চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ক্রসফায়ার ও প্যারাসিটামল

বরগুনায় স্ত্রীর সামনে রিফাত নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। এই সংবাদটি জানার পর বরগুনার বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ তো বটেই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ যাদের মধ্যে শিক্ষিত-সচেতনও অনেকে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, নয়ন যা করেছে সে তার উপযুক্ত শাস্তি পেয়েছে। অন্যান্য শীর্ষ অপরাধী বা এরকম ঘটনায় দায়ীদের ক্ষেত্রেও মানুষ এ জাতীয় ক্রসফায়ার সমর্থন করে।

সমস্যা হলো, ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ এক ধরনের প্যারাসিটামল। এর দ্বারা তাৎক্ষিণক উপশম হয়; জনরোষ নিয়ন্ত্রণে থাকে, কিন্তু যাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নয়নরা ‘বন্ড’ হয়ে ওঠে তাদের কিছু হয় না; হবেও না। কারণ নয়নের হত্যার মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো বলে জনমনে ধারণা বদ্ধমূল হয়। রিফাতের পরিবারও সন্তোষ জানায়। ফলে যাদের কারণে নয়নরা প্রকাশ্যে কুপিয়ে মানুষ হত্যা করলো বা এই সাহস পেলো তাদের বিচারের দাবিটা আর হালে পানি পাবে না। দ্বিতীয়ত মানুষ যখন প্রচলিত আইনি পথের বাইরে গিয়ে এ জাতীয় প্রতিশোধকে সমর্থন জানায়, তখন ক্রসফায়ারে নিরপরাধ মানুষ খুন হলে সেটিও এক ধরনের বৈধতা পায়। অতএব, সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে প্যারাসিটামল নয়, অ্যান্টিবায়োটিক লাগবে। বিনা বিচারে হত্যা দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য, নয়নের ক্রসসফায়ারের কদিন আগেই কুমিল্লায় কথিত মাদক ব্যবসায়ী অভিযোগে একজন ফ্রিল্যান্স ভিডিওগ্রাফারকে ক্রসফায়ারে মেরেছে বিজিবি। স্থানীয় লোকেরা জানিয়েছেন, নিহত যুবক এলাকায় ভদ্র ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এমনকি থানায় তার নামে কোনো মামলা বা অভিযোগও নেই। সুতরাং নয়নের ক্রসফায়ার যদি জায়েজ হয়, তাহলে কুমিল্লার ওই নিরপরাধ যুবকের ক্রসফায়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই।

র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধপুরান ঢাকায় দর্জি দোকানি বিশ্বিজৎকে কুপিয়ে হত্যার ছবি কিন্তু সাংবাদিকের ক্যামেরায়ই ছিল। সেটিও প্রকাশ্য দিবালোকে। ওই খুনিদের কেউ ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে?….

বিজ্ঞাপন

স্মরণ করা যেতে পারে, মাঝখানে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পর হারকিউলিস নাম দিয়ে এভাবে কথিত ধর্ষকদের ক্রসফায়ারে মারা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কতজন আসলেই ধর্ষক তা আদালতে প্রমাণের আগেই বিচার সম্পন্ন করা হয়েছে। কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে যে বহু নিরপরাধ লোক খুন হয়েছে তা নিয়ে সংশয়ের কোনো কারণ নেই। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু লোক যে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে মানুষ খুন করে, নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনার পর সে বিষয়েও জনমনে আর কোনো সংশয় নেই।

যেকোনো অপরাধের পরেই মানুষ এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায়। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক বলতে আসলে কী বোঝায়? আইনে যে অপরাধের যে শাস্তির কথা বলা আছে তার বাইরে গিয়ে ভিন্ন কিছু করার সুযোগ আছে কি? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ এমন মন্তব্য করেন, ধর্ষণের শাস্তি হওয়া উচিত ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে দেওয়া। শাস্তি হিসেবে এটি নির্মম। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক। কিন্তু এটি কি আমাদের দেশের প্রচলিত আইন অনুমোদন করে? সৌদি আরবের মতো শরিয়া আইনের দেশে এরকম শাস্তি হতে পারে। সেখান চুরি করলে হাত কাটা, খুন করলে প্রকাশ্যে গলা কাটা আইনসিদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে এ ধরনের শাস্তির অনুমোদন নেই। কিন্তু মানুষ চায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। তারা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এ কারণে চায়, যাতে ওই শাস্তির ভয়াবহতা দেখে ভবিষ্যতে কেউ ধর্ষণের মতো অপরাধ করার সাহস না পায়। সে কারণে যখন ক্রসফায়ারে (বস্তুত গুলিতে) ধর্ষণ মামলার কোনও আসামির মৃত্যু হয়, তারও পক্ষে কিছু জনমত তৈরি হয়ে যায়।

আমরা যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বেআইনি কাজকে সমর্থন দিই, তখন তারা আরও দশটি বেআইনি কাজ করার সাহস পায় এবং তখন আর মানুষের কিছু বলার থাকে না। একজন ধর্ষককে (যদিও প্রমাণিত নয়) ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার সংবাদ আপাতদৃষ্টিতে সাধুবাদযোগ্য মনে করা হলেও, এটির প্রভাব সুদূরপ্রসারি। ধরে নিচ্ছি নিহত ব্যক্তি সত্যিই ধর্ষক। কিন্তু সেটি আদালতে প্রমাণিত হয়নি। অপরাধ প্রমাণের আগে  যদি আপনি কাউকে শাস্তি দেন, তখন আপনি নিজেই অপরাধী। আবার অভিযুক্ত লোকটি ধর্ষক হলেও প্রচলিত আইনেই বিচারের সুযোগ ছিল। বিচারক যদি মনে করতেন যে অপরাধটি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য, তাহলে তিনি মৃত্যুদণ্ড দিতেন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় না গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেরাই যখন একজন লোককে ধরে নিয়ে মেরে ফেলে, সেটি সম্পূর্ণই আইনের শাসনের পরিপন্থি।

বন্দুকযুদ্ধ-বন্দুকযুদ্ধে নিহতএখান সমস্যা আরেকটা আছে। তা হলো আমাদের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত। অনেক বড় বড় অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। দুর্ধর্ষ জঙ্গিরা জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের জঙ্গি তৎপরায় জড়িয়ে পড়ে, এমন খবরও এসেছে। অনেক সময় তদন্ত কর্মকর্তা ঘুষ খেয়ে বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে দুর্বল রিপোর্ট দেন, যাতে অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন। ফলে ক্ষমতাবান অভিযুক্তরা বেরিয়ে যায়। এ কারণেও অনেকে ক্রসফায়ারে মৃত্যুকে সমর্থন করেন। কিন্তু এটিই কি সমাধান?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View