চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কোভিডকালেও বাবরি মসজিদের জমিতে ‘ভিত পুজো’!

ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলাটা ছিল ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের জমির মালিকানা ঘিরে। হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তির প্রতিভু আর এস এস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিসহ হাজারও সহযোগী সংগঠন ‘৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে। সেই ধ্বংসস্তুপের জমির মালিকানা ঘিরে ভারতের বিভিন্ন আদালতে দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলে। সব মামলাগুলোকে একত্র করে সুপ্রিম কোর্টে মামলাটিকে বিবেচনা করা হয়। এই দীর্ঘ সময়কালে ভারতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন থেকেছে। এমনকি এনডিএ নামক এক নীতিবিহীন, সুবিধাবাদী জোটের মাধ্যমে বিজেপি’ও ক্ষমতাসীন থেকেছে। কিন্তু কখনো বাবরি মসজিদের জমি সংক্রান্ত মামলায় এতটা অতি সক্রিয়তা ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দেখায়নি। নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর কেন্দ্রের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ঘিরে ভারতের মুসলমান নাগরিকদের রাষ্ট্রহীন করবার রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র যখন জোর কদমে চলছে, এমন অবস্থাতেই এই জমির মালিকানা সংক্রান্ত মামলার রায় দান করেছে সুপ্রিম কোর্ট।

জমির মালিকানা সংক্রান্ত রায় দিতে গিয়ে তথাকথিত ‘ রামলালা’র মন্দির প্রতিষ্ঠার কর্মপদ্ধতির একটা রূপরেখা ভারতের সুপ্রিম কোর্ট করে দিয়েছেন। এই মন্দির তৈরির রূপরেখা সংক্রান্ত কোনো বিষয় কিন্তু বাবরি মসজিদের জমি সংক্রান্ত মামলার অন্তর্গত বিষয় ছিল না। বিষয়ান্তরে গিয়ে কতো দিনের ভিতরে তথাকথিত মন্দিরের কাজ শুরু হবে বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তুপের জমির উপর, যে জমিটিকে কোনো তথ্যপ্রমাণ ব্যাতিরেকেই একাংশের হিন্দু, যারা সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত, তাদের কথার ভিত্তিতে সেই জমিটিকে তথাকথিত ‘রামলালা’র জমি হিসেবে সাব্যস্ত করেছে ভারতের শীর্ষ আদালত।

বিজ্ঞাপন

বাবরি মসজিদের জমি সংক্রান্ত মামলার রায়ে কী করে মন্দির নির্মাণ বিষয়ক অনাবশ্যক প্রসঙ্গটি উঠে এলো, সে নিয়ে কিন্তু এই রায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সেভাবে কোনো অবিজেপি দলই প্রশ্ন তুললেন না। তেমনি গত কয়েকমাস ধরে এই কোভিড ১৯, লকডাউনের পর্যায়ক্রমের ভিতরেও কিভাবে ভারত সরকার দেশের মানুষদের জীবন- জীবিকার প্রশ্নটিকে সবথেকে বেশি অগ্রাধিকার না দিয়ে মন্দির তৈরি সংক্রান্ত ট্রাস্ট গঠনকেই সবথেকে বেশি অগ্রাধিকার দিলেন, সেই বিষয়টি ঘিরেও অবিজেপি রাজনৈতিক দলগুলি কার্যত মুখে কুলুপ এঁটে বসে রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

করোনার এই ভয়াবহ থাকার ভিতরেই ৫ আগস্ট অযোধ্যায় ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তুপের উপরে তথাকথিত রামমন্দিরের শিলান্যাসের সিদ্ধান্ত এবং যাবতীয় তোড়জোড় ঘিরেও কিন্তু ভারতের অবিজেপি রাজনৈতিক দলগুলির এমনকি বামপন্থী দলগুলোর পর্যন্ত তেমন কোনো হেলদোল নেই। গোটা করোনাকালটিতে আর এস এস – বিজেপি ব্যস্ত থেকেছে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি সাম্প্রদায়িকতার প্রচারে। এই সময়কালটিতে সাম্প্রদায়িক শিবিরের রাজনৈতিক প্রবণতা ঘিরে অবিজেপি শিবিরকে প্রায় কথা বলতেই শোনা যায়নি। নিজামউদ্দিনে তাবলিগ জামাতকে ঘিরে মুসলমান সমাজের বিরুদ্ধে করোনা ছড়ানোর মতো নোংরা অভিরোগ আর এস এস- বিজেপি শিবির করেছে।

বামপন্থীদের শীর্ষস্তর থেকে এই অপপ্রচারের বিরোধিতা করা হলেও সেই প্রচারকে তারা কোনো অবস্থাতেই ভূমি স্তরে প্রবাহিত করতে পারেননি। ফলে নানা অর্থনৈতিক বিষয়কে ঘিরে এই সময়কালে একটা নিয়মতান্ত্রিক প্রচার সামাজিক গণমাধ্যমে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে লকডাউনের নিয়মনীতি মেনে প্রকাশ্যে বামপন্থীরা সোচ্চার হলেও অনলবর্ষী মহঃ সেলিম ছাড়া সাম্প্রদায়িক ইস্যুতে বামপন্থীদের এতোটুকু সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। সেলিম প্রকাশ্যে বলবার পর অন্যতম শীর্ষ বামপন্থী নেতা সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও অর্থনৈতিক দাবির পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক বিভাজন, মন্দির তৈরির জন্যে কেন্দ্রীয় সরকারের এই করোনাকালের ভিতরেই ট্রাস্ট তৈরি, সর্বশেষ ভিত পূজোর সিদ্ধান্ত– এসব ঘিরে বামপন্থীদের হিমশীতল নীরবতা সত্যি ই আগামী দিনের ভারতের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির নিরিখে একটি ভয়ঙ্কর বেদনাবাহী সঙ্কেত।

