চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কেমন আছো তোমরা সবাই?

করোনাকালে এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা

বাসায় আমরা তিনটি মানুষ ছাড়া স্বজনদের সঙ্গে দেখা হয় না কতোদিন! দ্বিতীয় পরিবার যে অফিস, সেই অফিসের বেশিরভাগ মানুষদের দেখি না প্রায় দুইমাস। পথে অজানা-অচেনা মানুষের ভিড়ে ট্রাফিক জ্যামের জ্বালায় অস্থির থাকতাম সবসময়, সেই মানুষদেরও দেখি না দিনের পর দিন। বাজারে যাওয়া হয় না, যতোটুকু না হলেই নয়– তার সবকিছু হোম সার্ভিস, তার জন্য আবার স্যানিটাইজেশন! রান্নাবান্না আর ঘর পরিষ্কার– এর বাইরে বাড়িতে তেমন কোনো ব্যস্ততা নেই। কন্যার ব্যস্ততা অবশ্য কিছুটা বেড়েছে, বাড়িতে বসে লেখাপাড়ায় যোগ হয়েছে অনলাইন টিউটোরিয়াল। কিন্তু, একবার ভাবুন ১৬ বছর বয়সী একটি মেয়ে দুইমাসের বেশি সময় ছাদে যাওয়া ছাড়া বাসা থেকে বের হতে পারেনি!

যে পনেরোটি পরিবার আমরা একটি ভবনে থাকি, সেখানে সারাক্ষণ শূনশান নীরবতা। লিফটে-সিঁড়িতে আগে বাচ্চাগুলোকে দেখতাম ক্রিকেট ব্যাট বা ফুটবল হাতে মাঠে যাচ্ছে, এখন তারা খেলতে ছাদেও যায় না। পনেরোটি পরিবারের পুরো বাড়িতে মাত্র তিনজন মানুষের বাইরে যাওয়া-আসা; একজন আমি, একজন নিটর (পঙ্গু হাসপাতাল) পরিচালক এবং আরেকজন চিকিৎসক।

বিজ্ঞাপন

ঢাকার যে এলাকাটিতে আমার বসবাস, সেটা তুলনামূলক রাজধানীর নীরব এলাকাগুলোর একটি। কিন্তু, স্কুল থাকায় সকালে-দুপুরে-বিকেলে তিনবেলা নিয়ম করে আধাঘণ্টা করে চরম জ্যাম এবং হইচই। মনে হতো সেটাই যেন প্রাণ। সবই বন্ধ দুইমাসের বেশি সময়। এখন হঠাৎ দুয়েকজনকে ভ্যানগাড়িতে সবজি বা ফলমূল বিক্রি করতে দেখা যায়। এর বাইরে আবাসিক এলাকাটিতে দিনের যেকোনো সময় মনে হবে কারফিউ।

বিজ্ঞাপন

এলাকায় শুরুর দিকে বিদেশফেরত বেশ কয়েকজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হওয়ায় আতঙ্ক চলছে তখন থেকেই। রাস্তার দু’পাশে যে বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোর সামনে হঠাৎ দুয়েকজন সিকিউরিট গার্ড ছাড়া এখন কাউকে দেখা যায় না। একই এলাকায় থাকা বন্ধু শওকত শাহীন প্রতি সন্ধ্যার পর আমার বাসার নীচে এসে ফোন দিতো, কিংবা আমি তার বাসার নীচে গিয়ে, তারপর দু’জন হাঁটতাম, সেই বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়নি ২৬ মার্চের পর।

উল্টোপাশের বিল্ডিংয়ে থাকা সাংবাদিক দম্পতি জাহিদুল ইসলাম সজল ও ফাহমিদা আখতারের ছেলে ফিদেল আমাদের পরিবারেরই একটি অংশ। সকাল-বিকাল তার যাওয়া-আসা আমাদের বাসায়। সেই ছেলেটিকেও দেখি না কতোদিন!

বাসার পাশের যে দোকানটি থেকে নিত্যদিন কেক কিনে পথের কুকুরগুলোকে খেতে দিতাম, সেই কুকুরগুলোকে দেখি ঠিকই কিন্তু তাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত হয় না। এখন কখনো কখনো পথচারী কাউকে তিনতলা থেকে টাকা দিয়ে ওই দোকান থেকে কেক বা বিস্কিট কিনে কুকুরগুলোকে খেতে দিতে বলি। কুকুরগুলো নিত্যদিন তাদের উপস্থিতি জানান দেয়, কিন্তু মধ্যবিত্ত ভয়ে তাদের মুখে নিজে খাবার তুলে দিতে পারি না। ওই কুকুরগুলোর আসল বন্ধু ছিল ওই চা দোকানটিতে ভিড় করা পাশের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা। সেই ছেলেমেয়েগুলো আসতে পারছে না আজ কতোদিন!

