চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

খালেদা জিয়া-তারেক জিয়ার লন্ডন বৈঠক

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া লন্ডন গিয়েছেন। তার বড় ছেলে এবং দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করবেন। বলেছেন চিকিৎসার জন্য লন্ডন গেছেন। কিন্তু মূল কাজ মা-ছেলের সাক্ষাত।

বিজ্ঞাপন

দেশের অবস্থা, দলের অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা- সব পর্যালোচনা করে সম্ভবত মা ও ছেলে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছবেন। তবে দেখা যাচ্ছে বিএনপির কিছু নেতা আগে থেকেই লন্ডনে অবস্থান করছেন। বেগম জিয়ার আগে-পরে দেশ-বিদেশ থেকে আরও কিছু নেতা লন্ডন গিয়ে মিলিত হচ্ছেন। সবাই প্রত্যাশা করছেন বিএনপি নেতারা লন্ডন বৈঠকে দল ও দেশের স্বার্থে একটা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে,  খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর থেকে লন্ডনে এসে যোগ হচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস-চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ড. ওসমান ফারুক, বিএনপির অর্থ বিষয়ক সম্পাদক আবদুস সালাম ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এহসানুল হক মিলন। ঢাকা থেকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে একই ফ্লাইটে লন্ডনে গেছেন উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও তাবিথ আউয়াল। তাবিথের বাবা চেয়ারপারসনের আরেক উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু তিনদিন আগেই ব্যাংকক থেকে লন্ডনে পৌঁছেছেন। ঢাকা থেকে গত মঙ্গলবার অর্থনীতি বিষয়ক একটি সেমিনারে যোগ দিতে দিল্লি গেছেন চেয়ারপারসনের আরেক উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সূত্রের দাবি, সেমিনার শেষে তিনিও লন্ডন যাবেন।
সার্কাসের এ্যাক্রোব্যাট-এর মতো বেগম জিয়া গুলশান অফিসে বসে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে কঠিন এক খেলা পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন ১৫২ জন মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে। কিন্তু তার খেলা সফল হয়নি। এই ১৫২ জন মানুষ যদি সরকারের হাতে মারা যেত তাহলে গণঅভ্যূত্থান হয়ে যেত। দুর্ভাগ্য যে, মানুষগুলো মরেছে বেগম জিয়ার দুর্বৃত্তদের হাতে। বিএনপি অবশ্য অন্য কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কারণে নিজের অপকর্ম সরকারের কাঁধে ফেলা সম্ভব হয়নি। বিএনপি বুদ্ধির ঘট শূন্য। আওয়ামী লীগের পাকা বুদ্ধির মোকাবেলায় বিএনপি একেবারে শিশু বলে প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৩ সালের শেষ দিকে বিএনপি-জামাত পুরোপুরি সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়ে আন্দোলন করার চেষ্টা করেছিল। সন্ত্রাসের রূপ এতোই ভয়াবহ ছিল সাধারণ মানুষ আন্দোলনের ধারে কাছেও যেতে পারেনি। এমনকি সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবের কারণে বিএনপির সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা পর্যন্ত আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে পারেনি। 
গণ-বিচ্ছিন্ন,কর্মী-বিচ্ছিন্ন, দুর্বৃত্ত-নির্ভর এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণ মানুষের সহানুভূতিহীন আন্দোলন টিকে থাকা কঠিন হয়। শেষ দিকে বিএনপি- জামাতের দুর্বৃত্তরা পেট্রল বোমা মারতে গিয়ে গণরোষের, গণপ্রতিরোধের সম্মুখিন হয়েছে। বোমা মারায় উদ্যত কর্মিদের ধরে সাধারণ মানুষ পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। আন্দোলন যখন গণপ্রতিরোধের সম্মুখিন হয় তখন আন্দোলন ব্যর্থ হতে বাধ্য। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন হচ্ছে ক্ষমতায় আছে। সুতারাং তার শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানিক সাধারণ বিরোধিতা থাকবেই। সে বিরোধিতাও সন্ত্রাসের কারণে বিলিন হয়ে গেছে। 

