চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলা: আদালতে হৃদয়বিদারক আর্তনাদ

নিউজিল্যান্ডে মসজিদে বন্দুক হামলায় হতাহতদের স্বজনরা রাগ-কষ্ট-ক্ষোভের মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় ফেটে পড়লেন ক্রাইস্টচার্চের আদালতে। শোকাবহ পরিবেশে বন্দুক হামলায় নিহত ৫১ জনের প্রায় ৯০ জন স্বজন শুনানিতে অংশ নেন। সে সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন কেউ কেউ। কোরআন পাঠ করতে থাকেন শোকাহত স্বজন। কয়েকজন বসেছিলেন বন্দুক হামলায় চিরতরে হারানো বাবা বা ভাইয়ের ছবি আঁকড়ে ধরে।

বন্দুকধারী ব্রেনটন ট্যারান্ট এর বিরুদ্ধে চার দিনের শুনানিতে মায়সুন সালমা বলেন, ওই দিনের হামলার ঘটনা পুরো নিউজল্যান্ডকে ভীত সন্ত্রস্ত করেছে আর শোকাহত করেছে পুরো বিশ্বকে। বন্দুক হামলায় সন্তান হারিয়েছেন সালমা।

বিজ্ঞাপন

অস্ট্রেলিয় বংশোদ্ভুত ২৯ বছর বয়সী ব্রেনটন শুনানিতে কোন বক্তব্য দিবে না বলে আগেই জানিয়ে দেয়। ৫১ জনকে হত্যা, ৪০ জনকে হত্যাচেষ্টা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে ব্রেনটনের বিরুদ্ধে। তাকে জাবজ্জীন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। সম্ভবত সে প্যারলবিহীন সাজা পেতে যাচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে এমন দণ্ড এই প্রথম।

বিজ্ঞাপন

এই চোখের জল কেবল তোমার কারণে ব্রেনটন

ওই বন্দুক হামলায় বাবাকে হারিয়েছেন সারা কাশেম। আদালতে তিনি বলেন: আমি সারা কাশেম। নুরানী চেহারার আবদেলফাত্তাজ কাশেম ছিলেন আমার বাবা। আমি হতবিহ্বল হয়ে ভাবতে থাকি, সেই ভয়ঙ্কর সময় বাবা কী ভাবছিলেন? তিনি কি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন? নিরুপায় আমি কেবলই ভাবতে থাকি, যদি আমি সেখানে উপস্থিত থাকতে পারতাম! যদি তার হাতটা একবার ধরে বলতে পারতাম, কিচ্ছু হয়নি, সব ঠিক হয়ে যাবে।কিন্তু শেষ সময়ে আমি বাবার পাশে থাকতে পারিনি।

সারা আরো বলেন, বাবাকে নিয়ে আমার কত কত স্বপ্ন ছিলো! সবকিছু অপূর্ণ রয়ে গেলো। তাকে নিয়ে আমার বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিলো। এখনো আমি তার রান্নার সুগন্ধ পাই। কথা বলতে বলতে এক পর্ায়ে কান্নায় ভেঙ্গ পড়েন, ব্রেনটনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমার এই কান্নার একমাত্র কারণ তুমি।

আমার সন্তান জানতে চায়, কী অপরাধে বাবাকে হত্যা করা হলো?

জাকারিয়ান তুয়ান এর স্ত্রী হামিমাহ তুয়ান।বন্দুক হামলায় আহত হওয়ার পর ৪৮ ঘণ্টা বেঁচে ছিলেন। বেঁচে থাকার জন্য ওই ৪৮ ঘণ্টা ছিলো দুর্বিসহ। প্রয়াত স্বামীকে স্মরণ করে হামিমাহ বলেন, বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়েও এখন আর সন্তানদের বাবা, আমার স্বামীকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। আমি তার রান্না মিস করি। বাচ্চাদের সঙ্গে তার দুষ্টামি মিস করি। ঘুমের মধ্যে তার নাক ডাকতো। সে ছিলো আমার দেহরক্ষী, আমার বিনোদনের উৎস, আমার স্বস্তিদাতা। সর্বোপরি আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।

হামিমাহ আরো বলেন: আমার বড় ছেলের বয়স মাত্র পাঁচ বছর। এই ছেলে আমাকে প্রশ্ন করে, সে কেন তার বাবাকে হত্যা করলো?

