চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ক্ষমতায় গড়া বিএনপি ক্ষমতার কাছেই হারছে

সংগঠন প্রতিষ্ঠা, সাংগঠনিক মৈত্রী ও আদর্শিক এক চরম স্ববিরোধিতার মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সেনাকর্মকর্তা ও মুক্তিযুদ্ধের একটি সেক্টরের কমান্ডার। একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে তিনি ক্ষমতায় চলে এলেন। তখন মন্ত্রিত্ব, নেতৃত্ব ও ক্ষমতার গন্ধে অনেকেই বিএনপিতে চলে আসল। ন্যাপ, সাম্যবাদী দল, সর্বহারা পার্টি, পূর্ব বাংলা কমিউনিষ্ট পার্টি, ইউপিপি প্রভৃতি বাম দলের নেতারাও ক্ষমতার নেতৃত্বের সুগন্ধে মুগ্ধ হয়ে দলে দলে যোগ দিতে লাগলো বিএনপিতে। জিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে বৈধ করতে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হয়ে গেল সাম্যবাদী (এমএল)নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা। আরও আসলো মুসলিম লীগ ও স্বাধীনতাবিরোধী চিহ্নিত ব্যক্তিদের অনেকেই। জনগণের মাঝে আওয়ামী লীগ হতে নিজের পৃথক সত্তা তৈরী করতে জিয়াউর রহমান নিজেকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা দাবী করলেন। বাকশালের বিপরীতে তিনি নিজেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রেরও প্রবক্তা দাবী করলেন। অনুগত লেখকদের দিয়ে তার রাজনৈতিক মতবাদের উপর বইও লেখালেন তিনি।

 

ডান, বাম, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার সবাই জাতীয়তাবাদী দলের পতাকাতলে সমবেত হলো। যে রাষ্ট্রীয় চার নীতির উপর ভিত্তি করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। মেজর জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার হয়েও চার নীতির তিন নীতিই কেটে দিয়েছিলেন। তিনি সংবিধান হতে কেটে দিলেন বাঙালী জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। যৌবনে তুখোর সমাজতন্ত্রী, বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী অনেক নেতাকেও দেখা যায় সেদিন নিজের মতাদর্শের বিপরীতে কেবল ক্ষমতার মোহে জিয়ার স্তুতি করতে। তিনি গড়ে তুললেন ছাত্র রাজনীতিও। সানাউল হক নীরু, গোলাম ফারুক অভি সহ অনেকেই অস্ত্র হাতে তুলে নিলেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে প্রতিষ্ঠা করতে। দখলে নিয়ে নিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাস ও হল। অস্ত্রের ঝনঝনানিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাস ও হলগুলো। চালু হয়ে গেল ক্ষমতা ও পেশি শক্তি দিয়ে হল ও ক্যাম্পাস দখলের অপসংস্কৃতি। চালু হয়ে গেল যে দল ক্ষমতায় যায় সেই দলের সমর্থনপুষ্ট কাউকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাইস চ্যান্সেলর বানানো। দল বদল হলে বদল হয়ে যায় ভাইস চ্যান্সেলরও। শিক্ষকরাও বিভক্ত হয়ে গেলো দুই দলে। কেউ সরকার দল বিএনপি পন্থী, কেউ বিরোধী দল আওয়ামী লীগ পন্থী। শুধু কি তাই? বিভক্ত হয়ে গেলো সাংবাদিক সমাজও।

জাতীয় প্রেসক্লাব দখলে নেয়ার অপসংস্কৃতি গড়ে ওঠে। যে দল ক্ষমতায় সে দল পন্থীদের দখলে চলে যেতো প্রেসক্লাব। বাংলা একাডেমী, জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র, শিল্পকলা একাডেমী, সাংস্কৃতিক সংগঠন এগুলোও হয়ে উঠল দল ও ক্ষমতা নির্ভর। শুধু কি তাই? আরও চালু হয়ে গেল বিল, হাওড় ও নদী দখল। ক্ষমতার বদলের সাথে সাথে এগুলোর ভোগ দখলকারীরাও বদল হয়ে যায়। জিয়ার বিএনপিতে যারা যোগ দিয়েছিল তারা মূলত ক্ষমতার সুফল নিতেই যোগ দিয়েছিল। এসব যোগদানের সাথে আদর্শিক চেতনার কোনো যোগ নেই। সমাজতন্ত্রের রাজনীতি করেছে এমন নেতাও জিয়ার বিএনপিতে যোগ দিয়েছে। অথচ জিয়া সংবিধান হতে সমাজতন্ত্র কেটে দিয়েছে। কিন্তু এজন্যও কতিপয় সমাজতন্ত্রীর বিএনপিতে যোগ দিতে বাঁধেনি। যারা শ্রেনী সংগ্রাম করে জেল খেটেছে তাদেরও বাঁধেনি শ্রেনী স্বার্থের পাহাড়াদার হতে? মুক্তিযুদ্ধ করেছে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মূল নীতি বিসর্জন দিলেও অনেক মুক্তিযোদ্ধার জিয়ার বিএনপিতে যোগ দিতে বাঁধেনি। ক্ষমতার সুফল ভোগ করতে হুড়মুড় করে বিভিন্ন স্তরের মানুষ বিএনপিতে ঢুকে যেতে থাকল সেদিন। তারা গঠন করলো জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল।দেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধারাই এতে যোগ দিল।

বিজ্ঞাপন

কই এখনতো কেউ বিএনপিতে যোগ দেয়না। জেলা,উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে সেদিন ঘটতো তুমুল প্রতিযোগিতা। এখন বছরের পর বছর কেটে যায় জেলা উপজেলার আহ্বায়ক কমিটির মধ্যদিয়ে। বিএনপির গঠনতন্ত্র কী বলে? কতোদিন থাকতে পারে আহবায়ক কমিটি?

বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল এ, কে, এ ফিরোজ নুন নামের একজন একটি বই লিখে ফেললেন। বইটির নাম দিলেন জিয়া কেন জনপ্রিয়। কত লেখক তাকে স্তুতি করে এ বইটিতে নিবন্ধ লিখলেন। এখন কি কেউ লিখবেন বিএনপি কেন অসহায়। খালেদা জিয়া কেন অসহায়। দলটির গঠনতন্ত্রে রয়েছে, নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, স্থায়ী কমিটি বা যে কোন পর্যায়ের যে কোন নির্বাহী কমিটির সদস্য পদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
(ক) ফৌজদারী বিধিতে দণ্ডিত ব্যক্তি।
(খ) ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ৮ বলে দন্ডিত ব্যক্তি।
(গ) দেউলিয়া
(ঘ) উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি।
(ঙ) সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি।
বিএনপি কি গঠনতন্ত্রের নির্দেশনা মানছেন? তারেক রহমান কি দণ্ডিত ও দুর্নীতিগ্রস্থ নন? তাকেই দলটি কিভাবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বানালেন? এতে কি গঠনতন্ত্র লংঘিত হলোনা?

ক্ষমতায় থাকার সময় জিয়াকে নিয়ে কবিতাও লিখেছে অনেক কবি। সোচ্চার থেকেছে তার সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাস। কিন্ত এখন কে লিখবে কবিতা? জাসাসেরও কোনো নড়াচড়া নেই। গানও গেয়েছে কত গায়ক। অসহায় অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়েতো কেউ কবিতা গান রচনা করছেনা এখন কেউ গাইছেনা গান। কে লিখবে কবিতা কে গাইবে গান? ক্ষমতাহারাকে নিয়ে লিখলে ও গাইলে লাভটা কী।বরং লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। তাকে পড়তে হবে বর্তমান ক্ষমতাধরের রোষানলে। ক্ষমতার স্তুতি সবসময়ই হয়। এরশাদ জলে নেমে বন্যার্ত মানুষদের দেখতে গেলেন। গান রচনা হয়ে গেলো, আমি যেতে চাই বন্যার মানুষের কাছে। বহু ঘাটের জল খাওয়া মানুষদের নিয়ে গঠিত বিএনপি এখন ক্ষমতার বাইরে। তাই তাদের কোন কবিতাও নেই, গানও নেই। আন্দোলনও, ভবিষৎ পরিকল্পনাও নেই। যেনো ক্ষমতায় এলেই সবকিছু হবে। ক্ষমতার মধ্যদিয়ে গঠিত দলটি ক্ষমতাতেই হেরে গেল। এ দলটির হাব ভাব দেখে মনে হয় না যে আর কোনদিন উঠে দাঁড়াতে পারবে। দলটির সাংগঠনিক আত্মবিশ্বাস, শক্তি, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের যোগ্যতা কিছুই নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন