চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

খাবার না দিলে দরিদ্র মানুষ ঘরের বাইরে চলে আসবে

করোনাভাইরাসের কারণে সবকিছু আজ স্থবির, প্রাণচাঞ্চল্যহীন। শহর থেকে গ্রাম কোথাও সেই চিরচেনা কোলাহল নেই, নেই ব্যস্ত মানুষের ছুটে চলা। গ্রামের ছোট বাজার থেকে শুরু করে নগরীর পাঁচতারা হোটেলও আজ বন্ধ। শপিং মল, দোকান, গুদাম-সবখানে তালা ঝুলছে। ব্যস্ত শহরের অলিগলিতে হকারের হাঁকডাক নেই। গ্রামের হাটুরেদের চলাফেরাতেও শত বিধি নিষেধ। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বই এখন চলছে এরকম নিয়ম কানুনের আবর্তে। করোনা থেকে বাঁচতে হলে ঘরে থাকাই উত্তম-এ সাবধান বাণী প্রতিধ্বণিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

সত্যিই অদৃশ্য এক দৈত্যের কাছে থমকে গেছে পুরো পৃথিবী। প্রতিদিনই সারাবিশ্বে এই ভাইরাসের গ্রাসে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। একই সাথে মানুষের বেঁচে থাকা নিয়েও তৈরি হচ্ছে শত সংশয়। এই সংশয় বড় বেশি ঘিরে ফেলেছে দেশের দরিদ্র মানুষকে। যাদের নুন আনতে পানতে ফুরায় তাদের জীবনে করোনা এখন এক মহাআতঙ্ক। আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ কেবলই তীব্র হচ্ছে।জীবন বাঁচাতে খাদ্যের চাহিদাটাই তাই সবার আগে সামনে চলে আসছে। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে সেই চাহিদা পূরণের চেষ্টা চলছে সত্য কিন্তু অনেক জায়গা থেকেই আসছে দুঃসংবাদ। গ্রামের তুলনায় শহরের নিন্মআয়ের মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি বিপদাপন্ন বললে হবে না। জামালপুরে শহরে তাই ত্রাণের ট্র্যাক আটকিয়ে হতদরিদ্ররা খাবার লুট করে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কৃষিভিত্তিক গ্রামাঞ্চলে হতদরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যেও ক্রমশই হাহাকার পুঞ্জিভূত হচ্ছে। বিশেষ করে মূল ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন দুর্গম চর, পাহাড়ি এলাকাগুলো ছাড়াও যেসব এলাকাতে প্রান্তিক বঞ্চিত জনগণের বসবাস বেশি সেখানে হাহাকার যেনো ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এটা ঠিক যে বাজারে খাদ্যের সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। সরকারের কাছে খাদ্যের মজুদও রয়েছে যথেষ্ঠ। করোনা দুর্যোগ শুরু হওয়ার পর থেকে সরকার বারবার বলছে দেশে খাদ্যের কোনো সংকট নেই সরকারের হাতে প্রচুর খাদ্য মজুদ আছে। গত ১৫ মার্চ খাদ্য মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে এই তথ্য দেয় যে, খাদ্যশস্যের সরকারি গুদামজাতকৃত মোট মজুদ ১৭.৫১ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল ১৪.২৯ লাখ মেট্রিক টন এবং গম ৩.২২ লাখ মেট্র্কি টন। খাদ্যশস্যের মজুদ সন্তোষজনক, মাসিক চাহিদা ও বিতরণ পরিকল্পনার তুলনায় পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এ মুহূর্তে খাদ্যশস্যের কোন ঘাটতি নেই বা ঘাটতির কোন সম্ভাবনা নেই। এ কথা সত্য যে সবমিলিয়ে বাজারে খাদ্যের মজুদ ও সরবরাহ বেশ ভাল। কিন্তু যে বিষয়টি সামনে এসেছে তাহলো দরিদ্র মানুষের খাদ্যক্রয়ের সক্ষমতা দিন দিন কমে আসছে। বিশেষ করে ছুটি যত দীর্ঘ হচ্ছে ততই আয় কমে যাওয়া বা বন্ধ হওয়ার কারণে গরিব মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত হয়ে আসছে। আর এ কারণেই একশ্রেণীর মানুষ এখন ত্রাণের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে বা ঝুঁকে পড়ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে গ্রামের দরিদ্র মানুষের মাঝে বিনামূল্যে চাল দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, স্থানীয় সংসদ সদস্য, স্থানীয় সামাজিক-সাংস্কতিক সংগঠনগুলোও বিভিন্ন ধরনের ত্রাণ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের দরিদ্র মানুষের খাদ্য সংকট নিয়ে দুদিন আগে কথা বলেছিলাম মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল হান্নান মোল্লার সাথে। তারুণ্যে জাসদ রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক তিনি। তাঁকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম করোনা ভাইরাসের কারণে দীর্ঘ ছুটি এবং সবকিছু বন্ধ থাকায় স্থানীয় গরিব মানুষের দিনকাল কেমন কাটছে। কতোটা খাদ্য সংকটের মধ্যে পড়েছে দরিদ্রজনেরা। মেম্বর হান্নান মোল্লা উত্তরে বলেন, না পরিস্থিতি এখনও অতোটা খারাপ হয়নি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষী পরিবারে খাবারের তেমন একটা সংকট নেই। তাদের ঘরে খাবার আছে। তবে তুলনামূলক সংকটে ছোট দোকানদার, স্থানীয় ভ্যানচালক, অটোচালক, দিনমজুর, সেলাইকারক, মিস্ত্রি, নির্মাণ শ্রমিক, ইটভাটার শ্রমিকেরা। কাজকর্ম বন্ধ থাকা, বাজার কেন্দ্রীক লেনদেন সীমিত হওয়া এবং অবাধ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে এই ধরনের পেশার সাথে জড়িত মানুষের আয় একদম কমে গেছে। মূলত এই শ্রেণীর কাছেই খাদ্যের সংস্থানটা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।  