চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ক্রিকেটের ‘তীর্থভূমি’তে, ক্রিকেটের ‘ধর্মযুদ্ধ’

আবারও লড়াইয়ে মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান। মহা অনিশ্চয়তার মোড়কে ঢাকা স্নায়ুচাপের অগ্নিপরীক্ষার ম্যাচের ঘটনাস্থল এবার ক্রিকেটেরই জন্মভূমি বা তীর্থভূমি ইংল্যান্ডের শহর ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ড। টি-টুয়েন্টি বিশ্ব আসরের প্রথম সংস্করণের মহানাটকীয় এবং চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গত আসরের ফাইনালের দুই প্রতিপক্ষ আবার সামনাসামনি। যে লড়াইকে ক্রিকেটের তীর্থভূমিতে, ক্রিকেটের ‘ধর্মযুদ্ধ’ বললেও হয়তো ভুল হবে না।

ভারত-পাকিস্তান যখনই ক্রিকেট মাঠে পরস্পরের বিরুদ্ধে নামে, তখনই উত্তেজক কিছু ঘটে। এবারও তেমন কিছুর আশায় রয়েছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। উত্তেজনার পারদ যখন বাড়ছে, তখন এই ম্যাচ নিয়ে উত্তেজনায় আছেন দুই দেশের সাবেকরাও। তাই ম্যাচটি দেখতে আগেই ইংল্যান্ডে পা রেখেছেন ভারত-পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী দলের অনেক সদস্য।

বিজ্ঞাপন

ধারাভাষ্যের জন্য আগে থেকেই যেমন সেখানে রয়েছেন ইমরান খানের বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ছাত্র ওয়াসিম আকরাম। ‘সুইং রাজার’ সঙ্গে একই ধারাভাষ্য কক্ষে বসে ম্যাচ দেখতে দেখতে হয়তো নিজের পুরনো স্মৃতি মনে করবেন সৌরভ গাঙ্গুলি। থাকবেন রমিজ রাজা, হার্সা ভোগলে এবং সঞ্জয় মাঞ্জরেকাররাও।

চরম উত্তেজনার এ দ্বৈরথের ম্যাচ নিয়ে ক্রমেই চড়ে যাচ্ছে বাজির দর। মহাযুদ্ধের নিষ্পত্তি হওয়ার আগে ক্রিকেটামোদীদের মনে আপাতত একটাই প্রশ্ন- কে জিতবে? ভারত না পাকিস্তান? আসরটির নাম যেহেতু বিশ্বকাপ, মহারণের আগে তাই ভারতীয়দের মনের জোরটাই বেশি।

১৯৫২ সালে টেস্টে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয় দুই প্রতিবেশী। রাজনৈতিক নানা কারণ পাকিস্তান-ভারত ক্রিকেট যুদ্ধের মাঠকেন্দ্রিক উত্তেজনাকে নিয়ে গেছে মাঠের বাইরে। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার অ্যাশেজ উত্তাপ ছাড়িয়ে গেছে বহু আগেই। দুই চিরবৈরী প্রতিবেশীর ক্রিকেটীয় যুযুধানকে রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনার দ্বৈরথের সঙ্গে তুলনা করেছিল মার্কিন দৈনিক ‘নিউইয়র্ক টাইমস’।

কিন্তু শুধু ‘বিশ্বকাপ’ বিবেচনায় আনলে পাকিস্তান-ভারত দ্বৈরথ কি আসলেও দ্বৈরথ? ছয়বারের মুখোমুখিতে প্রতিবারই জয়শূন্য পাকিস্তান। শুধু ওয়ানডে নয়, টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপেও ছবিটা একই। পাঁচবার ভারতের মুখোমুখি হয়ে যে একবারও জেতেনি পাকিস্তান!

এই বিশ্বকাপেও ছবি একইরকম। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি পাকিস্তান। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত জয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল তারা। তাদের মনের জোরে আবার ধাক্কা লেগেছে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে।

সর্বশেষ পারফরম্যান্স ধরলে এই ম্যাচে এগিয়ে থাকবে ভারতই। নিজেদের প্রথম দেখায় সাউথ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকে হারিয়েছে বিরাট কোহলির দল।

কিন্তু প্রতিপক্ষের নাম যখন পাকিস্তান, তখন কোনো কিছুই আগাম অনুমান করা কঠিন। পাকিস্তান দলকে হালকাভাবে নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ নির্বাসনের খাঁড়া কাটিয়ে গত টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে দলে ফিরেছেন পেসার মোহাম্মদ আমির। ইংল্যান্ডের মাটিতেই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে ভারতের টপঅর্ডারের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে প্রমাণ করেন মাঠের বাইরে থাকলেও তার ধার এতটুকু কমেনি।

যদিও এই ম্যাচকে অন্য ম্যাচের মতো করেই দেখছেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। তাতেও উত্তেজনার পারদ না কমে বরং ক্রমশ বাড়ছে।

