চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

খুলনার দাকোপে খাবার পানির সংগ্রাম

খুলনার উপকূলীয় উপজেলা দাকোপে প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। এখানে চারদিকে পানির প্রাচুর্যতা থাকলেও বিশুদ্ধ ও নিরাপদ সুপেয় খাবার পানির জন্য সংগ্রাম নিত্য দিনের। তাই এ এলাকার অধিকাংশ মানুষকে নির্ভর করতে হয় পানির নানা বিকল্পে। এই বিকল্প যেন তাদের জন্য রীতিমত সংগ্রাম।

চ্যানেল আই অনলাইনের এ প্রতিবেদক সম্প্রতি সেখানকার মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সংগ্রামের কথা জানতে খুলনা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে দাকোপ উপজেলায় সরেজমিনে যায়। দাকোপের চালনা পৌরসভায় দেখা যায় রিভার্স অসমোসিস প্লান্টের এটিএম লাইনে সারিবদ্ধ হয়ে মানুষ খাবার পানি সংগ্রহ করছে।

বিজ্ঞাপন

খাবার পানির জন্য এমন লাইন কেন? এমন প্রশ্ন ছিল পানি সংগ্রহে আসা রীতা রানী সরকারের কাছে। তিনি জানান: আমাদের এ পুরো এলাকায় কোথাও খাবার উপযুক্ত পানি নেই। আমি পাঁচ কিলোমিটরা দূর থেকে হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করতে এসেছি। এটা অনেক কষ্টের। কিন্তু কী করবো? এ এলাকার গভীর নলকূপগুলো থেকেও উঠে লবণাক্ত পানি। আগে থেকে বসানো দু’একটা নলকূপ হয়তো আলাদা। কিন্তু এখন যে নলকূপই বসানো হচ্ছে লবণপানি উঠছে। এমনকি পাশদিয়ে বয়ে যাওয়া ভদ্রা-পশুর নদীর পানির বছরের অনেকটা সময় থাকে লবণাক্ত।

রীতা রানীর কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল এ সমস্যা কি শুরু থেকেই? উত্তরে তিনি বলেন: আগে এতোটা সমস্যা ছিল না। গত ১০-১৫ বছর সমস্যা বেড়েছে। সমস্যার শুরুতে আমাদের মতো এলাকার অন্য পরিবারগুলো বৃষ্টির পানি জমিয়ে খাবার জন্য ব্যবহার করতো। এখন বাধ্য হয়ে রীতিমতো সংগ্রাম করে সবাই পৌরসভার এটিএম বুথ থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করছে।

শুধু রীতা রানী নয়, তার পরিবারের মতো আরও ৫০০ পরিবার রয়েছে যারা পৌরসভার এটিএম’র ওপর খাবার পানির জন্য নির্ভর করে।

২০১৭ সালে চালনা পৌরসভায় বসানো হয় পানি বিশুদ্ধ করার পাতন প্রক্রিয়া বা রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট। ওয়াটার এইডের কারিগরি সহায়তায় এবং বহুজাতিক ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি’র অর্থায়নে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রুপান্তর। আর পরিচালনার ভার পৌরসভার।

পুরো দাকোপজুড়ে এমন ৯টি রিভার্স অসমোসিস প্লান্ট রয়েছে। যেগুলো সাধারণ মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে পানি প্রাপ্তির নিরাপদ স্থল। এখানে প্রতি লিটারের জন্য একজন মানুষকে খরচ করতে হয় লিটার প্রতি ৫০ পয়সা।

এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বছরের এ সময়টাতে সাধারণ মানুষের পানির সঙ্কট থাকে সবচেয়ে বেশি।

তাহলে পৌরসভা তথা স্থানীয় সরকার থেকে সাধারণ মানুষের জন্য কী করা হচ্ছে?

বিজ্ঞাপন

এমন প্রশ্নের জবাবে চালনা পৌরসভার মেয়র সনত কুমার বিশ্বাস বলেন: জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে ৩২টি পৌরসভায় পানি সরবরাহ ও মানব বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় আমাদের এখানে কাজ চলছে। এ প্রকল্পের আওতায় পৌরসভা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের ভদ্রা নদী থেকে পানি পরিশোধনের মধ্যদিয়ে স্থানীয় জনসাধারণের জন্য সুপেয় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এ প্রকল্পের কাজ চলমান।

তিনি আরও বলেন: নদীর পানিতে লবনাক্ততা বৃদ্ধি পেলে তখন ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে যেন পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় সেজন্য বিকল্প ব্যবস্থাও থাকছে এ প্রকল্পের আওতায়। তবে আমরা চেষ্টা করছি যতোদূর সম্ভব ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার না করতে।

পিএসএফ

এ এলাকার যে পুকুরগুলোর পানি এখনও লবণাক্ত নয় সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে নিত্য প্রয়োজনের বিভিন্ন কাজে। আর পৌরসভা সংলগ্ন দু’টি পুকুরকে আলাদাভাবে গোসল ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্টের অর্থ ব্যবস্থাপনা কিভাবে সম্পন্ন হয়? এমনটা জানতে চাওয়া হয়েছিল প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা রূপান্তরের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার গুহ’র কাছে।

তিনি বলেন: পৌরসভার এই প্রকল্প বাদে অন্য ৮টি প্রকল্প ম্যানুয়াললি দেখাশুনা করা হয়। বোতলের ওপর ধারণা করে দাম নির্ধারণ করা হয়। পৌরসভা থেকে কার্ড রিচার্জের ব্যবস্থা আছে। মোবাইলে যেভাবে টাকা রিচার্জ করা হয়, একইভাবে এই কার্ড রিচার্জ করা যায়। কার্ড নম্বর বলে দিলেই কর্মকর্তারা টাকা পাঠিয়ে দেন। প্রিপ্রেইড কার্ড রিচার্জের থাকা সাপেক্ষে পানি সংগ্রহ করা যায়।

এ থেকে প্রাপ্ত টাকা কোন খাতে খরচ হচ্ছে? উত্তরে স্বপন বলছেন: এ টাকা পৌরসভা রাখছে। যা পরবর্তি প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণে তারা খরচ করবে।

এছাড়া কম আয়ের মানুষদের জন্য পুকুর সংরক্ষণ করে কম খরচে পন্ড স্যান্ড ফিল্টারে (পিএসএফ) খাবার পানির ব্যবস্থাও রয়েছে দাকোপে।

এ প্রক্রিয়ায় নলকূপের সাহায্যে পানি একটি চেম্বারে তুলে আনা হয়। সেখানে পাঁচটি আলাদা আলাদা চেম্বারের পরিশোধনের মাধ্যমে পানিকে বিশুদ্ধ ও পানযোগ্য করে তোলা হয়। তবে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় এ সেবার আওতা খুবই অপ্রতুল। তাই সাধারণ মানুষের চাওয়া, তাদের সংগ্রাম লাঘবে সেখানে যেন এমন আরও দীর্ঘমেয়াদী জনমুখী প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।