হান্নান মোল্লা বলেন, তবে সরকারের যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে সেই আওতায় এখন যতটুকু খাদ্য দেওয়া হচ্ছে তার কলেবর দ্রুত বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।  স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, তার শ্রীপুর উপজেলার যে ৮টি ইউনিয়ন রয়েছে এর মধ্যে সব্দালপুর ইউনিয়নেই অন্তত ১৩শতটি কার্ডধারী হতদরিদ্র পরিবার রয়েছে যারা নিয়মিত ১০ টাকা কেজি ধরে ৩০ কেজি করে চাল পান। এর বাইরে যারা ভিজিডি, ভিজিএফ কার্ডধারী তারাও বিনামূল্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল পান। এ ছাড়াও যে কোনো দুর্যোগ মুহূর্তেও হতদরিদ্র পরিবারগুলো বিনামূল্যে ত্রাণের চাল পান। মেম্বর হান্নান মোল্লার মতে, করোনার জন্যে সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক মানুষ নিজ নিজ কাজে যেতে না পারার কারণেই অর্থনৈতিক সংকটটা তীব্র হচ্ছে। আর এখন শুধু চাল দিলেই হচ্ছে না, চালের সাথে খাবার বাবদ যে অন্যান্য খরচ আছে সেগুলোও একটা বড় বিষয়। মানুষ আগের মতো কাজকর্ম করতে পারলে কোনো সমস্যা হতো না। কাজে ফিরে গেলেই সাধারণ মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়াবে। হান্নান মোল্লা আরও বলেন, খাদ্য যারা উৎপাদন করে সেই কৃষক শ্রেণীও করোনার কারণে বেশ বিপাকে পড়েছে। কারণ তাদের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য তারা পাচ্ছেন না। সবজি থেকে শুরু করে সব পণ্যের দামই এখন পড়তির দিকে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাই আরও ভাল পদক্ষেপ ও সুসমন্বয় দরকার। যেখানে অর্থনৈতিক লেনদেনটা থঠশতে হবে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে গ্রামের চেয়ে ছোট-বড় সব শহরের নিন্মআয়ের মানুষের অবস্থা আরও বেশি খারাপ। ক্ষুধার তীব্রতা শহরের শ্রমজীবী ও নিন্মআয়ের মানুষের মাঝে আর বেশি অনুভূত হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বড় বড় শহর বরাবরই দেশের নিন্মআয়ের বৃহৎ অংশের মানুষের আয় রোজগারের প্রধান অবলম্বন।  কিন্তু অলিখিত লকডাউনের কারণে নিন্মআয়ের মানুষেরা এখন কর্মহীন।  গ্রামের তুলনায় শহরের নিন্মআয়ের মানুষের সাংসারিক খরচ কয়েকগুণ বেশি। কেননা সবাইকে নির্দিষ্ট পরিমাণ বাড়ি ভাড়া দিতে হয়, সাথে পানির বিল, বিদ্যুত বিল শোধ করতে হয়। আর সবকিছুই কিনে খেতে হয়। ওএমএস-এর ১০ টাকা কেজির চাল কেনার জন্য সাধারণ মানুষের দীর্ঘলাইন বলে দিচ্ছে খাদ্যের লড়াইটা শহরে তীব্র হচ্ছে। এদিকে শহরের নিন্মআয়ের মানুষের জন্য যে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে চারদিকেই ক্ষোভ-বিক্ষোভ পরিলক্ষিত হচ্ছে। কেননা প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ একেবারেই অপ্রতুল। আবার ত্রাণ বিতরণে বৈষম্যও প্রকট।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যন বুরো (বিবিএস) প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের বাংলাদেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার কমে ২০.৫ শতাংশে আসে। এবং হতদারিদ্রের হার হয় ১০.৫ শতাংশ। সেই হিসেবে দেশে দরিদ্রের সংখ্যা ৩ কোটি ২৮ লাখ এবং হতদরিদ্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ কোটি ৪১ লাখ মানুষ। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে বাংলাদেশের সার্বিক দারিদ্রের হার ছিল ২১.০৮ শতাংশ এবং অতিদরিদ্রের হার ছিল ১১.০৩ শতাংশ। এ কথা সত্য যে করোনার আগ পর্যন্ত আমাদের দারিদ্রের হার সত্যিকার অর্থেই অনেক কমে এসেছিল এবং একই সাথে তীব্র ও মাঝারি ধরনের ক্ষুধায় থাকা মানুষের সংখ্যাও কমে আসছিল। এবার এফএওর বৈশ্বিক ক্ষুধা ও পুষ্টি পরিস্থিতি প্রতিবেদন-২০১৯ এর দিকে তাকানো যাক। এই প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের তীব্র ও মাঝারি ধরনের ক্ষুধায় থাকা মানুষের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। তীব্র ক্ষুধা বলতে যারা এক বেলার বেশি খাবার পায় না। আর মাঝারি বলতে বোঝায় যারা দুই বেলার বেশি খাবার পায় না। ২০১৭ সালে তীব্র ক্ষুধায় থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭৮ লাখ। ২০১৮ সালে তা ১০ লাখ কমে আসে। কিন্তু করোনার কারণে সেখানেও লেগেছে এক ধাক্কা।

