চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ক্রিকেটারদের হৃদয়কে কেন রক্তাক্ত করা?

যার প্রতি ভালোবাসা বেশি, তার প্রতি ক্ষোভও তত বেশি। এটা মানব প্রকৃতির চিরন্তন একটি বৈশিষ্ট্য বলেই প্রতীয়মান হয়। চাইলেও তা থেকে সহজে মুক্ত হওয়া যায় না। তবে সবকিছুরই তো একটা পরিমিতি বোধ থাকার কথা। সেটা এখন আর আমরা মানতে চাইছি না। বোধের বাঁধন আমরা একদমই আলগা করে দিয়েছি। যা ইচ্ছে, যা খুশি, যা নয় তাই লিখছি। ক্ষোভ, দুঃখ, মনস্তাপ বা সমালোচনা যদি যুক্তিযুক্ত, ন্যায়সঙ্গত ও গঠনমূলক হয়, তাহলে তা মেনে নিতে কারোই কষ্ট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেটা যদি একচোখা, একতরফা ও একদেশদর্শী হয়, তাহলে তা নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়ে যায়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সামাজিক সুস্থিরতা। যা মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়।

আমরা এমন একটা সময়ে বসবাস করছি, কোন কিছু মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রধান হয়ে ওঠে মূলত ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া, পছন্দ-অপছন্দ, ভালো লাগা-মন্দ লাগা। সেই সঙ্গে কারণে-অকারণে যেকোন বিষয়ে যুক্ত করা হয় রাজনীতি, জাতি, ধর্ম, বর্ণের মতো সংবেদনশীল বিষয়। ককটেল না হলে আসর যেন জমে না। যেখানে যেটা থাকার কথা, সেখানে সেটাকে রাখছি না। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সবকিছু গুলিয়ে ফেলছি। প্রতিপক্ষকে নাজেহাল বা ঘায়েল করার জন্য তূণে সাজিয়ে রাখছি বিষাক্ত সব বাণ। সুযোগ পেলেই বিদ্ধ করার জন্য মুখিয়ে থাকছি। কোনো বোধ, বুদ্ধি, বিবেচনা কাজ করে না। কি শিক্ষিত, কি অশিক্ষিত সব যেন একই গোয়ালের গরু।

বিজ্ঞাপন

এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অংশ নেয়া দলটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা দল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ নিয়ে খুব বেশি দ্বিমত দেখা যায়নি। এ কারণে দলটিকে নিয়ে মেলেছে স্বপ্নের ডালপালা। তবে টিম ম্যানেজমেন্টের প্রত্যাশা ছিল সেমি-ফাইনাল খেলার। প্রতিটি দলই একটা প্রত্যাশা নিয়ে অংশ নেয়। সব প্রত্যাশাই পূরণ হবে, এমনটি নিশ্চয়তা দিয়ে কি বলা যায়?
সবকিছু প্রত্যাশা মতো হলে তো তার কোনো আকর্ষণ থাকে না। মজাও থাকে না। অনিশ্চয়তা আছে বলেই তো জীবন কখনো কখনো আনন্দদায়ী, সুখময়, রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে। তবে এটাও ঠিক, প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তি মিলে গেলে, তারও একটা আলাদা সুখ আছে। অনেক সংশয় আর দোদুল্যমানতায় দুলতে দুলতে সেটি অর্জিত হলে তো কথাই নেই। সম্ভাবনা জাগিয়েও বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে খেলতে পারছে না বাংলাদেশ। একটু উনিশ-বিশ হলে বাংলাদেশ হয়তো আরো উপরে যেতে পারতো। কিন্তু কোনো সমীকরণই বাংলাদেশের পক্ষে যায়নি। আর ভাগ্যটাও সহায় ছিল না। তারপরও এ যাবতকালের সেরা সাফল্য এসেছে এই বিশ্বকাপেই। এ সাফল্য নিয়ে আমাদের গর্বিত হওয়ারই কথা। কিন্তু এমন সাফল্য যেন আমাদের মন ভরাতে পারছে না। মনোভাবটা এমন, আমরা হরদমই বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনাল বা ফাইনাল খেলি। এবার না খেলাটা অনেক বড় অপরাধ হয়ে গেছে।

খেলার মাঠে কোনো দল বা দলের খেলোয়াড়রা নিজের সর্বোচ্চটুকু দেয়ার চেষ্টা করেন। এর ব্যত্যয় সাধারণত খুব একটা দেখা যায় না। এ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের নিজেদের নিবেদনের ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য ছিল বলে মনে হয় না। তা না হলে দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফগানিস্তানকে হারানো সম্ভব হতো না। শিরোপা প্রত্যাশী নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারতের মতো দলকেও কিন্তু মোটেও স্বস্তি দেয়নি বাংলাদেশ।

তবে খেলায় ভুলত্রুটি হতে পারে। ব্যর্থতাও থাকতে পারে। সেটা তো আর ইচ্ছেকৃত নয়। নিউজিল্যান্ডের কেন উইলিয়ামসনকে মুশফিকুর রহিম রান আউট করতে পারলে, অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড ওয়ার্নারের ক্যাচ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে সাব্বির রহমান এবং ভারতের রোহিত শর্মার ক্যাচ ডিপ স্কোয়ার লেগে তামিম ইকবাল নিতে পারলে বাংলাদেশের অবস্থান অন্য রকম হতে পারতো। যা হয়নি তা নিয়ে আক্ষেপ থাকতে পারে। খেলারই অংশ হিসেবেই এটাকে মেনে নিতে হয়। গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে এ ভুল, এ ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াটাই কাম্য।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু খেলা হয়ে যাবার পর অনেক ক্রিকেট পন্ডিত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে বলেন, এটা কেন হলো না? ওটা কেন হলো না? যেন মাঠে খেলতে নেমেছিল রোবট বাহিনী। যাদের কোনো ভুল-ভ্রান্তি থাকবে না। তারা যেভাবে চাইবেন, সেভাবেই করতে পারবেন। টেলিভিশন, সংবাদপত্র, ভার্চুয়াল মিডিয়ায় ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের এমন চমকপ্রদ বিশ্লেষণ খেলার আগে করলে তো বাংলাদেশ দল উপকৃত হতে পারে। তাহলে সেটা কেন করা হয় না?

ক্রিকেট নিয়ে যাদের জ্ঞানগম্যি খুব একটা নেই, তারা হরেদরে মন্তব্য করলে তা নিয়ে খুব বেশি ভ্রুক্ষেপ না করলেও চলে। কিন্তু ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট কেউ যখন আমজনতার মতো অভিমত দেন, তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় থাকে না। বিশেষ করে, একসময় যাঁরা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রিকেট খেলেছেন, তারা যখন লেম্যানের মতো মন্তব্য করেন, তখন কি তাদের মনে পড়ে না, তারা নিজেরা কী খেলেছেন, কেমন খেলেছেন? এই ক্রিকেটারদের অমার্জিত অভিমত কখনো কখনো উস্কানিমূলক মনে হয়। প্রকারান্তরে সেটাই তারা করে থাকেন।

বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের এ পর্যায়ে আসার পেছনে একজন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা, একজন উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান তামিম ইকবাল, একজন উইকেটকিপার মুশফিকুর রহিম কিংবা দলের অন্য কারো কারো যে অবদান, তার কোনো তুলনা হয় না। বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, সেই স্বপ্নের নির্মাতা কিন্তু এই ক্রিকেটাররাই। তাঁদের ত্যাগ-তিতীক্ষায় এ পর্যায়ে উঠে এসেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। অথচ এই ক্রিকেটারদের অপারগতা নিয়ে যেভাবে তাদের গুষ্ঠি উদ্ধার এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কাটাছেঁড়া করা হয়, তারা যেন ক্রিকেট খেলতে এসে মহা অন্যায় করে ফেলেছেন। তাহলে কি আমাদের আদর্শ হওয়া উচিত ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ? সেই বিশ্বকাপের মতো ফল করলে কোনো প্রতীক্ষা থাকবে না। প্রত্যাশা থাকবে না। অংশ নেয়ার জন্যই কেবল অংশ নেবে বাংলাদেশ। সেটা হলে খেলোয়াড়দের আক্রমণাত্মক সমালোচনা সইতে হবে না। সেটাই বোধকরি সমাধান হতে পারে। একজন মাশরাফি, একজন সাকিব, একজন তামিম, একজন মুশফিক, একজন মাহমুদউল্লাহ নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে এ পর্যায়ে এসেছেন। কারো করুণা বা দয়ায় নয়। চাইলেই সহসা কোনো মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহরা উঠে আসবেন না। এখনই তাঁদের অনুপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় শঙ্কার কালো মেঘ। তাহলে আগামীতে কী হবে?

আমরা নিজেদের অবস্থানের কথা একদমই ভুলে যাই। নিজেরা কী করছি, কতটুকু করছি, সেটা আমাদের বিবেচনায় থাকে না। এই ক্রিকেটাররা তো বাংলাদেশের অবস্থান একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, আর কে কী কতটা করতে পারছেন? সেটা কি আমরা পর্যালোচনা করি? জীবনযুদ্ধে পরাজিত অনেকেই হয়তো নিজেদের ক্ষোভ, জ্বালা, যন্ত্রণা, ব্যর্থতা আর না পাওয়াগুলো খেলার মাঠে জয়ের মধ্যে দিয়ে ভুলতে চান। সেটা চাইতেই পারেন। কিন্তু তা নিয়ে উম্মাদের মতো আচরণ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

যারা ক্রিকেটের প্রকৃত সমঝদার, তারা কিন্তু এ নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করেন না। তারা উপভোগ করেন ক্রিকেটীয় রূপ-রস-গন্ধ। কিন্তু যারা ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করার জন্য হায়েনার মতো ওঁত পেতে থাকেন, রক্তাক্ত করেন ক্রিকেটারদের হৃদয়, তারা কখনো ক্রিকেটের শুভাকাঙ্খী কিংবা ক্রিকেটানুরাগী হতে পারেন না। বরং তাদের গোপন অভিলাষ হচ্ছে ব্যর্থ হোক এই ক্রিকেটাররা, পরাজিত হোক এই বাংলাদেশ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View