চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ক্যানোলা ফিল্ডের সন্ধানে

স্কুল হলিডে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বাচ্চাদের অনেক জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে আর অভিভাবকেরা সেটা বাস্তবায়ন করেন। এবারের স্কুল হলিডেতে কোথায় যাওয়া যায় সেটা নিয়ে আগে থেকেই ভাবনা চিন্তা শুরু করেছিলাম আমরা চার পরিবার। বন্ধু আশিক, লাবণ্য ভাবি, আর উনাদের দুই সন্তান আয়ান এবং ইথান; বন্ধু আসাদ, কুমু ভাবি আর উনাদের তিন সন্তান সামিহা, আফিফ এবং তুফা; বন্ধু গালিব, সুজানা এবং ওদের মেয়ে লিয়ানা আর আমাদের পরিবারের চার জন মিলে পরিকল্পনা করা হলো আমরা এইবার ক্যানোলা ফিল্ড দেখতে যাবো। অস্ট্রেলিয়াতে এখন চলছে বসন্তকাল। চারিদিকে গাছে গাছে নতুন পাতা আর শাখে শাখে দেখা দিয়েছে বাহারি রঙের এবং গন্ধের ফুল। ক্যানোলা ক্ষেতগুলোতে রাশিরাশি হলুদ ফুল ফুলেছে। পাখির চোখে দেখলে মনেহবে যেন পুরো এলাকাটা একটা হলুদ সমুদ্র।

পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হলো আশিকের কাঁধে। সেই আমাদের সব রকমের ভ্রমণের পরিকল্পনাকারী সাথে গাইডও কারণ ও আগে থেকেই সেইসব জায়গাতে হয় গিয়েছে নাহলে বিস্তারিত পড়াশোনা করে তথ্য জোগাড় করেছে। পরিকল্পনা করা হলও আমরা সপ্তাহের শেষ দিন শুক্রবার যাত্রা করে রোববার ফিরবো। গন্তব্য হিসেবে ঠিক করা হলও ওয়াগাওয়াগা। সেখানে সিডনির বিখ্যাত ক্যানোলা ট্রেইল আছে। আমরা শুক্রবার বিকেলে রওয়ানা দিয়ে দিলাম। মোট সাড়ে চার ঘণ্টার ভ্রমণ। আশিক ঠিক করে রেখেছিলো আমরা প্রথম যাত্রাবিরতি নিবো গোলবার্ন এর রকি হিল ওয়ার মেমোরিয়াল এন্ড মিউজিয়ামে।

বিজ্ঞাপন

এই মিউজিয়ামটা একটা সুউচ্চ পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত। সেখানে পৌঁছেই বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলো। আমরা বড়রাও একটু হাটাহাটি করে হাত পায়ের জড়তা কাটিয়ে নিলাম। তারপর আবার রওয়ানা দিয়ে দিলাম আমরা। বন্ধু গালিব সপরিবারে গোলবার্নে থাকে। সেও আমাদের সাথে যোগ দিলো।

রকি হিল ওয়ার মেমোরিয়াল এবং মিউজিয়াম প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নারী পুরুষের স্মৃতিতে ১৯২৫ সালে খুলে দেয়া হয়। এখানে যুদ্ধের বহু পুরাতন সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হয় যার মধ্যে ১৬তা জাতীয় স্বাক্ষর সম্বলিত। এটা সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত খোলা থাকে। মূল স্মৃতিস্তম্ভটি একটা বর্গাকৃতির ১৯ দশমিক পাঁচ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট ওয়াচ টাওয়ার। আর পাশেই রয়েছে জাদুঘর। জাদুঘরে নিয়মিত অন্যান্য প্রদর্শনীর পাশাপাশি বিভিন্ন উপলক্ষে বিভিন্ন রকমের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। আমাদের পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো তাই আমরা আর ভিতরে ঢুকতে পারিনি তবুও আমরা সেখান থেকে পুরো গোলবার্ন শহরের ভিউ দেখতে পেলাম। সূর্য ডুবে পশ্চিমের আকাশ লাল হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে গোলবার্ন শহরের বৈদ্যুতিক বাতিগুলো জ্বলে উঠলো। তখন মনেহলো যেনো আকাশের মিটিমিটি তারাগুলো গোলবার্ন শহরের উপর নেমে এসেছে।

আমরা আবার চলতে শুরু করলাম। এরপরের বিরতি ইয়াস ভ্যালির ম্যাকডোনাল্ডসে। সেখানে যেয়ে গাড়ি থামিয়ে নামতেই বিশাল পূর্ণিমার চাঁদ আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানালো। ম্যাক থেকে আমরা বাচ্চাদের জন্য কিছু খাবার আর বড়দের জন্য কফি নিয়ে নিলাম। ম্যাকের আলোয় চাঁদের সৌন্দর্য ঠিক বুঝা যাচ্ছিলো না। এরপর আবার আমরা চলতে শুরু করলাম। তখন বুঝতে পারলাম চাঁদের আলো আজ কতটা তীব্র। চাঁদের আলোয় মোটরওয়ের রাস্তাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিলো। আমাদের পাশ দিয়ে আরো অনেক গাড়ি চলে যাচ্ছিলো। এরপর একসময় আমরা মূল মোটরওয়ে ছাড়িয়ে ওয়াগাওয়াগা যাওয়ার রাস্তায় নেমে পড়লাম। আশিক বলেছিলো এই রাস্তায় মাঝেমধ্যে গাড়ির সামনে ক্যাঙ্গারু এসে পরে তাই আমি সামনে থাকছি, তোমরা আমাকে ফলো করে এসো। ওয়াগাওয়াগা যাওয়ার রাস্তাটাতে গাড়ির তেমন চাপ নেই। চাঁদের আলোয় অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিলো অবশ্য চাঁদের আলোয় সবকিছুই কেমন যেন রহস্যময় মনেহচ্ছিলো। এরপর আমরা একময় আমাদের গন্তব্য ‘দি রেড স্টিয়ার হোটেল’ এ পৌঁছে গেলাম।

আমাদের হোটেলের বর্ণনাটা এখানে একটু দিয়ে রাখা দরকার। ওয়াগাওয়াগা জায়গাটা আমাকে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের কথা মনেকরিয়ে দিয়েছে। মূল রাস্তা থেকে বেশ ভিতরে ঘরবাড়িগুলো। আর বাড়িগুলোর পেছনেই অবারিত খোলা সবুজ মাঠ। আমাদের হোটেলটা একটা রাস্তার একেবারে শেষ প্রান্তে। এরপর থেকে সবুজ মাঠের শুরু। হোটেলের পাশ দিয়ে একটা সরু পিচঢালা রাস্তা সবুজ মাঠটাকে দুভাগ করে দিয়ে বয়ে চলেছে। হোটেলটা ইংরেজি এল অক্ষরের আকৃতির। মাঝখানে খোলা উঠোন। হোটেলের উঠোনে এসে দাঁড়ালে মনেহয় যেন আপনি বাংলাদেশের গ্রামের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছেন। উপরে বিশাল নক্ষত্ররাজি আর নিচে মাটির বিছানা। আমরা উঠলাম এল অক্ষরের শেষের দিকের একসারি কক্ষগুলোর পাশাপাশি পাঁচটা কক্ষে।

বিজ্ঞাপন

পরেরদিন সকালবেলা উঠে নাস্তা খেয়েই আমরা বেড়িয়ে পড়লাম। ওয়াগাওয়াগার আবহাওয়াটা মজার। দিনের বেলায় তাপমাত্রা ত্রিশের উপরে উঠে গেলেও রাত্রে সেটা দশের নিচে নেমে আসে তাই আপনি ওখানে যেতে চাইলে গরম এবং ঠাণ্ডা দুধরণের আবহাওয়ার জন্যই কাপড় নিতে হবে। আমাদের গন্তব্য তেমরা’র ক্যানোলা ট্রেইল। এই রাস্তাটার দুপাশেই অবারিত ক্যানোলার ক্ষেত। দেখে মনেহবে চারিদিকে সোনা ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। কোলামন, তেমোরা এবং জুনি এই তিনটা জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি ক্যানোলার চাষ করা হয়ে। আমরা ক্যানোলা ট্রেইলে পৌঁছে একটু হতোদ্যম হয়ে গেলাম কারণ ক্যানোলা ঠিকই আছে কিন্তু সেগুলো সোনালী হলুদ ফুল থেকে সবুজ ফলে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।