বিজ্ঞাপন

বাবরি মসজিদির ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে, মসজিদের জমিকে আইনি লেবাস দিয়ে বিতর্কিত রামমন্দিরের জমি হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে, সেখানে মন্দিরের ভিত পূজোকে কোনো একটি সাধারণ মামুলি বিষয় হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। হাজার হাজার বছর ধরে ভারত যে সম্প্রীতি, পরমতসহিষ্ণুতা, পরধর্মসহিষ্ণুতা, বহুত্ববাদের চর্চা করে আসছে, একটি পবিত্র মসজিদের জমির উপরে, আইনের অলিগলিপথ বেয়ে, সেই জমিতে একটি বিতর্কিত মন্দিরের শিলান্যাস করলে, হাজার হাজার বছরের ভারতীয় সংস্কৃতির যে মৃত্যু ঘটবে- এদিকে ভারতের কোনো রাজনৈতিক দলেরই তেমন একটা দৃষ্টি নেই।

বাবরি মসজিদের জমির উপর আইনকে নিজেদের মতো ব্যবহার করে, সংসদে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদি শক্তির এই তথাকথিত ভিত পূজোর বিষয়টি যে কেবল ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানেদেরই বিপন্ন করবে তা নয়। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মায়ানমারসহ গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের সংখ্যালঘুদের অস্তিত্বের প্রশ্নটাকেই বিপন্ন করে তুলবে। এই দেশগুলির ভিতরে যেহেতু বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ বহু চাপানউতোর অতিক্রম করে এই মুহূর্তে একটা শক্তিশালী জায়গায় রয়েছে, পবিত্র মসজিদের জমি দখল করে, আইনকে আশ্রয় করে মসজিদ স্থানান্তরিত করবার মতো পবিত্র ইসলামে অঅনুমোদিত একটি বিষয়কে স্বীকৃতি দিয়ে ভিত পুজো করার একটা ভয়ঙ্কর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে।

ভারতে এই মুহূর্তে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি। চরম মুসলিম বিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ,রাজনৈতিক হিন্দুত্বে বিশ্বাসী এই দলটি বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকুক, সেটা কোনো অবস্থাতেই চায় না। বিজেপি তাদের ‘স্বাভাবিক মিত্র’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে, যাবতীয় আন্তর্জাতিক রীতিনীতিকে অস্বীকার করে তিস্তার পানির ন্যায্য হিসসা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করে চলেছে দিনের পর দিন। ভারতের এই অন্যায় আচরণের দৌলতে, মানবতাবিরোধী মানসিকতার ফলে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী, ইসলামীয় সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি ভয়ঙ্কর রকমের সক্রিয় হয়ে উঠছে। তাদের লক্ষ্য গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা। অতীতে একুশ শতকের গোড়ায় হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এই বিজেপির ই অটলবিহারী বাজপেয়ী, যিনি সেদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তার ভূমিকা ঘিরে যথেষ্ট সংশয় আছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখে ‘হাসিনাদি’ বলে গদগদ হলেও শেখ হাসিনা যাতে বিপদগ্রস্থ হন সেই দিকেই গত প্রায় দশ বছর, নিজের মুখ্যমন্ত্রীত্বকালে সবথেকে বেশি সচেষ্ট থেকেছেন। তিস্তার পানির ন্যায্য হিসসা ডঃ মনমোহন সিংয়ের দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে নরেন্দ্র মোদির দুই দফার প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে বাংলাদেশকে দিতে দেননি। বিজেপির মূল লক্ষ্য বাংলাদেশের ইসলামীয় মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িকদের স্বার্থ রক্ষা করা। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ভারতেও হিন্দু মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িকদের স্বার্থ সিদ্ধি ঘটবে। মোদিকে এই কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনার ক্ষেত্রে সবথেকে বেশি সাহায্য করে চলেছেন মমতা। তিস্তার পানি বাংলাদেশকে না দেওয়ার পাশাপাশি আহমদ ইমরান নামক একদা ইসলামীয় মৌলবাদী সংগঠন ‘সিমি’র পদাধিকারীকে মমতা তার দলের পক্ষ থেকে ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভাতে পাঠিয়েছেন। এই ইমরানের সঙ্গে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার, আলবদর, আল শামসদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অভিযোগ আছে।বাবরি মসজিদ-আপিলের শুনানি

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময়ে নরসিংহ রাও মন্ত্রিসভার সদস্য থেকেও এই ধ্বংসলীলা ঘিরে মমতা নীরব ছিলেন। বাবরি মসজিদের জমি নিছক বিশ্বাসের জোরকে আইনি যুক্তির একটি কুপর্যায় হিসেবে খাঁড়া করে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তথাকথিত ‘রামলালা’ র বলে দেগে দিল। মমতা আজ পর্যন্ত একটি প্রতিবাদ করেননি। এই কোভিড ১৯ জনিত পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গে কার্যত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বলেই এখন কিছু নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বাজার থেকে উধাও। কোনো নির্বাচিত সরকারের ভারতের দিল্লিতে বা কলকাতায় আছে বলেই মালুম হচ্ছে না। এই রকম একটি সময়ে মসজিদের জমি আইন বলে দখল করে সেখানে মন্দিরের ভিত পুজো হচ্ছে। মমতাও কিন্তু মুখে যতোই ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলুন, সংখ্যালঘু মুসলমানদের স্বার্থের কথা বলুন, ভিত পুজো ঘিরে আজ পর্যন্ত একটি শব্দ ও উচ্চারণ করেননি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)