চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কোথাও পৌঁছাবার তাড়া নেই আমার, তাই ছোটাছুটিও নেই: শিপ্রা

সালেহীন শিপ্রা’র বই ‘প্রকাশ্য হওয়ার আগে’ বই আকারে প্রকাশ্য হওয়ার আগে থেকেই আলোচিত ‘জীবনানন্দ দাশ পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ২০১৬’ পাওয়া সূত্রে। মার্কিন গবেষক অধ্যাপক ক্লিন্টন বি সিলি ও প্রথমা প্রকাশনের যৌথ উদ্যোগে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। বইটি প্রকাশিত হয়েছে গত বছর। তার বইয়ের জন্য ২০১৮ সালের একুশের বই মেলাই প্রথম মেলা। তিনি কথা বলেছেন তার কবিতা, কাব্য ভাবনা, নিজের পড়াশোনা-প্রস্তুতি, পুরস্কার প্রাপ্তি এবং প্রাপ্তিকেন্দ্রিক নানা আলোচনা সমালোচনা নিয়ে। তার সাথে কথা হচ্ছিল নারী ও সৃজনশীলতা নিয়েও। নারী হিসেবে যেসব চ্যালেঞ্জের ভেতর দিয়ে যেতে হয় সেসব থেকে পুরস্কারের টাকা পর্যন্ত, সব নিয়েই খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি:

আপনার বই ‘প্রকাশ্য হওয়ার আগে’ প্রকাশ হয়েছে প্রায় ছয় মাস। তবু প্রথম মেলা। মেলা যেহেতু বইয়ের উৎসব। রেসপন্স কেমন?
বই সম্পর্কে যতটুকু জানি মেলার আগেই তিনশ কপি শেষ। এখন যারা কিনছেন তারা মূলত মেলাকেন্দ্রিক বই কিনে থাকেন। সে হিসেবে রেসপন্স অনেক ভালো।

পুরস্কারের একটা বড় সুবিধা হল এর ফলে বইটা সম্পর্কে মানুষ জানে, আগ্রহী হয়। সেই জায়গা থেকে আপনার বই বিচিত্র জায়গায় আগ্রহ জাগিয়েছেই হয়তো। অভিজ্ঞতা বলুন…
এটা সত্যি যে বিচিত্র বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হয়েছি। একজন ভদ্রমহিলার অনুরোধে দেখা করেছিলাম । বইটা পড়ে তিনি দেখা করতে খুব করে চেয়েছিলেন। চল্লিশের সামান্য বেশি বয়স হতে পারে তার। সাথে এনেছেন দু’বছরের বাচ্চা মেয়ে। জানালেন, ‘রক্তফুল’ নামের কবিতাটি পড়ে দেখা করার ইচ্ছে জাগে তার। ঘটনা হলো বিশ বছর বয়সে বিয়ে হবার পর তিনি ৩৬ বছর বয়স পর্যন্ত আটবার কনসিভ করেছেন। কিন্তু প্রতিবার গর্ভধারনের তিন থেকে চারমাসের মাথায় মিসক্যারেজ হয়ে যায়। অষ্টমবার মিসক্যারেজ এর পর তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বছর চারেক মানসিক রোগের চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হোন এবং এই মেয়ে শিশুটিকে দত্তক নেন। তিনি যখন আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন যে, ‘এমন কবিতা যদি লিখতে পারতাম তবে হয়তো পাগল হতাম না।’ তখন স্বার্থপরের মত আনন্দ লাগে।

এছাড়া এমন এমন মানুষের কাছে কবিতার প্রশংসা শুনেছি, এমন এমন জায়গায় কবিতা পৌঁছেছে যা আমার নতুন অভিজ্ঞতাই।

