চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ক্ষুদ্রের কি সাধ্য যে বিশালকে বিনাশ করে

“শেখ মুজিবকে আমরা ঈর্ষা করেছি, আমাদের অতিক্রম করে বড় হওয়াতে। সবদিকে বড়, তেজে, সাহসে, স্নেহে, ভালবাসায় এবং দুর্বলতায়। সবদিকে এবং সেই ঈর্ষা থেকেই আমরা তাঁকে হত্যা করেছি। কেবল এই কথাটি বুঝিনি যে ঈর্ষায় পীড়িত হয়ে ঈর্ষিতের স্থান দখল করা যায় না। তাইতো এই ভূখণ্ডে মুজিবের স্থায়ী অবস্থান মধ্য গগনে এবং তাঁর নাম শুনে শোষকের সিংহাসন কাঁপে ” –সরদার ফজলুল করিম।

ঔপনিবেশিক কাল থেকে বাঙ্গালি মুসলমানের চরম দুর্দশাকাল। কুসংস্কার, অদূরদর্শীতা এবং অর্থনৈতিক কারণে পিছিয়ে থাকা বাঙ্গালি মুসলমান প্রায় বিলুপ্তির পথে যাচ্ছিলো। অমিতচারী চারিত্রিক প্রবণতাও অর্থনৈতিক দুর্দশার একটি কারণ ছিল, অধুনা অন্য আঙ্গিকে যা দৃশ্যমান। দুর্দশাগ্রস্ত বাঙ্গালিদের আলাদা ভূখন্ড কিংবা মৃত্তিকাধিকার তো সুদূর, তাদের টিকে থাকাই যেখানে মুশকিল ছিল, সেখানে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন শুধু কল্পনা নয়-উম্মাদগ্রস্ত কল্পনা বলা যায়।

বিজ্ঞাপন

শ্রাবণ বর্ষা ঋতুর মাস। শ্রাবণ মাসে কালো আকাশের একটানা ঝর ঝর। প্রাকৃতিক এই কান্না ভাদ্র পর্যন্ত চলে। বাংলার আকাশ কাঁদে, হাজার বছর ধরে কেঁদে চলেছে। আর এই ক্রন্দন যেনো মহান বাঙ্গালির শোকগাথা। বাইশ শ্রাবণ আর পনেরো আগস্ট দুটি দিনই বাঙ্গালির ক্রন্দনক্রান্ত বর্ষা-বাঙ্গালির বিষণ্ন বিধুর দিন। নিঃস্ব বাঙ্গালির মনন ঋদ্ধ করা মহাপুরুষ রবীন্দ্রনাথের প্রস্থান ছিলো চিরায়ত বৈশ্বিক নিয়মে আর দুর্বল বাঙ্গালির মননে শক্তি জোগানো মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধুর প্রস্থান ছিলো চরম লজ্জাজনক, পৈশাচিক প্রথায়। ঋতুচক্রে বারবার ফিরে আসা দু’টি দিন, ভুলে যাওয়া মানুষকে কেঁদে কেঁদে মনে করিয়ে দেয়- আমাদের অক্ষমতা, আমাদের গ্লানি।

খর্বকায় বাঙ্গালির এক অতিকায় মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধু। হাজার বছরের পিছিয়ে পড়া, পশ্চাৎপদ, অপমানিত, পরাধীন বাঙ্গালির জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করা বিরল এক সিংহহৃদয় নেতা বঙ্গবন্ধু। তাঁর ছিল মহাসাগরসম ঔদার্য। আক্ষরিক অর্থেই এই দেশ তার ঔদার্য ধারণ করতে পারেনি। নিরন্ন, দলিত-শোষিত বাঙ্গালির আজ যে স্বাধীন উত্থান, বিশ্বসভায় দাঁড়ানোর যে শক্তি, আত্মমর্যাদার অহংকার-এসবই একজন বড় মাপের মানুষের অবদান। তাকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে, বাঙ্গালি যে কৃতঘ্নতার পরিচয় দিয়েছে, তাকে অস্বীকার করে, তাকে সংকীর্ণ-দলীয় বৃত্তে আবদ্ধ করে আমরা আরো অধিক অধঃপতিত, আরো পর্বতপ্রমাণ গ্লানিতে চাপা পড়ছি। অকৃতজ্ঞ জাতির ললাটে যুক্ত হচ্ছে কলঙ্কের গাঢ় রেখা।

অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙ্গালির কাদা পথ পেরিয়ে বিশ্বসভায় সদম্ভে নিজের আত্মপরিচয় তুলে ধরার ইতিহাস আমাদের আর দ্বিতীয়টি নেই। অথচ মূঢ় বাঙ্গালি অনুধাবন করতে পারল না আজও। তার কর্মযজ্ঞের পরিধি ব্যাপক ছিল বলেই তার দুয়েকটি বিচ্যুতি অনিবার্য ছিল। বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে ত্রুটিহীন কোন পিউরিটান নেতৃত্ব নেই। এ রকম ত্রুটিহীনতা প্রবল হাস্যকর, অথচ আমরা অর্ধশিক্ষিত বাঙ্গালিরা তার ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েই মুখর। এতে করে নিজেদের আমরা বিশ্বসভায় প্রমাণ করছি আত্মমর্যাদাহীন, ঐতিহ্যহীন হাস্যকর এক জাতি হিসেবে। তাকে অস্বীকার করার কোনো পথ নেই। তার প্রতি যে আচরণ করেছি, সেই পাপ ভারাক্রান্ত গ্লানি থেকে বেরোনোর কোনো প্রয়াসই আমাদের নেই-এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কি হতে পারে?

