপর যখন ভ্যাকসিনের প্রসঙ্গ আসলো, তখনও বিরোধিতার জন্য বিরোধিতার সাথে যোগ হলো গুজব। বিরোধী পক্ষের অভিযোগের তীর তাক হলো সরকার এবং যে প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন নিয়ে আসলো সেই বেক্সিমকোর দিকে। এবার বলা হলো: ‘‘বিরোধী পক্ষকে ‘গিনিপিগ’ বানানোর জন্য এ ভ্যাকসিন আনা হচ্ছে। এত বছর ধরে মারছে, এখন আবার ভ্যাকসিন দিয়েও মারতে চায়!’’ এছাড়া ভারত থেকে কেন আনা হচ্ছে ভ্যাকসিন সেটাও ছিল একটা শ্রেণির মাথাব্যথার কারণ!

বিজ্ঞাপন

ভ্যাকসিন সংক্রান্ত ভুয়া খবর শুধু এখানেই থামেনি। বরং কোভিশিল্ড এবং কোভ্যাক্সিন নিয়েও তৈরি করা হয়েছে ধুম্রজাল। ভারতে কোভ্যাক্সিন নিয়ে কিছুটা জটিলতা ছিল। সেই ভ্যাকসিন তখন ট্রায়ালের পর্যায়ে। এছাড়া কোভ্যাক্সিনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে খোদ ভারতেই বিতর্ক ছিল। সেই ভ্যাকসিন না এনে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে কিনে আনলেও বাংলাদেশে টিকাবিরোধীরা বলা শুরু করলো ‘ভারতে যে টিকা দেয়া হচ্ছে না, সেই টিকা আনা হচ্ছে বাংলাদেশে!’ অথচ ভারতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দেয়া হয়েছিল, বাংলাদেশে আনার আগেই। এবং সেই টিকায় তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর তখনও পাওয়া যায়নি। সেই মুহূর্তে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়ে ভারতে কিংবা অন্য কোনো দেশে বিতর্ক ছিল না।

এ অপপ্রচার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, সরকারপন্থী অ্যাক্টিভিস্টরাও দোদুল্যমান পরিস্থিতিতে ছিল। এ বড় কারণ হচ্ছে, কোভিশিল্ড এবং কোভ্যাক্সিন যে ভিন্ন ভিন্ন দু’টি ভ্যাকসিন সেটা নিয়ে প্রচারণার অভাব ছিল। এছাড়া ভুয়া খবরগুলো হালে পানি পাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল, প্রথম দিকে সরকারের মন্ত্রী-এমপি বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ভ্যাকসিন গ্রহণ করেননি। প্রথম পর্যায়ে কুর্মিটোলা হাসপাতালের এক নার্স টিকা নেন, এরপর কয়েকদিন স্বেচ্ছাসেবকরাই টিকা গ্রহণ করেন। এই বিষয়টি তখন সাধারণ মানুষের কাছে টিকাবিরোধী গুজবগুলো বিশ্বাস করতে সহযোগিতা করেছিল। পরে অবশ্য সেই প্রচারণাও হালে পানি পায়নি। ভ্যাকসিন নিয়ে শুরুর দিকে যারা ভুয়া খবর কিংবা সন্দেহ ছড়িয়েছেন, তারাই কয়েকদিন পর টিকা নেয়ার সিরিয়ালে নাম লিখেছেন, টিকা গ্রহণ করেছেন। এই জবাব দেয়া সম্ভব হয়েছে এমপি-মন্ত্রীসহ সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা টিকা গ্রহণ করতে শুরু করায়। এখন পর্যন্ত লাখ লাখ মানুষ এই ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন, নিবন্ধনও করেছেন প্রায় অর্ধকোটি মানুষ।

কিন্তু এখন পর্যন্ত যারা টিকা গ্রহণ করেছেন তাদের কত শতাংশ সাধারণ শ্রমজীবী কিংবা খেটে খাওয়া মানুষ?

এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় চ্যানেল আইয়ের একটি প্রতিবেদনে। ‘ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের বেশির ভাগই উচ্চবিত্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, ‘দেশব্যাপী বিনামূল্যে করোনার ভ্যাকসিন যারা পাচ্ছেন তাদের প্রায় সবাই সমাজের উচ্চবিত্ত। বলতে গেলে এই সময় পর্যন্ত নিম্নবিত্তদের কাছে ভ্যাকসিন কার্যক্রম পৌঁছেনি।

টাঙ্গাইলের মাঠ পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্যে এমন চিত্র উঠে এসেছে। নিম্নবিত্তরা বলছেন, নিবন্ধনে জটিলতা আর শহরকেন্দ্রিক ভ্যাকসিন কেন্দ্রের কারণে ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহ পাচ্ছেন না তারা।’

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়: সমাজের পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষ, কৃষিজীবী, শ্রমিকসহ নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মানুষদের অধিকাংশই মতামত দিয়েছেন ভ্যাকসিন কার্যক্রম বিষয়ে তারা অবগত নয়। আর যারা অবগত আছেন তারা বলছেন, শহর কেন্দ্রিক ভ্যাকসিন কেন্দ্র, নিবন্ধন জটিলতা, স্মার্ট ফোন ও ইন্টারনেট সুবিধা না থাকাসহ প্রচার প্রচারণার অভাবে অনাগ্রহী তারা। তবে সহজে ভ্যাকসিন পাওয়ার ব্যবস্থা করলে ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী তারা।

এটা টাঙ্গাইলের চিত্র হলেও দেশের ৬৪টি জেলার পরিস্থিতি আসলে একইরকম। খোদ রাজধানী কিংবা বিভাগীয় শহরগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। খোঁজ নিলে দেখা যাবে সেখানকার পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষরাও এসব জটিলতার কারণে ভ্যাকসিনমুখী হননি। অথবা হতে পারেননি। এজন্য ভ্যাকসিন নিবন্ধন কার্যক্রম আরও সহজ করতে হবে। এক্ষেত্রে সমাজের নানা স্তরের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে।

এখানে একটি উদাহরণ তুলে ধরা যেতে পারে। যেমন: ঢাকার একজন রিকশাচালক নিশ্চয়ই স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না। এরপরও যদি ধরে নেয়া হয় যে, তিনি একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, তাহলেও তিনি ভ্যাকসিন নিবন্ধন করার মতো জ্ঞান রাখেন না। এ কারণে তিনি ভ্যাকসিন নিতে পারছেন না। তাকে ভ্যাকসিন নিতে উৎসাহিত করতেও দেখা যাচ্ছে না সরকারের তরফ থেকে। এখন ওই রিকশাওয়ালা যদি ভাইরাসের বহনকারী হন, তাহলে তিনি আরও হাজার হাজার মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। এমনকি যারা সুরক্ষিত অফিসে বসে যখন ভাবছেন নিরাপদ, তখন রিকশায় আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে ফাইলপত্র নিয়ে তার রুমে আসছেন। এর মানে হচ্ছে কেউই নিরাপদ নয়।

এই সমস্যার সমাধানে শুরুতে স্পট নিবন্ধনের ব্যবস্থা রাখলেও শেষ পর্যন্ত তা রাখা সম্ভব হয়নি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষায় এর কারণ হলো: যাদের স্মার্টফোন নেই, তাদের জন্য ভ্যাকসিন প্রয়োগ কেন্দ্রে এসে নিবন্ধনের সুযোগ রেখেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু নিবন্ধন না করে অনেকেই ভ্যাকসিন নিতে আসায় বিভিন্ন কেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হচ্ছে। এজন্য দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জাতীয় পর্যায়ে চলমান ভ্যাকসিন প্রয়োগ কার্যক্রমে কেন্দ্রে গিয়ে নিবন্ধনের সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন: ভ্যাকদিন প্রয়োগ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চালাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরা চাই সুষ্ঠুভাবে ভ্যাকসিন নেওয়া হোক। আমরা বিভিন্ন রকমের জায়গা তৈরি করে দিয়েছি। এই সুন্দর পরিবেশ আমরা তৈরি করেছি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যারা অনস্পট রেজিস্ট্রেশন করছেন, তাদের সংখ্যাই বেশি। আর যারা রেজিস্ট্রেশন করছেন, তারাই ঢুকতে পারছেন না। বয়স্ক লোকেরা যাচ্ছেন, তাদের কষ্ট হচ্ছে। যারা ভ্যাকসিন দিচ্ছেন, সেই ডাক্তার-নার্সদের কষ্ট হচ্ছে। আমরা এই পরিস্থিতি চলতে দিতে চাই না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্য একেবারে ফেলে দেয়ার মতো নয়। তবুও প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের ভ্যাকসিন পাওয়ার বিষয়টি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কোভিড ভ্যাকসিন বিষয়ে জাতিসংঘের একটি উদ্যোগের রেফারেন্স দেয়া যেতে পারে। ভ্যাকসিন পাওয়ার দৌড়ে উন্নত দেশগুলো যখন কয়েক বছর পর্যন্ত টিকা অর্ডার দিয়ে রাখায় গরিব দেশগুলো ভ্যাকসিনে অনেকাংশে পিছিয়ে রয়েছে। এজন্য গরিব দেশগুলোর টিকা পাওয়া নিশ্চিত করতে কোভ্যাক্সের আওতায় বিশ্বজুড়ে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন সরবরাহের উদ্যোগ নেয় জাতিসংঘ। কোভ্যাক্সের আওতায় ইতোমধ্যে প্রথম ভ্যাকসিন পেয়েছে আফ্রিকার দেশ ঘানা। বাংলাদেশও কোভ্যাক্স কর্মসূচির আওতায় জুন মাসে এক কোটি নয় লাখ ভ্যাকসিন পাচ্ছে।

কোভ্যাক্সের মতো মানবিক কর্মসূচি গ্রহণ করায় জাতিসংঘ ধন্যবাদ পেতে পারে। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশ সরকারকে প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি বা বিভিন্ন এলাকায় পাঠিয়ে প্রান্তিক মানুষদের ভ্যাকসিন নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের জন্য ভ্যাকসিনের একটা অংশ নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। সরকারের একার পক্ষে স্বাস্থ্যকর্মীদের দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করা কষ্টসাধ্য হলে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক শফিকুল ইসলাম সজিবের বক্তব্যে নজর দেয়া যেতে পারে।

তিনি বলেছেন: ‘বাড়ি বাড়ি ভ্যাকসিন কার্যক্রম পৌঁছে দিতে না পারলে বড় অংশই এর বাহিরে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। করোনা মহামারির শুরুর দিকে যেভাবে বিভিন্ন সংগঠন ত্রাণ কার্যক্রমে এগিয়ে এসেছিল তেমনই ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রমে যদি প্রান্তিক মানুষের রেজিস্ট্রেশন কাজে সহযোগিতা করেন তাহলে ভ্যাকসিন গ্রহণে অনেকেই আগ্রহী হবেন।’

এ বিষয়ে অবশ্য আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। রিজেন্ট হাসপাতাল কিংবা জেকেজি হেলথকেয়ারের চরম অমানবিক কাণ্ড আমরা লক্ষ্য করেছি। বেসরকারিভাবে করোনা পরীক্ষার সুযোগ নিয়ে তারা টেস্ট না করেই রেজাল্ট দেয়ার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। প্রান্তিক মানুষের ভ্যাকসিন রেজিস্ট্রেশনেও তাই সেই শঙ্কা থেকে যায়। তবুও আশায় বুক বাঁধতে হবে। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী কোভিড মহামারি প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। এখন ভ্যাকসিন রেজিস্ট্রেশন প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবী বা বেসরকারি খাতে ছাড়া যায় কিনা সেটা ভাবতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এরপর দরকার প্রচার-প্রচারণা। প্রয়োজনে সরকার এ খাতে ভর্তুকি দিতে পারে। তবে এসব কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে বিন্দুমাত্র শিথিলতার কোনো সুযোগ রাখা যাবে না।

আশা করবো সরকার এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। দেশের সব মানুষকে টিকা দেয়া নিশ্চিত করতে চলমান কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার পাশাপাশি যখন যে পরিমাণ ভ্যাকসিন দেশে আসে, সেখান থেকে প্রান্তিক মানুষদের জন্য একটা অংশ বরাদ্দ রাখতে হবে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে একটু সতর্কভাবে অগ্রসর হলে করোনা মোকাবেলার মতো ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। এজন্য যার যার অবস্থান থেকে সেবার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)