চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

খালেদা-তারেক লন্ডন বৈঠকের পর

বেগম খালেদা জিয়া লন্ডন গেছেন। তারেক জিয়া গত সাত বছর ধরে সেখানে অবস্থান করছেন। ২০০৮ সালে তারেক জিয়া চিকিৎসার জন্য যে লন্ডন গিয়েছিলেন আর দেশে ফিরে আসেননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে জেলে দিয়েছিল। বন্দি অবস্থায় শারিরীক নির্যাতনের কারণে মেরুদণ্ডের কোমরের অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল তার। সম্ভবত এখন তিনি সুস্থ হয়েছেন। হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে মাকে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে হোটেল পর্যন্ত নিয়ে গেছেন।

মালয়েশিয়া থেকে কোকোর স্ত্রীও দুই মেয়ে নিয়ে লন্ডন গেছেন। এখন তারাও নাকি তারেক রহমানের পরিবারের মতো লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন। বেগম জিয়ার চোখ আর পায়ের চিকিৎসা হবে লন্ডনে। আর পরিবারের সবাই মিলে অনেকদিন পর ঈদও করবেন একসঙ্গে। আবার দেখা যাচ্ছে, মঈন খান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, আমীর খসরু মাহমুদসহ দলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও এই উপলক্ষে লন্ডন গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

সম্ভবত সরকার বিরোধী আন্দোলনে ব্যর্থতা, সংগঠনে স্থবিরতা, অসংখ্য মামলার জট- ইত্যাদি নিয়ে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়া লন্ডনে বৈঠক করবেন। এমন একটা বৈঠকের প্রয়োজনও ছিল। কারণ চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানই দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল কর্তা। তারেক জিয়া সাত বছর দেশে নেই। সংগঠনের শক্তি, জনসমর্থনের সক্রিয়তা ইত্যাদি তিনি চোখে না দেখেই আন্দোলনের সিদ্ধান্ত দিয়ে আসছেন। সে অনুসারে আন্দোলনও হয়েছে। কিন্তু আন্দোলন চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু আন্দোলন ব্যর্থ হয়নি, সংগঠনের অবস্থাও করুণ রূপ ধারণ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনও বিষয়ে রাখ-ঢাক না করে সব বিষয় টেবিলে উত্থাপন করে একটা খোলামোলা আলোচনার দরকার।

বেগম জিয়া এবং তারেক জিয়ার উচিত হবে নেতাদের মন খুলে কথা বলতে দেওয়া। তাদের বক্তব্য ধৈর্য ধরে শোনা। সরকার বিরোধী বিগত আন্দোলনগুলো শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই করা হয়েছিল। সুতরাং আন্দোলনের ব্যর্থতার জন্য একতরফাভাবে নেতাদের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করা যাবে না। বিএনপির জনসমর্থন ছিল এবং আছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে, সেই সমর্থন ছিল প্যাসিভ সাপোর্ট। মূলত তারা বিএনপির ভোটার। প্যাসিভ সাপোর্টারের একটা খারাপ অভ্যাস হচ্ছে বিরোধীপক্ষের সঙ্গে মারমুখি সংঘাতের মুখোমুখি হলে তারা এক সময় নিরপেক্ষতার ভান করে।

বিএনপি বিবেচনায় নিতে হতে তার বিরোধীপক্ষ কারা। আন্দোলনের রূপরেখা স্থির করতে হলে বিরোধীপক্ষের সাংগঠনিক জোর, সমর্থনের জোর, অভিজ্ঞতার জোর, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমর্থন কোন দিকে যাবে- এর সব কিছু বিবেচনায় নিতে হবে। সর্বপরি দেখতে হবে দেশে আন্দোলনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে কিনা। আশা করি লন্ডনের বৈঠকে এইসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। অহেতুক আন্দোলনের নামে দেশের মানুষকে আর কষ্টে ফেলবে না। গত দুই বার আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। তার পরিণাম বিএনপিতে বহুমূল্যে মেটাতে হবে এবং হচ্ছেও। ব্যর্থতার বোঝা আর বাড়িয়ে লাভ নেই।

বিএনপি ২০ দলীয় জোট গঠন করেছিল একটা শক্তিশালী আন্দোলন করার জন্য। বিশ দলের কারোই তেমন কোনও সাংগঠনিক শক্তি নেই জামায়াত ছাড়া। সংগঠন আর কর্মী আছে জামাতের কাছে। তাদের কর্মী তাদের উদ্দেশের প্রতি নিবেদিত। বিএনপির মাথার ওপর যে বিপদ তার চেয়ে বেশি বিপদ জামাতের মাথার ওপর। তাদের দু’জন নেতার ফাঁসি হয়েছে। অনেকে এখনো ফাঁসির অপেক্ষায় জেলখানায়। সব ফাঁসির হুকুম কার্যকর হলে কেন্দ্রে তাদের আর বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা থাকবে না। জামায়াত দীর্ঘসময় ধরে বিএনপির সঙ্গে ক্ষমতায়ও ছিল, মাঠে ময়দানেও ছিল। কিন্তু অভিযোগ আছে বিএনপির সুবিধাবাদী চরিত্র ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে বিএনপি জামায়াতের কোনও উপকারে আসেনি।