বাচ্চাদের বোঝানোর জন্য বলেছি, দায়িত্বজ্ঞানহীন এক লোক তোমাদের বাবাকে হত্যা করেছে। ঠিক যেমন তোমার প্রিস্কুলের সেই বন্ধুটি। যে জানতো না অন্যদের সঙ্গে কীভাবে থেলতে হয়। তার অজ্ঞতা আর ভীতি থেকে সে অন্যদের আঘাত করেছে।

বিজ্ঞাপন

“আমার বাচ্চারা অসহায়ভাবে তাকিয়ে দেখে আরেকটা বাচ্চাকে তার বাবা হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে। বাবার সঙ্গে ওইসব বাচ্চারা লেগো খেলছে।মা হয়ে বাচ্চাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আমি কীভাবে সহ্য করি? আমার ছেলেরা বাবার কোলে ঝাপিয়ে পড়তে পছন্দ করতো।বাবার শরীরময় চুমু খেতে পছন্দ করতো তারা। বাচ্চাদের কোন সাফল্য উদযাপন করতে পারবে না তাদের বাবা।” বলেন হামিমাহ।

কিন্তু ব্রেনটনের হায়েনার মতো হামলা নিউজিল্যান্ডের হাজার হাজার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছে।তারা এখন আমাদের জন্য আরো বেশী সহানুভূতিশীল। এখন বরং তুমিই নিশ্ব, আমরা জয়ী। মন্তব্য করেন হামিমাহ।

সমাজের আস্তাকুঁড়ে জায়গা হয়েছে তোমার: আল নূর মসজিদে বন্দুক হামলায় বৃদ্ধ বাবাকে হারিয়েছেন আহাদ নবী। ব্রেনটনের উদ্দেশ্যে কথা বলতে গিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন নবী। ব্রেনটনকে বলেন, তোমার বাবা ছিলো বাতিল মাল আর তোমার জায়গা হয়েছে সমাজের আস্তাকুঁড়ে।মৃত্যুর পর তোমাকে মাটিতে পুঁতে ফেলা উচিত।

বিচারকের উদ্দেশ্যে নবী বলেন, সে যেন কখনো কারাগার থেকে নিজের পায়ে হেঁটে বের হতে না পারে।

মুসলমান হওয়াই তাদের একমাত্র অপরাধ

সন্তানের শেষে সময়ের কথা মনে করতে করতে আদালতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ম্যায়সুন সালমা। স্বজনরা পাশে থেকে সান্তনা দেন সালমাকে। তিনি বলেন, “আমি সব সময় হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করি, হামলার সময়ে আমার প্রাণপ্রিয়ি আতা কী অনুভব করছিলো? বন্দুকধারীকে সে কীভাবে মোকাবেলা করেছিলো?  জীবনের শেষ সময় সামনে বুঝতে পেরে সে কী করছিলো? সেসব ভেবে ভেবে আমি প্রসব বেদনা অনুভব করি।

৫১ জন নিরাপরাধ মানুষের প্রাণ নেয়ার অধিকার কে তোমাকে দিয়েছে? ব্রেনটনকে প্রশ্ন করেন সালমা।  মুসলমান হওয়াই তাদের একমাত্র অপরাধ?

তুমি আমাদের আরো শক্তিশালী আর ঐক্যবদ্ধ করেছো

ওয়াসিম সাতি আলী আল নূর মসজিদের ছিলেন তার মেয়ের সঙ্গে। সেথানে তাদেরকে এলোপাথাড়ি গুলিতে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। ব্রেনটনের উদ্দেশ্যে কথা বলতে যেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সাতি আলী। তিনি বলেন, ‘তুমি ছাড়া সবাইকে শুভ সন্ধ্যা। আমরা কোনভাবে বেঁচে গেছি। সে কারণে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা। তুমি আসলে বন্দুক চালানোও জানো না।”

এ কথা শুনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ব্রেনটন। মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে।

সাতি আলী আরো বলেন, “তুমি আমাদের সম্প্রদায়কে নিঃশ্বেষ করতে ব্যর্থ হয়েছো। তুমি হয়তো ভেবেছো, আমাদের ধ্বংস করে দিয়েছো। সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমাদের বিশ্বাসকে নাড়া দিয়েছো। তুমি সফল হয়েছো। কিন্তু তোমার কারণে আমরা এখন একে অন্যের আরো কাছের মানুষ।আমার আরো শক্তিশালী এবং ঐক্যবদ্ধ। তুমি সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ।