চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ক্রিকেট দলের নয়, পেঁয়াজের ডাবল সেঞ্চুরি!

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ভারত সফরে গিয়ে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে দলীয়ভাবে ডাবল সেঞ্চুরি করতে না পারলে কি হবে, এদিকে দেশের মাটিতে পেঁয়াজ একাই ডাবল সেঞ্চুরি করেছে! অভিনন্দন পেঁয়াজ, প্লিজ কিপ ইট আপ!

দেশের প্রায় সর্বত্রই পেঁয়াজ অগ্নিমূল্য। ঝাঁঝে আমজনতার ‘চোখে জল!’ আর কত বাড়বে পেঁয়াজের দাম? এ প্রশ্ন এখন ভোক্তাদের। রাজধানীর অনেক স্থানে এখন পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সরকারি নানা উদ্যোগেও কমছে না নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে স্বল্পআয়ের মানুষ। অবস্থা এমন যে, বাজার থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সব জায়গায় এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘পেঁয়াজ’। যারা আগে বাজারে গিয়ে দুই কেজি পেঁয়াজ কিনতেন তারা এখন কিনছেন এক কেজি। অনেকেই আবার বলছেন, পেঁয়াজ না খেলে কি হয়? পেঁয়াজ ছাড়া কি রান্না হয় না?

অথচ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করলেও দাম এতটা বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। কারণ বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ দেশে রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গতবছর থেকে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ পেঁয়াজ দেশে আছে তা চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। তাহলে এভাবে লাগামহীনভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে কেন? এ প্রশ্নের জবাব কারও জানা নেই।

গত সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অস্থির হয়ে উঠে পেঁয়াজের বাজার। ২৯ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে ভারত। বাংলাদেশ আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের ওপরই নির্ভরশীল। ফলে দেশের বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়তে থাকে। তখন দুই দিনের মধ্যে কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকা ছাড়ায় দেশি পেঁয়াজের দাম। মন্ত্রীদের বাগাড়ম্বর, বাজার তদারকি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতা, বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ সব কিছুর ফলাফল হলো পেঁয়াজের দাম এখন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে।

পেঁয়াজ এখন আকস্মিকই হিট-নায়িকাদের মতো আলোচিত হয়ে উঠেছে। বিশ-পঁচিশ টাকা কেজির পেঁয়াজ সেঞ্চুরি, ডাবল সেঞ্চুরি পার করেছে। কোথায় গিয়ে যে থামবে-সেটা ঠাহর করা যাচ্ছে না!
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আসা বন্ধ হওয়ার কারণেই এর দামের এই ঊর্ধ্বগতি। হবেও হয়তো। যদিও আমাদের দেশে কোনো একটা বিষয়ে হুজুগ সৃষ্টি আর জিনিসপত্রের দাম বাড়ার জন্য কোনো কারণ লাগে না। আমাদের দেশে জীবনের দাম বাড়ে না, সৃজনশীলতা বা স্বপ্নের দাম বাড়ে না, এমনকি মানুষের দামও বাড়ে না, বাড়ে শুধু বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। এই দাম শুধুই বাড়ে। কারণে বাড়ে, অকারণে বাড়ে। বাড়তেই থাকে।

জিনিসপত্রের দাম বাজেটের আগে বাড়ে, পরেও বাড়ে। ঝড়, বৃষ্টি হলে বাড়ে, না হলেও বাড়ে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাম বাড়লেও বাড়ে। ভোটারসহ নির্বাচন, ভোটারবিহীন নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের শাসনামলে বাড়ে, এমনকি অনির্বাচিত সরকারের আমলেও বাড়ে। রমজানের আগে বাড়ে, পরেও বাড়ে। ঈদে বাড়ে, বর্ষায় বাড়ে, সিজন-অফসিজন সব সময় বাড়ে। তবে দাম একবার বাড়লে তা আর কমে না। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাম কমলেও আমাদের দেশে দাম কমে না। এমনকি দেশে বাম্পার ফলন হলেও খাদ্যশস্যের দাম কমে না।

বিজ্ঞাপন

মানুষের বয়সের মতো, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মতো, আমাদের জীবনের সামগ্রিক হতাশার মতো জিনিসপত্রের দাম কেবল বাড়ে, বাড়তেই থাকে। দাম অবশ্য আপনা-আপনি বাড়ে না, বাড়ানো হয়। বলা বাহুল্য, এ দাম বাড়ার ক্ষেত্রে আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, আড়তদার, চাঁদাবাজ, আন্তর্জাতিক বাজার ইত্যাদির ভূমিকা থাকলেও সরকারি নীতির ভূমিকাও উপেক্ষণীয় নয়।
তবে আশার কথা হচ্ছে হচ্ছে এসব নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও বড় বেশি ক্ষোভ নেই। এরও অবশ্য কারণ আছে। আমাদের দেশের শাসকরা নানা কৌশলে মানুষের সহ্য শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে যদি একটু একটু করে নির্যাতন করা হয়, আঘাত করা হয়, তাহলে এক সময় তা সয়ে যায়। এরপর আঘাতের মাত্রা বাড়ালেও খুব একটা ভাবান্তর হয় না।