বিজ্ঞাপন

এটা সত্য যে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে না থাকলে তাদের এতো ভয়াবহ বিপর্যয় হতো না। জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির বক্তব্যও স্বচ্ছ নয়। তারা একবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান ‘কিন্তু’ যুক্ত করে, আবার নিজামী-মুজাহিদদের মুক্তিও চান। আন্তর্জাতিক মহল থেকে বিএনপির ওপর জামায়াত ছাড়ার চাপও রয়েছে। জামাতের সঙ্গে কুটুম্বিতা নিয়েও সম্ভবত লন্ডন বৈঠকে আলোচনা হবে। জামায়াতকে রাখা না রাখা প্রশ্নে বিএনপিতে দুই স্রোত প্রবাহমান। অবশ্য তারেক জিয়া নাকি জামায়াতকে রাখার পক্ষে।

আন্তর্জাতিক মহলে জামায়াত সস্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাদের এক সময়ের অর্থের মূল জোগানদাতা মধ্যপ্রাচ্যের কোনও দেশও এখন তাদের সঙ্গে নেই। তাদের নেতাদের বিচারের ব্যাপারেও মধ্যপ্রাচ্যের কোনও দেশ সহানুভূতি দেখায়নি। মাঝে মাঝে আলজাজিরা ধর্মীয় নেতাদের বিচার হচ্ছে বলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করলেও সফল হয়নি। আওয়ামী লীগ সব মহলকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে, মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের না। বিচারও আইন মেনে হচ্ছে, প্রকাশ্যে হচ্ছে। বিচারে আপিল-দরআপিলের ব্যবস্থা রয়েছে। অবশ্য, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে তুরস্ক কিছু সহানুভূতি দেখালেও সরকার তা কানে তুলেনি।

লাহোরের দাঙ্গায় হাজার হাজার কাদিয়ানি হত্যার দায়ে মওলানা মওদুদির ফাঁসির হুকুম হয়েছিল। সৌদি আরবের হস্তক্ষেপে সে ফাঁসির হুকুম পাকিস্তান সরকার রহিত করে। সেই সৌদি আরবই এখন সব কথিত ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের উপর ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে গেছে। কারণ দুনিয়াব্যাপী সন্ত্রাস করে এরাই ইসলামকে কলুষিত করেছে।

রসুলাল্লাহ (স.) বলেছেন, দুনিয়ার যে প্রান্তেই হত্যাকান্ড সংঘটিত হোক না কেন, দুনিয়ার অপরপ্রান্তের লোক যদি তাতে উল্লসিত হয়, তবে সে-ও ওই হত্যারে অপরাধে অপরাধী। এই যদি রাসুলাল্লাহর (সঃ) সুন্নত হয় তবে ২০১৩/১৫ সালে আন্দোলনের নামে পেট্রল বোমা মেরে কয়েক শত নিরীহ মানুষকে জামায়াত যে হত্যা করেছে তার জবাব আল্লাহর কাছে কিভাবে দেবে তারা! আমার মনে হয় জামাতের নেতা কর্মিদেরও আত্মসমালোচনা ও আত্মজিজ্ঞাসার সময় এসেছে। তারাও তাদের কোর্স অফ এ্যাকশনের পূন:মূল্যায়ন করুক। না হয় তারা কখনো আল্লাহর করুণার প্রত্যাশা করতে পারে না।

বিএনপি নতুন নির্বাচনের দাবি তুলেছে। বিএনপির কেউ কেউ বলছেন শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতেও তাদের আপত্তি নেই। আবার বেগম জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়েই এই তত্ত্বাবধায়ক সিস্টেমের অবসান হয়েছে। আর যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা নিয়ে এতো আন্দোলন সেটা কিন্তু কখনই নিষ্কলংক ছিল না বা যারা আন্দোলন করেছেন তারা তাকে অবিতর্কিত বলেননি। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে খালেদা জিয়া নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছিলেন শেখ হাসিনা তার সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন। যার যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে শেখ হাসিনা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছিলেন তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খালেদা জিয়া।

শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া দু’জনই নারী এবং বাংলাদেশের নাগরিক- এছাড়া উনাদের মিল নেই কিছুতেই। এতো অমিলের মাঝেও শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়া জাতির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন দীর্ঘ দিন। আশা করা যাচ্ছে আরও দিবেন। তবে জাতি শেখ হাসিনার কাছে এই মুহূর্তে সুশাসন এবং আর খালেদা জিয়ার কাছে নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক আন্দোলন আশা করে। দুই নেত্রী এবার ঈদ করছেন দেশের বাইরে। ঈদের পরও যেন দেশে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা বিরাজ করে-আল্লাহর কাছে প্রার্থনার পাশাপাশি দু’ নেত্রীর কাছে সবার এটা প্রত্যাশা। লন্ডন বৈঠকওয়ালারাও যেন বিষয়টি ভুলে না যান।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View