দুইমাস ধরে অস্থির কিন্তু বিষণ্ন এক পরিবেশের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা সবাই। এর মধ্যে করোনাভাইরাসে কাছের মানুষের মৃত্যুও দেখার দুঃসহ অভিজ্ঞতাও হয়েছে। সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকন ছিলেন কাছের এক মানুষ। করোনাভাইরাসে মৃত্যু হয়েছে তার। তার স্ত্রী-পুত্রও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন হাসপাতালে। আরেক সাংবাদিক মাহমুদুল হাকিম অপু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে আমাদের এক বছরের সিনিয়র, তিনি করোনাভাইরাস উপসর্গ নিয়ে চলে গেছেন। পরীক্ষায় নেগেটিভ আসলেও করোনাভাইরাস উপসর্গ নিয়ে ভোরের কাগজের সাংবাদিক আসলাম রহমানের মৃত্যুতেও প্রিয়জনের চিরবিদায়ের বেদনা অনুভব করছি।

তাদের মৃত্যুতে সাংবাদিক হিসেবে সাংবাদিকদের নিয়ে ভয় আরো বেড়েছে। চিকিৎসক-পুলিশের মতো ফ্রন্টলাইনারদের তবু সরকারি পর্যায়ে সুরক্ষা এবং আশ্বাস আছে, কিন্তু সাংবাদিকদের!

কর্মীসংখ্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে এলেও অন্য টেলিভিশনগুলোর মতো আমার অফিসের অনেক সংবাদকর্মীকেও মাঠে গিয়েই কাজ করতে হচ্ছে। ঢাকার বাইরেও একই চিত্র। যতোই সুরক্ষার ব্যবস্থা করি না কেন, তাদের সাহস দিতে এবং পাশে আছি বোঝাতে যতোই নিজে অফিস করি না কেন, সবার জন্যই সবসময় একটা উৎকণ্ঠা কাজ করে। এর মধ্যেই খবর পাই অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানে সংবাদকর্মীরা বেতন পাননি, অনেককে সুরক্ষা ছাড়াই কাজ করতে হচ্ছে। সাংবাদিকতার বৃহত্তর এ পরিবারের কষ্ট সবসময়ই ছুঁয়ে যাচ্ছে। কিছু করতে না পারার বেদনাও অনেক। সঙ্গে পরিবার এবং স্বজনদের জন্যও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সারাক্ষণ।

বিজ্ঞাপন

সেদিন অফিসের যে ড্রাইভার আমাকে নিয়মিত নিতে আসেন, তিনি বলছিলেন তার নাতনীকে তিনি শুধু দূর থেকে দেখে চলে আসেন। কতোদিন কোলে নিতে পারেন না নাতনীকে, কোনো খাবার নিয়ে যেতেও ভয় হয় তার। মাঝে একদিন আমাদের বৃহত্তর পরিবারের ছোট দুই সদস্য রামিন-তিতিরকে দেখতে গিয়েছিলাম, গেটের ভেতরে তারা, আমি আর বীথি বাইরে, কোলে আসার জন্য বাচ্চা দুটি ছটফট করছিল, কিন্তু আমরা অসহায়। একদিন রিমঝিমের ছোটমামা এসেছিল, তাকেও চলে যেতে হয়েছে দূরে দাঁড়িয়েই সবার সঙ্গে কথা বলে।

ভিডিও কলেই এখন স্বজনদের সঙ্গে যতো দেখাদেখি। একদিন সদ্য মাস্টার্স করা ভাতিজি তাবাসসুম শাড়ি পরে সেজেগুজে ভিডিও কলে এসে বললো, বন্দিজীবন আর ভালো লাগে না– তাই সেজেগুজে প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলাটাই যা একটু শান্তির আর স্বস্তির। তার মতো ফেসবুকে লাইভ বা ছড়া-কবিতায় সময় পার করার চেষ্টা করছেন পরিবারের আরো অনেকে।

তবে, পরিবার এবং প্রিয়জন-স্বজনদের সবাই যে এটুকু স্বস্তিও পাচ্ছেন তেমন নয়। সার্বক্ষণিক করোনাভাইরাস নিয়ে টেনশন এবং এ ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকার চেষ্টার মধ্যে বেসরকারি চাকরি করা মানুষগুলোর চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়েও টেনশন কম না। আপাতত মোটামুটি চালিয়ে নিতে পারলেও ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে, তারা জানেন না। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও আছেন অনেকে, সঙ্গে নানামুখি টেনশন।

