চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ক্ষমা চাইলেন চিকিৎসকরা, ভুল শিকার করল পুলিশ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসীরনগরে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় প্রশ্নবিদ্ধ তদন্তের জন্য হাইকোর্টে এসে ‘ভুল শিকার’ করেছে পুলিশ। আর এঘটনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্টের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা।

এর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ৭ বছরের এক মেয়ে শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ১১ বছরের (ডাক্তারি সনদ অনুযায়ী) আরেক শিশুর বিরুদ্ধে গত ১১ সেপ্টেম্বর থানায় মামলা করে ভিকটিমের বাবা। তবে ওই মামলায় আসামির বয়স উল্লেখ করা হয় ১৫ বছর। একপর্যায়ে মামলার আসামি আগাম জামিন আবেদন করেন হাইকোর্টে। সে আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট গত ৩ নভেম্বর আসামিকে ৬ সপ্তাহের আগাম জামিন দেন এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে একমাসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন। এছাড়া মামলার সিডি ও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়। তবে এরইমধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা আসামির বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১) ধারায় দোষীপত্র দেয়। পরবর্তী সময়ে তদন্ত কর্মকর্তা ও নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

সে প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, ধর্ষণের ঘটনার পরদিন নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশুটিকে ভর্তি করা হয়। আর ৬ সেপ্টেম্বর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ভিকটিম শিশুটিকে জেলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করার পত্রে লেখা হয়, Sexual Assault 3 Dayes Back’। আবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে দেয়া মেডিকেল রিপোর্টে বলা হয়, ‘NO EXTARNAL FINDING’। তবে জেলা সদর হাসপাতালের রিপোর্টের মতামতে বলা হয়, ‘ON PHYSICAL & PATHOLOGICAL, RADIOLOGYCAL EXAMINATION WE FIND SIGN OF SEXUAL ASSELT WITHIN 72 HOURES.’ কিন্তু এরপর আবার হাইকোর্টে দেয়া প্রতিবেদনে ক্ষমা চেয়ে বলা হয় মতামতের জায়গায় ভুলবশত ‘SEXUAL ASSULT WITHIN SPECIFIED TIME, এর স্থলে ‘SEXUAL ASSELT WITHIN 72 HOURES’ লিখা হয়েছিল। পরবর্তীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ধর্ষণ সংক্রান্ত সংশোধিত একটি রিপোর্ট দেয়, যা মামলার ডকেটে সংযুক্ত করা হয়।’

এমন অসামঞ্জস্যতা দেখে গত ১৭ জানুয়ারি বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ ধর্ষণের মামলাটি বাতিল প্রশ্নে স্বপ্রণোদিত রুলসহ আদেশ দেন। ওইদিন আদালত তার আদেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জনসহ ৯ চিকিৎসক এবং এসপি-ওসিসহ মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে ১৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের তলবে করেন। সে অনুযায়ী বৃহস্পতিবার হাইকোর্টে হাজির হন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিছুর রহমান, নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এটিএম আরিফুল হক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান। এছড়া সিভিল সার্জন ডা. একরাম উল্লাহকে সাথে নিয়ে হাজির হন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. একরামুল রেজা, ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষা বোর্ডের সদস্য ডা. ফাহমিদা আক্তার, ডা. জিনান রেজা, ডা. তোফায়েল হক, ডা. ফরিদা ইয়াসমিন এবং নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. সৈয়দ মো. শাহরিয়ার, ডা. তাসনিম তামান্না ও ডা. মো. শফিকুল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

একপর্যায়ে হাইকোর্ট অসামঞ্জস্যপূর্ণ ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট, গুরুত্বপূর্ণ শব্দের বানান ভুল ও নারী-পুরুষের রিপোর্টের ফর্ম অভিন্ন করায় উপস্থিত চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘হাসপাতালে হাজিরা দেওয়ার জন্য এসে
আমাদের জীবন আপনাদের ক্লার্ক, পিয়নদের হাতে ছেড়ে দিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যাস্ত হলে তো এমন হবেই। তবে আপনাদের কাছ থেকে এটা প্রত্যাশিত নয়। তখন এঘটনার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চান সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা। এরকম আর কখনো হবে না বলে তারা প্রতিশ্রুতি দেন।’

এরপর হাইকোর্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘মেয়েটি বয়স যখন সাত বছর এবং ছেলেটির বয়স ১১ বছর তখন কি ধর্ষণের অভিযোগ এনে নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় মামলা করা যায়? দুজই যেখানে শিশু সেখানে ৯(১) ধারা কেন? আবার আপনি মামলায় লিখেছেন ‘গনধর্ষন’! এসময় তদন্ত কর্মকর্তা বলেন মাননীয় আদালত আমার ‘ভুল হয়েছে’। তখন আদালত বলেন আপনি কয়বার ভুল করবেন? আমারা আদেশ দেয়ার পর আপনি আবার হাসপাতালে গিয়ে আবার একটা সার্টিফিকেট বানালেন!

একপর্যায়ে এসপির উদ্দেশ্যে আদালত বলেন, ‘জনগণ আপনাদের বন্ধু বলে, পুলিশ শব্দটির প্রতিটির অক্ষরের মধ্যে এক একটা মিনিং (অর্থ) রয়েছে। সে মিনিং তো ফুলফিল করতে হবে। আপনার তদন্ত কর্মকর্তা ছেলেটিকে ৯(১) ধারায় আসামি করে চার্জশিট দিল। এই ধারায় তো এখন মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু এই মামলার ঘটনায় কি ৯(১) ধারা চলে?

এসময় এসপি আদালতকে বলেন, ‘মাই লর্ড, আমাদের কাজ করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়ত হয়। তবে ইচ্ছাকৃত ভুল হলে প্রয়োজনীয় পুলিশের পক্ষ থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

এরপর হাইকোর্ট আজকে হাজির হওয়া সবাইকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেন। তবে প্রয়োজনে পরবর্তিতে এবিষয়ে কাউকে ডাকা হলে আদালতে হাজির হতে বলা হয়। এছাড়া নাসিরনগরের এই ঘটনায় পুলিশ মহাপরিদর্শক ও স্বাস্থ্য সচিবের মাধ্যমে করা দুটি তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর শুনানির জন্য আগামী ১১ মার্চ দিন ধার্য করেন আদালত। আজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দীন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মনিরুল ইসলাম। চিকিৎসদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী বাকির উদ্দিন ভূইয়া। আর আসামি পক্ষে ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইডের আইনজীবী কুমার দেবুল দে।