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধের মধ্যে আওয়ামী লীগের জন্ম। যুদ্ধ করেই দলটি বড় হয়েছে। পরিণত সময়ে দেশ স্বাধীন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছে। সফলও হয়েছে। সুতরাং যে প্রতিষ্ঠানটি আঘাত করতে বা আঘাত পেতে সব সময় প্রস্তুত, সে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে খেলতে হলে চতুর খেলোয়াড় হতে হবে। সততা থাকতে হবে আন্দোলনে। জনগণকে সম্পৃত্ত করতে হবে। মানুষ যা ইচ্ছা করতে পারে, কিন্তু মানুষ কি ইচ্ছে করবে, তা নিজের ইচ্ছেমতো ঠিক করতে পারে না সব সময়। সেজন্য আলাপ আলোচনার প্রয়োজন হয়। বিএনপির নেতৃত্বে যিনি রয়েছেন উনার আলোচনার অভ্যাস খুবই কম। সিদ্ধান্ত নেন প্রায় একক ইচ্ছায়। কিন্তু নানা ঘাত-প্রতিঘাত পার হয়ে এসে দল ও আন্দোলন প্রশ্নে এখন মনে হয় আলোচনার প্রয়োজন অনুভব করছেন বেগম জিয়া। এ জন্য লন্ডন বৈঠক জরুরি। আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে দলীয় নেতারা হয়তো একটা ঐক্যমতের সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবেন।
বিএনপির বিপর্যয়ের পালা শেষ হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, সবে শুরু মাত্র। অচিরেই জিয়া অরফানেজ মামলার রায় হবে। টাকা খরচের একটা অডিটেড স্টেটমেন্ট আদালতে দেওয়া উচিত ছিল। আসামীপক্ষ এ পর্যন্ত সে রকম কোনও কাগজপত্র দিয়েছেন বলে শুনিনি। যেই আত্মসাৎ করুক না কেন, মামলার গতি প্রকৃতি দেখে মনে হয় টাকাটা আত্মসাত হয়েছেই। সুতরাং এতিমের নামে টাকা তুলে আত্মসাত করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এমন পরিস্থিতিতে সাজা হওয়া বিচিত্র নয়। 
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ও কাছাকাছি এসে গেছে। আইনমন্ত্রী বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা আছে। মামলাটি খালেদা জিয়ার আমলে জজ মিয়া নাটক দিয়ে শুরু করে ১১ বছর ধরে চলছে। কথায় কথায় অস্ত্রবাজি বিএনপি জন্মলগ্নের কুঅভ্যাস। বায়তুল মোকাররমে মুশতাকের জনসভায় জিয়ার আমলে গ্রেনেড হামলা করে ১৪ জন লোক হত্যা করা হয়েছিল। পুরানো কুঅভ্যাসের জের ধরে খালেদা জিয়ার আমলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে তাদের জনসভায় অসংখ্য গ্রেনেড মেরে ২৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আহত হয়েছে দুই শতাধিক। গ্রেনেড যদি ট্রাকের উপর পড়তো তবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীসহ বহু নেতার অকাল মৃত্যু হত। ভাগ্যের জোরে বেঁচে গিয়ে শেখ হাসিনা আজ প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। না হয় সেটা জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের চেয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ড হিসেবে ইতিহাসে থাকতো।

জজ মিয়া নাটক, বিচারপতি জয়নাল আবেদিনের বিচার বিভাগীয় প্রহসনমূলক তদন্ত রিপোর্টে প্রমাণিত হয় যে তখনকার ক্ষমতাসীন বিএনপির সক্রিয় সহযোগিতায় এই হত্যাকাণ্ডটি সংগঠিত হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডে অনেকের ফাঁসি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাক্ষ্য সুবাদে বেরিয়ে আসছে হাওয়া ভবনের নাটেরগ গুরু তারেক জিয়াও এতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তিনিও এই মামলার আসামী। এই দুটি মামলা ছাড়াও ২০১৩ ও ১৫ সালের আন্দোলনে অসংখ্য মামলার সৃষ্টি হয়েছে বিএনপি নেতা-কর্মিদের বিরুদ্ধে।
আন্দোলনের বিষয়ে তাই বিএনপির কোনও হঠকারি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবকাশ নেই। কারণ বিএনপি-জামাতের গত আন্দোলনগুলোর সিদ্ধান্ত কোনভাবেই সঠিক প্রমাণিত হয়নি। সুতরাং আন্দোলনের রূপ-রং বদলিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারায় তাদেরকে ফিরে আসতে হবে। তাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিও হালে পানি পাচ্ছে না। মানুষ এসব কথা শুনলে এখন বিরক্তিরোধ করে। প্রকৃত গণতন্ত্র, নিরপেক্ষ নির্বাচন ইত্যাদির বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি আবিষ্কার করে জগতকে শিক্ষাদানের কোনও দায়িত্ব জগতবাসী বাঙালি নেতাদের দেয়নি। এখন এসব বাড়াবাড়ি পরিহার করে সুস্থতার পথে প্রচলিত নিয়ম শৃঙ্খলার মাঝে ফিরে আসা উচিত সবার। আশা করি, বেগম জিয়া, তারেক জিয়া এবং লন্ডন বৈঠকে অংশগ্রহণকারী নেতারা এরকম এক সুস্থ রাজনীতির মাঝে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিবেন।
Bellow Post-Green View