বাংলাদেশ গত ১০ বছরের প্রচেষ্টায় দারিদ্র্যকে পরাভূত করে যেভাবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করেছিল তা এখন মহা বিপদাপন্ন ভুল হবে না। আইএমএফ প্রধান ক্রিষ্টিলিনা জর্জিয়েভার সাম্প্রতিক মন্তব্যের দিকে চোখ রাখা যাক। কয়েকদিন আগে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, করোনভাইরাস মহামারির কারণে চলতি বছর বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তীব্র নেতিবাচক হবে। তার মতে, ১৯৩০ সালের মহামন্দার পর বিশ্ব সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বড় ধরনের জের টানতে হবে। এদিকে করোনার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশেই পড়বে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে। চলতি বছরে দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক, যা চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম।

নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক অমর্ত্য সেনও বলেছেন, সামনে খাদ্যের জন্য লড়াইটা হকে মারাত্বক। তিনি ভারতের লকডাউন নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলেছেন, খাদ্যগুদামে যে খাবার মজুদ আছে তা জনগণের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হোক। নইলে পরিস্থিতির বিশাল অবনতি হবে। একথা সত্য ভারতের চেয়ে আমাদের দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কম। আমাদের সরকারের কাছে খাদ্য আছে, বাজারে সরবরাহও ভালো। কিন্তু সুসমন্বয়ের অভাবে হাহাকার ভেসে আসছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কর্তৃক ত্রাণের চাল চুরির ঘটনাও অভাবী মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলছে। প্রধানমন্ত্রী কড়া সতর্ক জানালেও চুরি থামছে না। গরিব মানুষ ক্ষুধার্ত থাকলে, ঘরে খাবার না থাকলে কোনোভাবেই দরিদ্র মানুষ ঘরে থাকবে না। এ কারণেই এখনই নীতি-নির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সামনে ছুটি আরও বাড়লে এলাকাভিত্তিক লকডাউন আরও বাড়লে বঞ্চিতজনের কাছে খাদ্যের লড়াইটা আরও বেশি সামনে চলে আসবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)