পুরষ্কার আনন্দের। বিড়ম্বনারও কখনো। বিড়ম্বনা কেমন ফেইস করতে হয়েছে?
বিড়ম্বনা সৃষ্টি হওয়ার কারণ সম্ভবত আমি নিজেই। মিডিয়ার পরিচিত মুখ হওয়াটা আমার কাছে অস্বস্তিকর। জনমানুষের পরিচিত নাম হওয়া যতটা সুখকর, পরিচিত মুখ হওয়া ততটাই ঝামেলাপূর্ণ। যে কারণে টিভি থেকে কেউ ডাকলে বা দেখা করতে চাইছেন লোকজন বা একদম অপরিচিত গোষ্ঠী থেকে কবিতা পাঠের নিমন্ত্রন আমি ‘না’ বলে দেই। যে কারণে লোকে অহংকারী বলে থাকে এবং গালিটাও দেয় পুরস্কার জড়িয়েই।

জীবনানন্দ দাশ পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ২০১৬ জয়ী সালেহীন শিপ্রার কাব্যগ্রন্থ

পুরস্কার নিয়ে উত্থাপিত বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখেন? এক্ষেত্রে পুরস্কার দেওয়া না দেওয়ার চাইতেও কোন পুরস্কার কোন পুরস্কার কে কতটা পাওয়ার যোগ্য সেই তর্ককে? যেমন এখন বাংলা একাডেমির প্রবাসী পুরস্কার নিয়ে কথা হচ্ছে। সমালোচনা হচ্ছে। আপনার কি মনে হয় পাণ্ডুলিপি দেওয়া বা পুরস্কারের জন্য বই দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সমস্ত মাথায় রাখা উচিৎ লেখকের/কবির?
পুরস্কার কখনো সাহিত্যের মান বাড়াতে বা কমাতে পারে না। বরং যোগ্য লোক পুরস্কৃত হলে তা ঐ পুরস্কারেরই মান বাড়ায়। এ কারণেই পুরস্কার আসলে সাহিত্যে সে অর্থে বড় কোনো ভূমিকাই রাখে না। কিছু বাড়তি পাঠক তার সাহিত্যের খোঁজ পায়। কিছুদিন ইতিবাচক ও নেতিবাচক আলোচনায় থাকা যায় আর টাকার অংক বড় হলে অর্থনৈতিক সুবিধা হয়।

আপনার কবিতায় প্রতীকের ব্যবহার কম। ভাষাও চলতি প্রায়। আপনার মধ্যে কি সহজ হবার ইচ্ছাটা কাজ করে?
বইটির প্রথম বাক্য, বেপথু (কম্পমান) আলোর রশ্মি। এখন সহজ চোখে কাঁপা কাঁপা এক টুকরা রোদের দিকে তাকিয়ে থাকলে শুভর প্রতীক যে আলোক রশ্মি তা এই সময়ে কেমন আছে সেদিকে নজর পড়তে সময় তো লাগবেই। এরকম অনেক প্রতীক বা symbol রয়েছে আমার কবিতার বইয়ে। সমর্পণ এবং সম্পর্কের প্রতীকরূপে ‘হাত’-এর ব্যবহার কিংবা ফণা তোলা বন্ধুর মুখ বা ফণীমনসার ঝোঁপ, কাঁটাবিদ্ধ আলো বা গোলাপ। বরং প্রতীকের ব্যবহার বেশি বলেই অন্তরনিহিত অর্থ না টেনে আক্ষরিক অর্থ নেয়ায় সহজ ভাষার বলা যাচ্ছে।
‘প্রকাশ্য হওয়ার আগে’-তে প্রচুর ছন্দ ব্যবহার করা হয়েছে(এমনকি স্বংস্কৃত ছন্দও)। গদ্যছন্দের কবিতাগুলোও স্মুথ। সাবলিল। কোথাও হোঁচট খাবার মত কসরতমূলক কোনো শব্দ বা জবরদস্তিমূলক চিত্রকল্প নেই বলে কবিতাগুলো একটানে পড়া যায়।

অনেক সময়ই অনেক লেখাকে প্রথম পাঠে বা দ্বিতীয় পাঠেও আবিস্কার করা যায় না, ভিন্ন ব্যঞ্জনার আরো পাঠ প্রয়োজন পড়ে। সাবলিল কবিতাগুলোর জন্য এটা আরো বেশি সত্য। শব্দের জংগলের চেয়ে বোধ, চিন্তা ও পরিপূর্ণতার দিকে আমার পক্ষপাত বেশি। সহজ ভাষা আবার আপেক্ষিকও। আমি বরং আমার কবিতা দূর্বোধ্য এমনটাই শুনেছি বেশি ।

কবিতা আপনার কাছে কী? কেন?
আমার ভেতরের আমির সাথে আমার বাইরের আমির যে বোধি সম্পর্কিত বোঝাপড়া, অভিজ্ঞতার লেনদেন ও পারস্পরিক সম্পর্ক এসবের ভাষিক কাঠামো যে ফর্মে সবথেকে সাবলিল ও কাছাকাছি তাই আমার কাছে কবিতা। আর মানুষের অন্তরের নির্যাস থেকেই উৎসারিত হয় তার ক্ষমতার অসীমত্ব। আর্টের সবথেকে বিশুদ্ধ ও ক্ষমতাময় মাধ্যম এজন্য কবিতা।

ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

বিজ্ঞাপন

আপনার একাডেমিক পড়াশোনা ইসলাম শিক্ষায়। তো এই পড়াশোনার জায়গাটা কবিতায় আপনি কেমন করে কাজে লাগান?
‘মাগরিবকাল, আজান মেশা ভোর , কহিতূর(তূর পর্বত) বা আরবী কবিতাংশের ব্যবহার যতটা একাডেমিক পড়াশোনার কারনে তার চেয়ে বেশি সমাজ ঘনিষ্ঠতার কারণে ব্যবহৃত। কবিতায় লাভ এটুকু যে আরবী বা ফারসি বা সংস্কৃত শব্দের ব্যবহারে এলার্জি গড়ে ওঠেনি। তারা কবিতায় প্রয়োজনীয় কি না তাই শুধু গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে পেরেছি। দশ বছর বয়স থেকে বুঝে না বুঝে বাংলার ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের সাথে পরিচয় থাকার কারণে একাডেমিকভাবে ভিন্ন এক জগতের সাথে পরিচয় আমার সাহিত্য ও লেখালেখির জন্যও যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর আচরণ ও মানসিকতাকে মূল উৎসের সাথে মিলিয়ে দেখা সহজ হয়।

বাংলা কবিতায় ঐ অর্থে বড় নারী কবি নাই। এইটা আপনি কেমন করে দেখেন? আপনার প্রস্তুতি বা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলুন…
‘বাংলা কবিতায় ঐ অর্থে বড় কোনও নারী কবি নাই’ কেন বলা হয় সে বিষয়ে বিস্তারিত অন্য কোনও গদ্যে লিখবো। এই সামান্য পরিসরে সে প্রসঙ্গ থাকুক।

লিখতে এলে সব থেকে বেশি প্রস্তুতি লাগে ‘নেয়া’য়। ‘নেয়া’ হলো পড়ে নেয়া, দেখে নেয়া, অনুভবে নেয়া, শুনে নেয়া। এই নেয়া যখন ‘দেয়া’ হতে চায় তাকে তার পারফেক্ট কাঠামোয় দিতে পারার সক্ষমতা অর্জন করা। আর এ এক চলমান প্রক্রিয়া।

জীবন কে একটা সময় স্থির ও স্থিত করে নিতে হয় , জীবন হতে উৎসারিত নির্যাসকে উপলব্ধি করবার জন্য হলেও।