আমাকে অফিস করতে হয় তাই অন্যরা টেনশনে থাকেন। অন্যদের জন্য আমি এবং আমরাও। এরমধ্যে এক নিকটাত্মীয় যাকে শত শত কারাবন্দীর দেখাশোনা করতে হয়, তাকে আইসোলেশনে যেতে হয়েছে ওই কারাগারের চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে। পরীক্ষায় সে নিকটাত্মীয় নেগেটিভ হলেও ওই রেজাল্ট আসা পর্যন্ত টেনশনে থাকতে হয়েছে অনেক। আরেক নিকটাত্মীয় যার চাকরিটা এমন যে শিপমেন্ট ইন্সপেকশনে দেশে দেশে ঘুরতে হয়, সে তার নিজের বাসায় ফিরতে পারছে না। প্রতিবার তার পালার পর তাকে ১৪ দিন সিডনির হোটেলে থাকতে হচ্ছে, এরপর আবার নতুন পালার জন্য উড়ে যেতে হচ্ছে ভিন্ন কোনো দেশে। উন্নত দেশে থাকা প্রবাসী স্বজনদের নিয়ে টেনশন থাকলেও নির্ভরতা আছে। যেকোনো সমস্যায় তারা চিকিৎসা পাবে। কিন্তু, আমরা?

নানামুখি অনিশ্চয়তার মধ্যে ফ্রন্টলাইনার চিকিৎসক স্বজনদের নিয়ে টেনশন আরো বেশি। পরিচিত যারা চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা কাছের মানুষের কাছের মানুষ যারা চিকিৎসক, তাদের নিয়েও সার্বক্ষণিক এক ভয় তাড়া করে ফেরে। একজন সহকর্মী যখন তার চিকিৎসক স্ত্রীর জন্য দোয়া প্রার্থনা করেন তখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পাশাপাশি চোখে জল জমা হয়।

আমাদের সহকর্মী নীলাদ্রি শেখর অফিসের ফেসবুক গ্রুপে যে পোস্টটি দিয়েছেন সেটা এখানে উল্লেখ করছি।

তিনি লিখেছেন: যদিও বিষয়টা ব্যক্তিগত তাও আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি। কারণ আমি মনে করি, এটাও আমার আরেকটা ফ্যামিলি। আমার স্ত্রী ডা. উম্মে নাজমিন ইসলাম, আগামীকাল থেকে কোভিড ডেডিকেটেড ইউনিট, ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। করোনা ভাইরাসের কারণে চিকিৎসকরা কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু তাই নয়, আগামী একুশ দিন তাকে, আমার দুই বছরের সন্তান ছেড়ে হোটেলে থাকতে হবে। এটা অবশ্য শুধু আমার না, যে ফ্যামিলিতে ডাক্তার আছে কম-বেশি একই চিত্র। আপনাদের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আমি শুধু বলবো, তার জন্য একটু দোয়া করবেন। সৃষ্টিকর্তা যেন সবাইকে ভাল রাখেন। সকলের মঙ্গল হোক। আমরা করোনা শেষ করে একটা সুন্দর একটা আগামী পাবো।

সেই সুন্দর একটা আগামীর স্বপ্ন দেখছি আমরা সবাই। এ ঢাকা শহর এবং এ বাংলাদেশ আবার তার আসল রূপে করে ফিরে যাবে, সেজন্য অপেক্ষার প্রহর চলছেই। জানি না কবে আবার নিশ্চিন্তে ওষুধের দোকানে যেতে পারবো? কবে ঠকে গেলেও টাউনহল বাজারে গিয়ে ব্যাগভরে বাজার করতে পারবো? কবে শরীরে শরীর লেগে গেলেও ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে পারবো ভয় না পেয়ে? কবে দুঃসহ জ্যামেও মাস্ক ছাড়া বুকভরে দম নিতে পারবো? কবে কফিশপে গিয়ে একটা কাপুচিনোতে চুমুক দিতে পারবো শান্তিতে? কবে আবার রিমঝিমকে স্কুলে বা কোচিংয়ে নিয়ে যেতে পারবো? কবে দরকারে বা অদরকারে বীথিকে নিয়ে রিকশায় ঘুরতে পারবো নিশ্চিন্তে?

কাছের-দূরের সবাইকে সারাক্ষণ আমাদের প্রার্থনার মধ্যে রেখেছি। নিশ্চয়ই আমরা সবাই আছি সবার প্রার্থনায়।