চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

খাদ্য ও কৃষিক্ষেত্রে পুনরায় অধিকতর উন্নয়ন সাধনে ফাও এর কর্মপন্থা

কোভিড-১৯ এর ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ কাটিয়ে উঠতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-ফাও  আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে শক্তসমর্থ বিভিন্ন ধরনের পুনর্গঠনমুলক ব্যবস্থা এবং ব্যাপক সাড়া জাগানো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

কোভিড-১৯ মুলত মানবদেহের কার্যকারিতার উপর প্রভাব ফেলে, যার ফলে স্বাস্থ্যকর খাদ্য উৎপাদন এবং সকলের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত করে এ রোগের বিরুদ্ধে শরীরে কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতি আবশ্যক। মানবদেহে প্রতিদিনের পুষ্টি সাধনকারী প্রয়োজনীয় খাদ্যশৃঙ্খলা বর্তমান সময়ে হুমকির সম্মুখীন। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সমন্বিত কৌশল প্রয়োগ প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

এ মহামারীর আগেও দরিদ্রতা, যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং জলবায়ু পরিবর্তন সহ নানা কারণে বিশ্বে খাদ্য ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা স্থবির হয়ে পড়েছিলো।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি ফাও এর ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি এ্যান্ড নিউট্রিশান ইন দ্য ওয়ার্ল্ড, ২০১৯ এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রায় ৬৯০ মিলিয়ন মানুষ অথবা প্রতি ১০ জনে একজন লোক ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকে। কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবে ২০২০ সালের মাঝেই আরও ১৯০ মিলিয়ন মানুষ এই ক্ষুধার্তদের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। এছাড়াও ২০১৯ সালে প্রায় ৩ বিলিয়ন মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবারের অভাব এবং অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগেছে।

কোভিড-১৯ মহামারী এবং এর সাথে সম্পর্কিত লকডাউনের ফলে বন্দিদশায় সীমিত পরিসরে উৎপাদনের কারণে ইতিমধ্যে খাদ্যের যোগান, শ্রমিক স্বল্পতা, আবাদি ফসলের ক্ষতি প্রভৃতি প্রত্যক্ষ করা গেছে। এখন খাদ্য উৎপাদনে বিলম্ব দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন মানুষ খাদ্য উৎপাদন সংক্রান্ত কাজ সমূহ যেমন- উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন, বণ্টন ইত্যাদি কাজের সাথে জড়িত। এ মহামারীর ফলে তার ৩৫ শতাংশ বেকারত্বের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারীরা।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ফাও এ সমস্যা সমাধানে কৃষকদের পর্যাপ্ত টেকসই সহায়তা দিচ্ছে। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ৭টি ক্ষেত্রে কাজ চালানোর মধ্যে দিয়ে পুনর্গঠন কাজটি শুরু করা হয়েছে। এসব সমাধানের সঠিক প্রয়োগের জন্য প্রচলিত পদ্ধতি যথেষ্ঠ না হওয়ায় আরে তিনটি নতুন কলাকৌশল অবলম্বন করা হয়েছে৷ সেগুলো হচ্ছে-

প্রথমত, সব ধরণের সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের সঠিক তথ্য-উপাত্ত দরকার-

সময়োপযোগী এবং কার্যকর ফলাফলের জন্য কোথায়, কখন এবং কীভাবে সহযোগিতা দরকার এ বিষয়ে সঠিকভাবে অবহিত হতে হবে। উপাত্ত সংগ্রহে উর্ধ্বমুখী কার্যকলাপ, বিশ্লেষণ এবং নিম্ন -ঊর্ধ্বগামী পদ্ধতির মাধ্যমে এ কাজটি করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

মহামরীর কারণে সঠিক সময়ে স্বশরীরে গিয়ে উপাত্ত সংগ্রহ করতে না পারার দরূণ ফাও বর্তমানে ভিন্ন উপায়ে দ্রুতগতিতে দেশ, অঞ্চল এবং বিশ্বব্যাপী উপাত্ত সংগ্রহ সম্প্রসারিত করছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, খাদ্য মূল্য এবং মনোভাব বিশ্লেষণের জন্য ফাও সম্প্রতি ‘ফাও ডাটা ল্যাব’ চালু করেছে। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের মধ্যকার উপাত্ত সংগ্রহ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হাতে হাতে উপাত্ত সংগ্রহ ‘জিওসপ্যাশিয়াল প্লাটফর্ম’ এর উন্নতি সাধন করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, সমষ্টিগত কার্য সম্পাদনের জন্য আমাদের সংহতি বাড়াতে হবে-