ক্যানোলা ফুলের দেখা না পেলেও এই সমগ্র ড্রাইভটা ছিলো খুবই উপভোগ্য। সরু রাস্তার দুপাশে অবারিত সবুজ। আর সেই সবুজের মাঝে হঠাৎ হঠাৎ একটা দুটো গাছকে দেখে মনেহবে যেন সে ক্ষেত পাহারা দিচ্ছে। কোন কোন মাঠে দলবেঁধে ভেড়া, গরু বা ছাগল চড়ে বেড়াচ্ছে তবে ভেড়ার সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। আবার কোন কোন জায়গা গাঢ় বেগুনি বর্ণে ঢাকা পড়েছে। দেখে মনেহবে কোন শিল্পী তার বেগুনি বর্ণের রঙটা ইচ্ছেমতো সবুজের জমিনে ছড়িয়ে দিয়েছে। এই গাঢ় বেগুনি বর্ণের ফুলকে বলে প্যাডক ফ্লাওয়ার, এগুলো আসলে এক ধরণের আগাছা। বসন্তকালে এই আগাছাটা অস্ট্রেলিয়ার সর্বত্রই দেখা যায়। উঁচু উঁচু পাহাড়ের গায়ে এই গাঢ় বেগুনি বর্ণের রং আপনাকে বাধ্য করছে গাড়ি থামিয়ে কিছু সময়ের জন্য হলেও অবাক তাকিয়ে থাকতে।

কান্ট্রি সাইডের এই জায়গাগুলোতে মানুষের বসতি খুবই কম তাই রাস্তাঘাটে মানুষজন গাড়িঘোড়া দুটোই কম। এখানকার মানুষজনের জীবনযাত্রা আমাকে খুবই টানে। আসলে সারা পৃথিবীতেই গ্রামীণ জীবনপদ্ধতি এখনও অনেক ঢিলেঢালা। শহরে যেখানে মানুষ সময়কে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত সেখানে গ্রামের মানুষের ভাবনাতেও এগুলো নেই। সময় আর মানুষ দুজনের কারোরই যেন তাড়া নেই তাই তারা হাত ধরাধরি করে ঢিমেতালে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা রাস্তার পাশে থেমে কখনও বুনোফুল তুললাম আবার কখনও বা বাচ্চাদের রেললাইন চেনালাম। শহরে তো রেললাইনের ধারে কাছে যাওয়ার উপায় নেই কিন্তু গ্রামে রেললাইনের উপর দিয়ে হেটে গেলেও দেখার কেউ নেই।

এভাবে ঘুরে ঘুরে আমরা কোলামন, তোমরা এবং জুনির বিভিন্ন রাস্তা পেরিয়ে ফেরা শুরু করলাম। যাওয়ার সময় মূল রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে বড় দুইটা ক্যানোলার ক্ষেত দেখে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে আমরা সেখানেই থামবো বলে পরিকল্পনা করলাম। মূল রাস্তা থেকে আধা পাকা রাস্তা চলে গিয়েছে ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে যেটাকে এখানকার ভাষায় বলে গ্রাভেল রোড। আমরা ধুলো উড়িয়ে সেই রাস্তা দিয়ে অবশেষে ক্যানোলা ফিল্ডের কাছে পৌঁছে গেলাম। প্রায় বুক সমান উঁচু ক্যানোলার যাচ্ছে ছোট ছোট সোনালী হলুদ ফুল ফুটে আছে। শতশত মৌমাছি গুঞ্জন তুলে ফুলে ফুলে ঘুরে মধু সংগ্রহ করছে। ক্ষেতের প্রায় মাঝখানে বৃত্তাকার একটু খোলা জায়গা। সবার আগে বাচ্চারা দৌড়ে সেখানে চলে গেলো। এরপর বড়রা। সেখানে যেয়ে সবাই যে যার মতো পছন্দসই পোজ দিয়ে ছবি তুলতে শুরু করলো। আসলে এই সৌন্দর্য এতটাই বিশাল যে সেটাকে ক্যামেরায় ধারণ করা মোটেও সম্ভব নয়, শুধুমাত্র উপভোগ করা সম্ভব। আমরা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে সেই সৌন্দর্য অবলোকন করতে লাগলাম।

এরপর সেখান থেকে ফিরে আমরা সরাসরি ‘লেক আলবার্ট’ এ চলে গেলাম। লেকের পানিতে অস্তগামী সূর্যের লাল আভা এক অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশ তৈরি করলো। পরেরদিন আমরা সকাল বেলা আমরা শুরুতে গেলাম ওয়াগাওয়াগার বোটানিক গার্ডেনে। সেখানে হরেক রকমের গাছ-ফুল দেখার পাশাপাশি বাচ্চারা ‘পনি রাইড’ করলো। এরপর আমরা ফিরতে শুরু করলাম। ফেরার পথে গুন্ডাগাই থেমে ঐতিহাসিক ‘প্রিন্স আলফ্রেড’ কাঠের সেতু দেখার পরিকল্পনা কিন্তু করোনার কারণে দূরে দাঁড়িয়েই শুধু দেখতে হলো। পাশেই একটা রেলসেতু সেটাও কাঠের তৈরি। মুরুমবিডগি নদী পার হওয়ার জন্য এই সেতু দুটি তৈরি হয়েছিলো যথাক্রমে ১৮৬৬ সালে এবং ১৯০২ সালে। পরবর্তীতে এগুলো পরিত্যক্ত হয়ে গেলে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় অবশ্য আপনি এই সেতুগুলোতে চড়তে পারবেন না। নব নির্মিত প্ল্যাটফর্ম ধরে একটা নির্দিষ্ট দুরুত্ব পর্যন্ত যেয়ে দু চোখ ভোরে উপভোগ করতে পারবেন মানব সভ্যতার বিবর্তনের সাক্ষী এই সেতুর অপার সৌন্দর্য।

এরপর আমরা একবারে এসে বিরতি নিলাম গোলবার্নে। গোলবার্নে আছে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ভেড়ার ভাস্কর্য ‘দি বিগ ম্যারিনো’। এটা স্থাপন করা হয় অস্ট্রেলিয়ার মসৃণ তন্তু উৎপাদনের প্রতীক হিসেবে। এই ভেড়াটি কংক্রিট এবং ইটের সমন্বয়ে তৈরি এবং তিন তলা ইমারতের সমান উঁচু। আমরা এর পাশের তেলের পাম্প থেকে তেল নেয়ার ফাঁকে বিগ ম্যারিনোর সাথে ছবি তুলে নিলাম। এভাবেই আমাদের একটা অনেক আনন্দময় সফর শেষ হলো। আমরা বড়রা না যতবেশি উপভোগ করেছি তার চেয়ে বেশি উপভোগ করেছে বাচ্চারা। এই ভ্ৰমণ থেকে একটা বিষয় বুঝেছিলামঃ সেটা হলো বাচ্চারা যতই ট্যাব, মোবাইলের স্ক্রিনে আটকে থাকুক না কেন আপনি যদি ওদেরকে একবার প্রকৃতির মধ্যে ছেড়ে দেন তাহলে দেখবেন ওরা কত খুশি এবং নিজেদের মতো করে খেলাধুলা করে বেড়াচ্ছে। আমাদের ঝটিকা এই সফরে অনেক কিছুই দেখা হয় নাই কিন্তু আমরা পরবর্তীতে কি কি দেখবো সেই বিষয়ে বিশদ ধারণা পেয়েছি। ভ্রমণ শেষে আমরা সবাই আমাদের বন্ধু আশিককে আন্তরিক ধন্যবাদ দিলাম এমন একটা সফল সফর আয়োজন করার জন্য।