আমাদের দেশের মানুষকেও একটু একটু করে আঘাত ও নির্যাতন চালিয়ে সর্বংসহা বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন মানুষ ভীষণ অসন্তুষ্ট হলেও খুব একটা বিক্ষুব্ধ হয় না। মানুষের মধ্যে এখন মান-অপমান বোধ নেই, নেই যন্ত্রণা বা কষ্ট। কাউকে জুতাপেটা করলেও এ বিষয়ে সে শোক বা অনুতাপ করে না। বরং সেই জুতাটা রেক্সিন, না লেদারের- সে বিষয়ে তৃতীয় কারও সঙ্গে আলোচনা করে।
দেশজুড়ে এখন পেঁয়াজ নিয়ে চলছে নানা রসিকতা। কেউ বলছেন, পেঁয়াজ এমন জিনিস যা কিনতে গেলেও চোখ থেকে জল ঝরে, কাটতে গেলেও চোখ থেকে জল ঝরে। এক বন্ধু লিখেছেন, আরেক বন্ধু ফেসবুকে আকুল আবেদন জানিয়েছেন, আত্মীয়স্বজনদের বাসায় গেলে মিষ্টি না নিয়ে, বরং এক কেজি পেঁয়াজ নিয়ে যান। খুশি হবে। আরেকজনের উপদেশ: পিয়াঁজের বদলে মুলা খান। আর বাড়ির সামনে মুলা ঝুলিয়ে রাখুন। মুলার দিকে তাকিয়ে আপনি অনন্তকাল বোঝা বইতে পারবেন। কারও কারও প্রস্তাব শুধু পেঁয়াজ নয়, পাশাপাশি গরুর মাংস ১৫০০ টাকা আর খাসির মাংস ২৫০০ টাকা করুন। কারণ পেঁয়াজ বেশি লাগে এই দুইটি জিনিসে। এই তিনটির দাম যদি আকাশছোঁয়া হয়, তাহলে পেঁয়াজের সঙ্গে গরু-খাসি খাওয়া বন্ধ হবে। আর তাহলে হার্টের রোগ, কোলেস্টেরল, ব্লাড প্রেসার, কোলন ক্যানসার এসব রোগ থেকে সবাই রেহাই পাবে।

উল্লেখ্য, ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে পেঁয়াজের বিকাশ ঘটেছে বলে অনেক পেঁয়াজবিদ মনে করেন। ব্যাপারটিকে অযৌক্তিক বলা যাবে না। মাংসপ্রিয় মুসলিম শাসকদের হাত ধরে এই বাংলামুলুক এমন পেঁয়াজময় হওয়াটা মোটেও অবিশ্বাস্য নয়।  এখন আমাদের দেশে পেঁয়াজ ছাড়া ব্যঞ্জন- ভাবাই যায় না। তাই পেঁয়াজের দাম বাড়লে গণমাধ্যমে হৈচৈ পড়ে যায়। এমপিরা পর্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় সংসদে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সরকার ও বিরোধী দলীয় সিনিয়র সংসদ সদস্যরা।

তারা অভিযোগ করে বলেছেন, বাজারে পেঁয়াজের ঘাটতি না থাকলেও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কারসাজির মাধ্যমে মূল্য বাড়ানো হচ্ছে। তাই কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। একজন ক্ষুব্ধ এমপি তো পেঁয়াজের দামবৃদ্ধিকারীকে বন্ধুকযুদ্ধে ‘হত্যা’র প্রস্তাব করেছেন! ওই এমপির ভাষায়: অনেক ফেনসিডিল ব্যবসায়ী রাস্তাঘাটে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মরে যায়। পেঁয়াজের মূল্য যারা বাড়াচ্ছে, তাদের একটা বন্দুকযুদ্ধে মরে যাক। তাহলে এটা একটা উদাহরণ হবে!

তবে পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর পেছনে ‘সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ নয়, বরং এটাকে ‘সরকারি ষড়যন্ত্র’ বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল, ভারত থেকে না আসা, ব্যবসায়ীদের কারসাজি-এগুলো ভাঁওতা মাত্র। বুঝতে হবে যে, আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে যতটুকু তেজ বা ঝাঁঝ, তা মোটামুটি পেঁয়াজের গুণ। কারণ পেঁয়াজ খেলে মানুষের ‘তেজ’ বাড়ে-এমন একটা ধারণা সমাজে প্রচলিত আছে। তাইতো হিন্দু বিধবা কিংবা সন্ন্যাসীরা নিরামিষ খায়। নিরামিষে পেঁয়াজ নিষিদ্ধ। পেঁয়াজকে আমিষ হিসেবে গণ্য করা হয়।

পেঁয়াজের সীমাহীন দামের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই জিনিস খাওয়া বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে মানুষের সামগ্রিক তেজ বা বারুদ আরও নিম্নগামী হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, মানি না মানব না-র পরিবর্তে মানুষ রসিকতা করছেন। ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন। পেঁয়াজের এই অবিশ্বাস্য মূল্যবৃদ্ধির পেছনে শাসক গোষ্ঠীর অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকার অভিসন্ধি কাজ করছে বলে তারা মনে করছেন।  ব্যাপারটিকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না! ক্ষমতায় থাকার জন্য মানুষ কত কিছুই তো করে!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View