চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কোরআনের মাধ্যমে মুসলমানদের রোগ প্রতিরোধ

মানব জীবনের অতিস্বাভাবিক কিছু প্রকৃতির মধ্যে একটি হচ্ছে ‘রোগাক্রান্ত’ হওয়া। একজন মানুষ জীবনে বহুরোগে আক্রান্ত হবে এটাই স্বাভাবিক রীতি। সেটা হতে পারে স্বাভাবিক রোগ কিংবা ভাইরাসজনিত। এবং রোগ থেকে মুক্তি তথা সুস্থ হবার জন্যে ঔষধের দ্বারস্থ হওয়া বাঞ্চনীয়। একেক রোগের প্রতিষেধকে একেক ঔষধ; আবার একটি রোগের বিপরীতে একাধিক ঔষধও সুলভহারে বিরাজমান।

একজন ব্যক্তি তার রোগ প্রতিরোধে এক বা একাধিক ঔষধ ব্যবহার করেন। ব্যক্তিটি যখন ইসলাম ধর্মের অনুসারী তথা মুসলমান হবে তখন তার নিকট রোগ থেকে মুক্তির জন্যে বহুবিধ ঔষধের যে তালিকা থাকবে তন্মধ্যে অন্যতম একটি “আল-কোরআন”। বর্তমানে, করোনা ভাইরাসের উপদ্রবে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভাইরাস থেকে রক্ষা পাবার উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াতের চিত্র আমরা দেখছি। যা ইসলামি দৃষ্টিতে মোটেই ভিত্তিহীন কোনো চিত্র নয়।

বিজ্ঞাপন

আল-কোরআন মুসলমানদের জন্য শুধু পরকালের মুক্তিদাতাই নয় বরং ইহকালেরও রক্ষাকবচ। একজন রোগাক্রান্ত মুসলমানের জন্য ‘আল-কোরআন’ উত্তম প্রতিষেধকরূপে সর্বাবস্থায় বিদ্যমান। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমি কোরআনে এমন বিষয় অবতীর্ণ করি যা রোগের প্রতিষেধক”। (সূরা ইসরা: ৮২) অন্যত্র এরশাদ করেছেন, “বলুন, এটা (কোরআন) বিশ্ববাসীদের জন্য হেদায়েত এবং রোগ-প্রতিকারক”। (সূরা হা-মিম: ৪৪) এ দুটি আয়াতে খোদা তায়ালা সুস্পষ্টভাবে তাঁর প্রিয় রাসূলের মাধ্যমে কোরআন শরীফকে ঘোষণা করেছেন ‘রোগ প্রতিষেধক বা ঔষধ’ হিসেবে।

বিজ্ঞাপন

কোরআনের নির্দেশিত পন্থাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরামদের প্র্যাক্টিক্যাল (বাস্তবিক প্রয়োগ) দেখিয়েছেন। বুখারী শরীফের একাধিক হাদিসে এসেছে, হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন- “নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তিমকালের অসুস্থতায় তিনি সূরা নাস ও ফালাক পড়ে আপন দেহে ফুঁক দিতেন। যখন অন্তিমকালের চূড়ান্তে তখন আমি সূরাদ্বয় পাঠ করে ফুঁকে দিতাম।” (বুখারী শরীফ: ৫৪০৩, ৫৪১৯) কেবল স্ব-অসুস্থতায়ই নয়; পরিবারের অন্য সদস্যদের অসুস্থতার ক্ষেত্রেও নবীজি একই কাজ করতেন।

বিজ্ঞাপন

বুখারী শরীফের অন্যত্র এসেছে, আম্মাজান হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বলেন- “রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তাঁর উপর সূরা নাস ও ফালাক পড়ে ফুঁক দিতেন”। (বুখারী শরীফ: ৪৭২৮)ইবনে মাজাহ শরীফের একটি হাদীসে দেখা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি বিষবাহী বিচ্ছু দংশন করলে পরবর্তীতে দংশিত স্থানে সূরা নাস ও ফালাক পড়ে মালিশ করেন। (ইবনে মাজাহ: ১২৪৬)

রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তিমকালে যে সূরাদ্বয় পড়ে ফুঁক দেওয়া হয়েছে, বিষাক্ত বিচ্ছুর দংশিতস্থানে যে সূরাদ্বয় পড়ে মালিশ করা হয় সে সূরাদ্বয়ের মর্যাদা কতটুকু তা আমাদের বোঝা অত্যন্ত জরুরী। এ দুটি সূরা শুধু অসুস্থতার ক্ষেত্রেই নয় বরং অন্যান্য বিপদাপদেও পাঠ্য এবং অবশ্যই ফলপ্রসূ। আবু দাউদ শরীফের একটি হাদিসে এসেছে, হযরত উকবা ইবনে আমের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করে বলেন- “একদিন জুহফা ও আবওয়া নামক স্থানের মধ্যবর্তী হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে চলছিলাম। আকস্মিক প্রচণ্ড বাতাস ও ভয়াল অন্ধকার আমাদেরকে আচ্ছন্ন করল। তখন নবীজি সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে আল্লাহর দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। আল্লাহর রাসূল বললেন, হে উকবা! এই দুটি সূরার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নিকট আশ্রয় চাও। আর যে ব্যক্তি এই দুটি সূরা দ্বারা আশ্রয় চাইবে আল্লাহ তায়ালা তাকে আশ্রয় দান করবেন।” (আবু দাউদ: ১৪৬৩)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন জীবদ্দশায় চরম অসুস্থতা, ভয়াল বিপদে কোরআন শরীফকে শিফারূপে ব্যবহার করেই ক্ষান্ত হননি; উম্মতের প্রতি নির্দেশনার স্বরে বলেছেন- “দুটি চিকিৎসা তোমরা আবশ্যক করে নাও। মধু এবং কোরআন।” (হাকেম আল মুসতাদরাক: ৭৪৩৭) বায়হাকী শরীফের একটি হাদিসে ইমাম বায়হাকী উল্লেখ করেছেন যে, একজন ব্যক্তি রাসূলে পাকের নিকট কণ্ঠনালীর ব্যথার কথা জানালো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নির্দেশ দিলেন, “বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করো।” (বায়হাকীর শুয়াবুল ইমান: ২৫৮০) এভাবে একজন মুসলমানের যাবতীয় অসুস্থতা এবং বিপদে কোরআন শরীফকে স্মরণ করা, তেলাওয়াত করা হাদিস শরীফে অত্যন্ত প্রকটিত হয়ে ফুটে উঠেছে। সামান্য গলা-ব্যথা থেকে শুরু করে অন্তিমকালের চূড়ান্ত অসুস্থতা পর্যন্ত কোরআন শরীফকে শেফা তথা রোগ প্রতিকারকরূপে ব্যবহারের দৃষ্টান্ত হাদিস শরীফে দ্রষ্টব্য।

একজন মুসলমান হিসেবে অবশ্যই আমাদের সমস্ত রোগ এবং বিপদমুহূর্তে আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআনকে বিশেষত সূরা নাস ও ফালাককে প্রতিষেধকরূপে পাঠ করা উচিত। বর্তমানে মরণঘাতি করোনা ভাইরাসের আক্রমণে বাংলাদেশসহ বিশে^র অন্যান্য দেশের মুসলিম সমাজে কোরআন তেলাওয়াতের যে পাঠপরিক্রমা চলছে তা উপর্যুক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদিসসমূহেরই প্রতিচিত্র। এবং আমাদের সকলেরই ঘরে বসে এই অবসর সময়ে, সময়ের সদ্ব্যবহার করতে কোরআন তেলাওয়াত করা উচিত এবং মহান আল্লাহর দরবারে এই ভাইরাসের উপদ্রব থেকে সারাদেশের, সারা বিশ্বের মানুষদের রক্ষার জন্য দোয়া করা উচিত।

এতে যেমন আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত পোক্ত হবে তেমনি কোরআন শরীফের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধান্বিত ভালোবাসাও বেড়ে যাবে। আবার ভাইরাস বা যে কোনো রোগ প্রতিরোধে কেবল কোরআন তেলাওয়াতই যথেষ্ট নয়; সাথে সাথে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের দেওয়া বিভিন্ন পরামর্শও সম্পূর্ণরূপে মেনে চলতে হবে। তবেই আমরা রোগ-প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবো, ইনশাআল্লাহ্।