টি-টুয়েন্টি বা বিশ্বকাপে এগিয়ে থাকলেও এই আয়োজক দেশের কারণে আবার এগিয়ে থাকবে পাকিস্তান। ইংল্যান্ড যে সবসময়ই আশীর্বাদের ঘাঁটি তাদের জন্য। ইংলিশ ভূমিতে সবশেষ এ ভারতকে হারিয়েই আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতে পাকিস্তান। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয় ছিল আমিরের জন্য এক নতুন জীবন পাওয়া। যে ইংল্যান্ডে ‘পাপের সাগরে’ ডুবেছিলেন, সেখানেই প্রত্যাবর্তনের পর ‘পুণ্যে’ ভরিয়ে দেন তিনি।

ভেন্যুর কারণে পাকিস্তান এগিয়ে থাকলেও বর্তমান পারফরম্যান্সের বিচারে ভারতকেই এগিয়ে রাখছেন দুদেশের সাবেকরা। কপিল দেব ও ওয়াসিম আকরাম এই ম্যাচে এগিয়ে রেখেছেন ভারতকে। দুই দেশের অন্যান্য সাবেকরাও কোহলির দলকে এগিয়ে রেখেছেন।

পাকিস্তানকে জিততে হলে নিজেদের সীমার বাইরে গিয়ে কিছু করতে হবে। ম্যাচের আগেরদিন এক সাক্ষাতকারে এভাবেই বলেছেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক মুশতাক মোহাম্মদ।

তিন ম্যাচে ভারতের পাঁচ পয়েন্ট। সাউথ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর নিউজিল্যান্ড ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসে গেলে এক পয়েন্ট পায় ভারত। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। চার ম্যাচে দুটোতে হেরে এবং একটা বৃষ্টিতে পণ্ড হয়ে সরফরাজের ঘরে এখন মাত্র তিন পয়েন্ট। সেমিফাইনালের অঙ্কে থাকতে হলে রোববার ভারতকে হারাতেই হবে। কাজেই ভারত নয়, অনন্ত চাপ নিয়ে শুরু করতে হবে আমির-ওয়াহাবদেরই।

এই ম্যাচের আগে উত্তাপ ছড়িয়ে দুদেশের দুই বিজ্ঞাপন। স্টার স্পোর্টসের আগে করা ‘ভারত হল পাকিস্তানের বাবা’ এই বিজ্ঞাপনের পর পাল্টা হিসেবে পাকিস্তানের জাজ টিভি ভারতীয় সেনাবাহিনীর উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানকে নিয়ে আরেকটা বিজ্ঞাপন বানায়। যাকে ধরেও পরে ছেড়ে দিয়েছিল পাকিস্তান।

বিজ্ঞাপন

তবে উত্তেজনার আবহে বিরাট কোহলি বলেছেন, ‘আমাদের শুধু মাঠে নেমে শান্ত ও রিল্যাক্সড থাকতে হবে। নিজেদের কাজটা করে যেতে হবে।’

মনের কোণে লড়াইয়ের বারুদ থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বী অধিনায়ক কোহলির ব্যাটিং থেকে রসদ সংগ্রহের কথা বলেছেন পাকিস্তান ব্যাটিং স্তম্ভের অন্যতম খুঁটি বাবর আজম।

বিশ্বকাপ যাইহোক, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ছবিটা আলাদা। সেখানে পাকিস্তান এগিয়ে ৩-২। দু’বছর আগে ওভালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে ফেভারিট হিসেবে শুরু করেছিল ভারত। কিন্তু ফখর জামানের সেঞ্চুরি আর আমিরের প্রথম স্পেল ভারতকে ট্রফি জিততে দেয়নি। তারপরে শেষ সাক্ষাতে ২০১৮ সালে ভারত এশিয়া কাপে পাকিস্তানকে সহজে হারালেও সেই টুর্নামেন্ট আর আইসিসি টুর্নামেন্টের ফাইনাল এক নয়। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে হারের ঘা তাই এখনো শুকায়নি কোহলিদের।

ম্যাচের আগে ভারতের যা একটু কমতি শেখর ধাওয়ানকে নিয়ে। ইনজুরির কারণে তিন সপ্তাহের জন্য মাঠের বাইরে চলে গেছেন এ ওপেনার। শেখরকে নিয়ে আফসোস একটু বেশি, কারণ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই দারুণ এক সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি, সেই সঙ্গে বড় ম্যাচেও জ্বলে উঠতে জানেন বলে তার নাম হয়েছে ‘গব্বর’।

পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্লাসপয়েন্ট, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে হেরে যাওয়া ম্যাচে আমিরের বোলিং। বিশ্বকাপের দলে একেবারে শেষ মুহূর্তে ঢোকা আমির সেই ম্যাচে ৩০ রানে নিয়েছেন ৫ উইকেট। ভারতের টপঅর্ডারকে ভাঙতে আমিরই পাকিস্তান দলের টেক্কা। সঙ্গে আরেক বাঁহাতি ওয়াহাব রিয়াজ। নিজের দিনে রিয়াজও যেকোনো দলের ব্যাটিংকে শুইয়ে দিতে পারেন।