নারীকে যেভাবে পুরুষ সাহিত্যে আনে, সেই মূর্তি ফিক্সড হয়ে আছে। সৌন্দর্য চেতনা কিংবা যৌনতার ক্ষেত্রে পুরুষকে নারী তার লেখায় পজেটিভভাবে ঠিক কতটা আনে সাহিত্যে? বা অই নির্দিষ্ট মূর্তিকে নারী কবি বা সাহিত্যিকরা আদৌ ভাঙার চেষ্টা করেন কি না বা আদৌ ভাঙার দরকার আছে কি না? এমন কি হয়, আপনি লেখেন সময় আপনার ‘নারীত্ব’ নিয়ে সচেতন থাকেন। মানে বিষয়টা সচেতনভাবে এড়ান বা নির্মাণ করেন? কোনটা এবং কেমন?
মধ্যযুগের কবি চন্দ্রাবতী পুরুষের রুপ তুলনা করেছেন- ‘পর্বতের চূড়া, কাঞ্চাসোনা, চান্দ, কার্তিকের রুপ।’ সবচেয়ে বেশি মজা লেগেছে ‘রণদৌড়ের ঘোড়া’। নারী মলুয়া বলছে, ‘আইতো যদি সোনার অতিথ যৌবন করতাম দান।’ এ পর্যন্ত খুব কম সংখ্যক নারীর সাহিত্য আমরা পেয়েছি। পুরুষ নারীর অনুপাত শতকরা ৮৫:১৫ হবে। তবু সেখানে নারীর বয়ানে পুরুষের সৌন্দর্য ও যৌনতা ক্ষমতা ও শক্তির দিকে ইঙ্গিতবাহী। সামাজিক মনস্তত্বই এর কারণ ছিল। এখন নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন এবং সামাজিক অবস্থানের ভিন্নতা এই ফিক্সড মূর্তিগুলো ভাঙতে শুরু করেছে।

আবার বইয়ে ফেরা যাক, কবিতাগুলো নিয়ে বলুন। পাঠক কী পাবে আপনার কবিতায়?
আমার কবিতায় পাঠক ‘কবিতা’ পাবেন এটা নিশ্চিত। হাহাহা! সাহিত্যে পাওয়া নির্ভর করে নেয়ার সক্ষমতার উপর। আমার কবিতা টোটালিটি, বোধ, ভাষার থ্রোয়িং, সাবলিলতা চিন্তার ধরন পাঠক তার মত করে খুঁজে পেতেও পারেন, নাও পারেন।

ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

পাণ্ডুলিপি জমা দেয়া পুরষ্কার ঘোষণা বই হওয়া আনুষ্ঠানিকতা…লম্বা একটা সময় ব্যয় হল। একটা বইয়ের পেছনে এতো সময় দিলেন বা বইটা নিলো। ক্লান্তি কাজ করে না? পরের কাজ কী করবেন? আপাতত পরিকল্পনা কী?
প্রথমা বইটা না করলে বইটা হয়তো আরো পরে করতাম। পুরস্কারের জন্য পাণ্ডুলিপি দেওয়ার একমাত্র কারণ বইটা হওয়া। বই করার ব্যাপারটা না থাকলে দিতাম না। বই তো হলো। আমার আসলে কোথাও পৌঁছাবার তাড়া নেই বলে ছোটাছুটি বা অস্থিরতা নেই, ছিল না। যে কারনে ক্লান্তিও নেই। পরের পাণ্ডুলিপি এগোচ্ছে একটু একটু করে।

ভালো কথা, পুরস্কারের টাকায় কী করলেন? (হা হা হা)
নামের বানানে একটা ‘এ’ কম পড়ে যাওয়ায় পুরস্কারের চেকটা এখনো আনা হয়নি। ঠিকঠাক করে আজ হয়তো পাঠিয়ে দেবে।

ধন্যবাদ। ভালো থাকুন।
আপনিও ভালো থাকুন।

ফিচার ফটো: তন্দ্রা জারা

বিজ্ঞাপন