বিজ্ঞাপন

কোভিড-১৯ এর এই দুর্যোগময় অবস্থা আমাদেরকে একত্রিত করে কাজ করতে উৎসাহিত করেছে, যা আগে কখনও হয়নি। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, কৃষি-বাণিজ্য, টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা, প্রাণীকুল থেকে মানবদেহে রোগ ছড়ানো প্রতিরোধ, সংকল্পবদ্ধ হয়ে মানবিক কাজ সম্পাদনে প্রণোদনা জাগিয়েছে।

বিশ্ব বানিজ্য সংস্থার মতে, এ মহামারীর অপ্রতিরোধ্য সুদূরপ্রসারী প্রভাবসমুহ আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে ক্ষয়কতি বয়ে আনবে এবং ২০২০ সালের মাঝে পণ্য বাণিজ্যে ৩২ শতাংশ লোকসান দেখা দিবে। বর্তমানে খাদ্য সংক্রান্ত অন্যান্য যেকোনো সংকটের মতই, কোভিড-১৯ মহামারী আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহে এবং চাহিদা পূরণে আশংকার সৃষ্টি করেছে, যার ফলে খাদ্য উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

ভবিষ্যতে প্রাণীদেহ থেকে মানবদেহে রোগ ছড়ানোর প্রাদুর্ভাবকে ঠেকাতে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায় অংশীদারদের সমন্বয় সাধন প্রয়োজন। এরই ধারাবাহিকতায় ফাও এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সমন্বিত পদক্ষেপে ফাও এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা- হু সেন্টার গড়ে তুলেছে। এই সেন্টারটি ফাও, হু এবং বিশ্বব্যাপী অন্যান্যদের সহযোগিতায় জুনোটিক রোগ এবং হুমকি এড়াতে কাজ করে যাচ্ছে।

ফলপ্রসূ সাড়া জুগিয়ে আরও কিছু মানবিক কাজ; বিশেষ করে অসহায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কৃষকদের অবস্থার উন্নতি সাধনের চেষ্টা করা হচ্ছে। জাতিসংঘের সকল অঙ্গ সংগঠন, প্রাইভেট সেক্টর, সিভিল সোসাইটির এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের মাঝে চিন্তামূলক পর্যাপ্ত সহযোগিতা এবং অংশীদারিত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে আমাদের কাজ করা দরকার।

তৃতীয়ত, আমাদের অবশ্যই উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করতে হবে-

নির্ভরযোগ্য তথ্য অর্জন,খাদ্য উৎপাদনে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের জন্য নতুন বিনিয়োগ কৌশল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোগত উদ্ধাবন আবশ্যক।

এক্ষেত্রে, ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতের উদ্ভাবন কেন্দ্রিক, ফলাফলভিত্তিক পন্থায় অনেক সমাধান রয়েছে, যেগুলো সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ব্যবহার করে তাদের পদ্ধতি উন্নততর করতে পারে।

খাদ্য সংকট প্রতিরোধ স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধান পর্যন্ত বসে নেই। এ উদ্দেশ্যে ফাও সকল ধরণের সম্ভাব্য ক্ষমতা একত্রিকরণ, বাস্তব উপাত্ত সংগ্রহ, পূর্ব সতর্কতা ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ইত্যাদির উপর নজরদারি করছে।।

সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অসায়- দুর্বলদের সহায়তার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সংকট প্রতিরোধ এবং যেকোনো ধরনের ভাঙন বা ধাক্কা সামলিয়ে খাদ্য ব্যবস্থাপনাকে পুনরায় জোরদার করে তোলা সম্ভব।পুরোনো ব্যবস্থায় অধিকতর উন্নতি সাধনে এসবের বিকল্প নেই।

সম্মিলিত উপায়ে আমরা এমন একটি ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে পারি, যাতে প্রত্যেকেই উপকৃত হয়।

আমি আপনাদেরকে আমাদের সাথে যোগ দিতে এবং এই সংকট সমাধানের অংশ হতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)