চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

খাদ্য উপযোগী খবর ও অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা

খবরের জন্য গলদঘর্ম সাংবাদিক। চাতক পাখির মতো সচিবালয়ে, মেডিকেলে, পার্টি অফিসের সামনে আদালত পাড়ায়। কাঁঠালের মাছির মতো খবরের গন্ধের পেছনে সাংবাদিক। মানুষ এখন খবর খায়। চরমভাবে খায়। সকল সংবাদকক্ষ খবরের খাদ্যগুণ নির্ণয়ে দিনে দিনে অনেক বেশি সুক্ষদর্শী হয়ে উঠেছে। কিন্তু মানুষের খাদ্য বিবেচনা করতে গিয়ে অনেক খবরই এখন খাদ্য তালিকায় ঠাঁই পাচ্ছে না। বলা ভালো ঠাঁই দেয়া হচ্ছে না।

বিষপানে কিংবা গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা এখন আর কোনো খবর নয়। আগে খবরের কাগজে এ খবরগুলোরও বেশ ধক ছিল। এখন যদি গল্প (স্টোরি) বানানো যায় তাহলে খবর হতে পারে। খাদ্য বিবেচনা করে গল্প বানিয়ে লাভ হলে তবে তা স্টোরি হয়। স্থানীয় পত্রিকাগুলোও এখন এসব খবরের মোহ ত্যাগ করেছে। আমি ন্যাশনাল ডেস্কে কাজ করে বুঝি রোড অ্যাকসিডেন্টে মৃত্যুর সংবাদও মৃত্যুর সংখ্যা ভেদে গুরুত্ব পায়। এখানেও খবরে ঠাঁই না পাবার মতো ব্যাপার থাকে। এছাড়া যুগের চাহিদার নীরিখেও অনেক খবর এখন আর খবর হয়ে ওঠে না।

বিজ্ঞাপন

বাসের ধাক্কায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ও ঘটনার যে উত্তাল পরম্পরা তা ভুলে যাবার নয়। অগণন শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আমাদের ট্রাফিক ব্যবস্থার সমুচিত সংস্কার সবার সামনেই এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। দুই বছরে যে ঘটনার রেশ ধরেই আমাদের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের ন্যূনতম শৃংখলা এনেছে বলে মনে হয়।

কিন্তু হায়, কয়েকদিন আগে সন্ধ্যার আগে আগে সদ্য চাকরি পাওয়া বারডেম হাসপাতালের উত্তরায় মা ও শিশু কেন্দ্রের একজন নার্স বাসে উঠতে গিয়ে আরেক বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারালেন নীরবে। ঘটনাটির নীরবতা এতটাই দৃষ্টান্তমূলক যে এ নিয়ে কোথাও কোনো খবর হয়নি। তাসরিন নামের আনুমানিক ২০ বছর বয়সের মেয়েটি সদ্য পাস করে বেরিয়ে বারডেমে চাকরি পেয়েছিলেন। আমি খবর পেলাম ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে যাবার পর। তখন আমার পক্ষে আর এটিকে সংবাদ করার মতো উপযুক্ত প্রয়াস তৈরি হলো না। ঘটনার তৃতীয় দিন দৈনিক ইত্তেফাক সংবাদটি করেছে। এছাড়া আমি নানাভাবে গুগল করে পেয়েছি তিন লাইনের একটি খবর করেছে সিলেটের একটি অনলাইন ‘ক্রাইম সিলেট’।

আমি কেবলই ভাবছি মেয়েটিকে কেন এমন ভাগ্যহত হতে হলো? মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারানোর পর এর কোনো উত্তাপই কেউ টের পেল না। ঘাতক বাসটিকে পুলিশ আটক করলেও তার চালক আর হেলপারকে ধরতে পারেনি। প্রশ্ন হলো সংবাদ হলো না কেন? কী কী অজুহাত দাঁড় করানো যেতে পারে এর পেছনে। আমার মতে যে কারণগুলো হতে পারে:

ক. সন্ধ্যার আগে আগে যখন দুর্ঘটনা ঘটেছে সেসময় ঘটনাস্থলে লোক কম ছিল। ঘটনার ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার মতো লোক ছিল না।

খ. এই সময়টি টেলিভিশন পত্রপত্রিকার সংবাদ সংগ্রহ বা সরবরাহের জন্য অনুকূল নয়।

বিজ্ঞাপন

গ. মেয়েটি শিক্ষাজীবন আপাতত শেষ করেছে বলে তার এক দল সহপাঠী-বন্ধু ছিল না যারা প্রিয় বন্ধুর করুণ মৃত্যু দেখে শোক ও বিক্ষোভে ফেটে পড়বে। যা মূলত সংবাদের গুরুত্বকে অপরিহার্য করে তুলতে পারে।

ঘ. হয়তো দুয়েকজন কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে ফোন করে জানিয়েও ছিলেন। কিন্তু নিহতের সংখ্যা এক, কোনো গাড়ি ভাংচুর, অবরোধ ও বিক্ষোভের মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলে এটাকে খবর গণ্য করা হয়নি।

যতদুর শুনেছি মেয়েটি বাসে প্রায় উঠেই পড়েছিল। ঠিক সেই সময় পাশ দিয়ে একটি বাস এসে তাকে চাকায় পিষে চলে যায়। প্রশ্ন হলো, এটি কি ছোট দুর্ঘটনা ছিল?

এমন ঘটনার প্রাথমিক তথ্য সংবাদমাধ্যমে কে সরবরাহ করবে? সড়ক দুর্ঘটনার চেয়ে তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার সংবাদটি এখন গুরুত্বপূর্ণ। শুধু একজন মারা গেছে তারপরে কিছু হয়নি, সেটি কোনো খবর নয়। তাহলে খবরটি বানাবে কারা, উত্তেজিত জনতা? এই মেয়েটিপ পক্ষে কেউ উত্তেজিত হয়নি। ঘরে ফেরার সময় সবাই যার যার নিজের প্রতি মনোযোগী হয়ে ঘরে ফিরছিলেন। রাস্তায় গাড়ির নীচে পড়ে একজনের জীবন চলে গেল, এতে কার কী?

তার মানে আমরা যত উপরে উঠছি, নীচের অনেককিছুই আমাদের চিন্তা ও মনোযোগ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে। আমরা খবরের আগুনের চেয়ে সেই আগুনের ধোঁয়াকে নিয়ে বেশি খবর বানাতে অভ্যস্ত হচ্ছি। আমরা অপ্রয়োজনীয় খবর তুলে আনার জন্য দলে দলে সাংবাদিক নিযুক্ত করছি, আর সত্য ঘটনা ও সতেজ তথ্য আমাদের আড়ালেই পড়ে থাকছে।

জানি, এখন খবর যত হচ্ছে তার চেয়ে খবর হচ্ছে না বেশি। মানুষ খাবে না তাই দরকারি খবরও খবর হবে না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View