ম্যাচটা ঘিরে তৈরি হয়েছে উত্তপ্ত গনগনে আবহ। যে ম্যাচের টিকিট এক বছর আগেই শেষ। কালোবাজারে টিকিটের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। ম্যাচের দিন ৭৫ হাজার হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

২০ বছর আগে ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে হয়েছিল ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ। যেখানে দুটি দলেরই সমান সমর্থন পাওয়ার কথা। ভারত আর্মি যদি ঢাকঢোল নিয়ে মাঠে থাকে, বিরাটদের জন্য যদি গলা ফাটান সুধীর গৌতম, তার দলবল নিয়ে পাল্টা দিতে তৈরি থাকবেন পাকিস্তানের চাচাও। এছাড়া আগে থেকেই তো ইংল্যান্ডের আছেন বহু ব্রিটিশ ভারতীয়-পাকিস্তানি। ভারত-পাকিস্তান থেকে তো বটেই, সুদূর আমেরিকা থেকেও এ ম্যাচে দেখতে উড়ে গেছেন বহু ভারতীয়-পাকিস্তানি।

মোট জয়-পরাজয়ের হিসাবে একদিনের ক্রিকেটে পাকিস্তান এগিয়ে। মোট ১৩১ বারের সাক্ষাতে পাকিস্তান জিতেছে ৭৩ বার। আর ভারতের জয় ৫৪ ম্যাচে। ফল হয়নি চার ম্যাচে। এছাড়া ৫৯ টেস্টের ১২টিতে পাকিস্তান, ৯টিতে ভারত জিতেছে।

দুদলের মধ্যে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ স্কোর ভারতের ৩৫৬/৯। বিশাখাপত্তমে ২০০৫ সালে করেছিল স্বাগতিক ভারত। দুদলের মধ্যে ৩০০ বা তার বেশি রান হয়েছে ৩১ বার। এরমধ্যে ১৪বার করেছে ভারত। আর পাকিস্তান করেছে ১৭বার। পাকিস্তানের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি রান করেছেন শচীন টেন্ডুলকার (২৫২৬)। শীর্ষ পাঁচের তিনজন পাকিস্তানের, যার মধ্যে এই বিশ্বকাপে খেলা শোয়েব মালিকও আছেন।

দুই দলে লাইমলাইটে থাকবেন ভারতের পক্ষে রোহিত শর্মা। বড় ম্যাচে বড় কিছু করা যার প্রায় অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বিরাট কোহলি তো আছেনই। সেই সঙ্গে ব্যাটিংয়ে ধোনি-যাদবও আছেন। বোলিংয়ে বুমরাহের সাথে অলরাউন্ডার পান্ডিয়া। স্পিনার যুজবেন্দ্র চাহালের ঘূর্ণির সাথে কুলদীপ যাদবের ভেলকি তো থাকছেই।

ওল্ড ট্রাফোর্ডের পিচ ঐতিহ্যগতভাবেই পেস-স্পিনারদের সবার অনুকূলে থাকে। তবে ব্যাটসম্যানদের জন্যে সুযোগ আছে।

উত্তজেনার পারদ প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে, কিন্তু একইসঙ্গে থাকছে আবহাওয়ার চোখরাঙানি। নটিংহ্যামের মতো টানা বৃষ্টি নেই ম্যানচেস্টারে, শনিবার হাল্কা বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল, হয়নি। রোববার নাকি মেঘ-রোদের খেলা চলবে। তবে টানা বৃষ্টির গল্প নেই। যা আবহাওয়া, টস না সবচেয়ে জরুরি ফ্যাক্টর হয়ে যায়!

ওয়েদার ডটকমের পূর্বাভাস অনুযায়ী আকাশ ঝকঝকেই থাকবে। বিকেলের দিকে উঁকি মারতে পারে বৃষ্টি। তাপমাত্রা থাকতে পারে ১৩ ডিগ্রির আশেপাশে।

চলতি বিশ্বকাপে বৃষ্টির কারণে এখন পর্যন্ত চার ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সেই পরিপ্রেক্ষিতে একটু মজা করেছেন পাকিস্তানের সাবেক স্পিডস্টার শোয়েব আখতার।

টুইটারে শোয়েবের শেয়ার করা একটা ছবিতে দেখা যায়, বৃষ্টির কারণে টসের পর ড্রেসিংরুমে শাটার টেনে ফিরছেন ভারত-পাকিস্তানের দুই অধিনায়ক বিরাট কোহলি এবং সরফরাজ আহমেদ। অন্যদিকে টসের সময় ধারাভাষ্যকাররা একটি নৌকার মধ্যে দাঁড়িয়ে ধারাভাষ্য দিচ্ছেন। পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় যেটিকে রিটুইট করেন সদ্য ক্রিকেটকে বিদায় জানানো ভারতীয় তারকা যুবরাজ সিং।

পারফরম্যান্স ও সাবেকদের বিচারের মতো এই ম্যাচে জয়-পরাজয়ের প্রেডিকশনে এগিয়ে রয়েছে ভারত। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমসের জরিপে দেখা যায়, ভারতের জয়ের পক্ষে ৫২ ও পাকিস্তানের পক্ষে ৪৮ ভাগ মত দিয়েছেন।

Bellow Post-Green View