বিজ্ঞাপন

মানবিক গুণাবলির শ্রেষ্ঠতম অনুষঙ্গ ঔদার্য। সভ্যতার সহস্র সহস্র বছরের ইতিহাসে হাতেগোনা কিছু মানুষ এই বিরল গুণের অধিকারী ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর বিশাল মানবিক ঔদার্য দিয়েই লক্ষ মানুষের নেতা হয়েছেন, লক্ষ মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে পেরেছেন, তাদের নিষ্প্রাণ দেহে প্রাণ সঞ্চার করতে পেরেছেন, সর্বোপরি বাঙ্গালির জন্য একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বাস্তবায়ন করে দিয়েছেন। আর সেই সুমহান ঔদার্যের প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠেছিল কতিপয় হীন কৃতঘ্ন অমানুষ।এই পথভ্রষ্ট কতিপয় উম্মাদ তাকে দৈহিকভাবে নিষ্প্রাণ করে দিলেও, তাঁর ঔদার্যের কণামাত্র স্পর্শ করতে পারেনি। মূঢ় মানুষের এইসব আত্মঘাতী প্রবণতা ইতিহাসের পাতায় পাতায় পড়ে থাকতে থাকতে আজ মলিন। কিন্তু ইতিহাসের সহস্র পৃষ্ঠা ওল্টালেও মিলবে না এমন মহান আলোকিত ঔদার্য। নষ্ট মানুষেল হেরে যাওয়া একেই বলে। একেই বলে সভ্যতার কীটদুষ্ট অনুষঙ্গ।

খাল-বিল নদীর কি ক্ষমতা সমুদ্রের বিশালতা স্পর্শ করে? ক্ষুদ্র মানব মনের কি সাধ্য কোনো বিরাট মানব মনকে বিনাশ করে? অথচ কী হাস্যকর আস্ফালন, কী উদ্ভট নাবালক চিৎকার তাকে অস্বীকার করার, তাঁকে মুছে দেয়ার! কিন্তু ইতিহাস সেই সত্যকেই বুকে ঠাঁই দেয়, যা হাজার বছর আলোকিত, যা সহস্র বছর ভাস্বর, চির অম্লান।

১৯৭৩ সালে চিলির নির্বাচিত সমাজতন্ত্রবাদী প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের শিকার হয়ে কতিপয় দুর্বৃত্ত সেনাসদস্যদের হাতে নিহত হন। আলেন্দে নিজ হাতে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন শেষ পর্যন্ত। প্রায় দু’দশক চিলি শাসন করে বৃদ্ধ সেনাশাসক পিনোচেট আজ বিচারের কাঠগড়ায়। মুদ্রিত ইতিহাস পাল্টে দিয়েও কালের করাল বাস্ততবতার কাছে তাকে পরাজিত হতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সেই সময় বলেছিলেন, আমার অবস্থা যদি আলেন্দের মতো হয়, তবু সাম্রাজ্যবাদের নিকট মাথা নত করব না..। এবং ইতিহাসের কি ভয়ানক পুনরাবৃত্তি! তার কিছুদিন পরই সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তে নৃশংসভাবে বঙ্গবন্ধু প্রাণ হারান।

বৃর্জোয়া রাজনীতির কূটকৌশলে সিদ্ধ ছিলেন না বঙ্গবন্ধু। তাঁর সহজাত বাঙ্গালি মনন তাঁকে সূক্ষ্ম কূট কৌশলী রাজনীতিবিদ বানাতে পারেনি। আর সে কারণেই হয়তো তাঁকে প্রাণ দিতে হলো জাতির ক্রান্তিকালে। আমরা সেই যে হোঁচট খেলাম, আর দাঁড়াতে পারলাম না সোজা হয়ে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে আজ বাংলাদেশ। মর্যাদাহীন বিশেষণের চূড়ায় আজ বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে যে স্বপ্নের সূচনা, তাঁর অকাল বিনাশে দরিদ্র বাংলাদেশের আজকের পরিণতি।

মহান রুশ ঔপন্যাসিক টলস্টয় বলেছিলেন ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।’ হয়তো সেই মহান যোগ্যতা আজ অযোগ্যতা বলে বিবেচিত। সেই অহংকার আজ নিস্ফলের আপ্ত বাক্য। তবু বাঙ্গালির আকাশে শ্রাবণ আসে এখনও, এখনও বাঙ্গালি জীবনে পনেরো আগস্টের সূর্য ওঠে। আমরা খর্বকায়, কৃতঘ্ন বাঙ্গালি চলমান চাকচিক্যের ডামাডোলে হারিয়ে ফেলি নিজেদের, অসুন্দরের আয়োজনে ব্যস্ত থাকি সর্বদা, ক্ষুদ্রস্য জাতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণাজ্ঞানে পড়ে থাকি বেঁচে থাকার মহাযজ্ঞে। আমাদের লজ্জা দিতে, আমাদের মানবজ্ঞানে গ্লানি ঢেলে দিতে, আমাদের অনুশোচনায় দগ্ধ করতে হয়তো এখনও শ্রাবণ কিংবা আগস্টের আকাশ কেঁদে চলে নিরন্তর।

অজ্ঞানতার পাদদেশে আমাদের মরে বেঁচে থাকায় জীবনে শ্রাবণের যে বারিধারা ঝরঝর, তা আর কিছুই নয়, বাঙ্গালির লজ্জা, বেদনা আর গ্লানির ক্রন্দনধারা কেবল।

Bellow Post-Green View