চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কেমন আছেন নগরীর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা?

করোনাভাইরাসের কারণে প্রায় মাস ছয়েক দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে লকডাউন আর নানা নিষেধাজ্ঞার কারণে শহরের অর্থনীতি লম্বা সময় ধরে থমকে ছিল একেবারেই। লকডাউন শিথিল হওয়ার পর সেই প্রবণতা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। ধীরে ধীরে এখন অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে। কিন্তু সেই আগের জায়গায় অর্থনীতি এখনও ফিরে যেতে পারেনি। এই ফিরে না যাওয়ার অন্যতম কারণই হলো মানুষের আয় কমে যাওয়া। বাংলাদেশ পরিসংখ্যন বুরো গত সেপ্টেম্বর মাসে করা এক জরিপে জানিয়েছিল, করোনাভাইরাসের কারণে প্রতি পরিবারের আয় গড়ে চার হাজার টাকা কমে গেছে এবং এ কারণে প্রতি পরিবারের ৫২ শতাংশ খাবার গ্রহণের পরিমাণও কমে গেছে।

করোনাকালে বড় ব্যবসায়ীদের আয়-ব্যয় নিয়ে যতোটা হৈ চৈ হয়েছে বা প্রণোদনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে যে নানা কথা হয়েছে, সেই তুলনায় প্রান্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কথা সেই অর্থে তেমন কোনো আলোচনাই হয়নি। ফলে দেশের অগণিত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কপাল পুড়লেও তা নিয়ে কাউকে তেমন তৎপর হতে দেখা যায়নি। লকডাউন চলার সময় দেখা গেছে, প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে বাড়ি চলে গেছেন। অনেকেই বাড়ি গিয়ে অন্য পেশার সাথে যুক্ত হয়েছেন। নগরে ফিরে আসার আর সাহস দেখাননি। এরকম শতসহ সহস্র ঘটনা ঘটেছে। ছোট ছোট মুদী দোকান থেকে শুরু করে লন্ড্রী, সেলুন বন্ধ হয়ে গেছে অনেক। আবার এখনও যারা চালু রেখেছেন তাদের সময়ও খুব ভাল যাচ্ছে না। কেনাবেচা সেই আগের মতো একদমই নেই। আর তাই উদ্বেগ কাটিয়ে উঠতে পারছেন না বেশিরভাগ প্রান্তিক ব্যবসায়ী।

বিজ্ঞাপন

কদিন আগে কথা হচ্ছিলো মোহাম্মদপুর নূরজাহান রোডের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইউনুস মিয়ার সাথে। ইউনুস মিয়া ক্ষুদ্র এক জুতা ব্যবসায়ী। সীমা সুজ নামে তাঁর একটি জুতার দোকান আছে নূরজাহান রোডে। প্রতিমাসে তাঁকে ভাড়া বাবদ বারো হাজার টাকা গুণতে হয়। লালবাগ, নবাবগঞ্জ থেকে পাইকারী দামে বিভিন্ন ধরনের জুতা, স্যান্ডেল এনে বিক্রি করেন তিনি। আগে প্রতিদিন গড়ে তাঁর চার থেকে ছয় হাজার টাকা বিক্রি হতো। শুক্রবারের দিন কেনাবেচা কখনও কখনও দশহাজারের বেশি হতো। কিন্তু করোনা দুর্যোগে ইউনুস মিয়ার জুতার দোকানে সেই আগের মতো বিক্রি নেই। সারাদিন টেনেটুনে দুই হাজার বা পঁচিশশত টাকা বিক্রি হয়। কালভদ্রে হয় তিন-চার হাজার টাকা। লকডাউনের কালে ইউনুস মিয়ার দোকান বন্ধ ছিল। তখনও তাঁকে প্রতিমাসে ভাড়া গুণতে হয়েছে আগের নিয়মে। লকডাউন শিথিল হওয়ার পর তিনি নিয়মিত দোকান চালু রেখেছেন। কিন্তু কোনোভাবেই কেনাবেচা বাড়ছে না। ইউনুস মিয়া জানান প্রায় প্রতিমাসেই তিনি নিজের পুঁজি ভেঙে খাচ্ছেন। ব্যবসা চালাতে গিয়ে তিনি এখন অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছেন। এরকম অবস্থা থাকলে তিনি সামনে কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।

বিজ্ঞাপন

ইউনুস মিয়ার মতো আরেক ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জাহানারা বেগম। জামালপুরের এই নারী পৈত্রিকসূত্রে বিভিন্ন ধরনের রঙিন চুড়ির ব্যবসা করেন। ঢাকার বিভিন্ন অলিগলিতে বসলেও মূল ঠিকানা সংসদ ভবনের সামনের ফুটপথ। অনেকদিন ধরে এখানে চুড়ি বিক্রি করেন। প্রতিদিন বিকেলে এসে বসেন। রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত বেচাকেনা করেন। কিন্তু সেই আগের মতো বেচাকেনা নেই। জাহানারা বলেন, ‘সারাদিন বসে থাকি কাস্টমার নেই। গড়ে এখন প্রতিদিন বিক্রি হয় পাঁচ-সাতশত টাকা। অথচ করোনার আগে প্রতিদিন দুই তিন হাজার টাকার চুড়ি বিক্রি হতো। যা বিক্রি হতো তা থেকে হাজার বারোশ টাকা লাভ থাকতো। কিন্তু এখন সারাদিন কাস্টমারের জন্য চেয়ে থাকতে হয়। অনেকই আসেন দামদরও করেন। কিন্তু কেন জানি আর কনতে চান না।’ জাহানারা আরও বলেন, করোনা আসার কারণে ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের মারাত্বক ক্ষতি হয়েছে। এখন সেই আগের মতো বাসাবাড়ির লোকজন বেড়াতে বের হন না। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে তরুণীরাও তেমন আসেনা। জাহানারার মতে এখন যে আয় হয় তাতে করে ঘর ভাড়া দিয়ে ঢাকাতে থাকাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাহানার আশাবাদী করোনাকাল কেটে গেলে আবার সেই সুন্দর দিন ফিরে আসবে। আবার বেচাকেনা বাড়বে। ইউনুস মিয়া আর জাহানারার মতো হকার জাহাঙ্গীরের অবস্থাও একইরকম। সন্ধ্যা হলে নবোদয় হাউজিং থেকে পান সিগারেট বিক্রি করতে বের হতেন। এগলি ওগলি ঘুরে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতেন ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরে। কত মানুষের মুখে রুচি এনে দিতেন পান-মশলা দিয়ে। ভাল বিক্রি হতো। দুই তিন হাজার টাকারও বেশি হতো কখনও কখনও। কিন্তু এখনও বিক্রি নেমে এসেছে অর্ধেকে। আর লাভও হয় সামান্য। জাহাঙ্গীরের বক্তব্য করোনা আসার পর মানুষ আগের মতো পান-সিগারেট খান না। অনেকেই ঘরের বাইরে এসে কিছু মুখে দিতে চান না। আর তাই বিক্রি নেই সেই আগের মতো।

এই নগরীতে ইউনুস মিয়া, জাহানারা, জাহাঙ্গীরের সংখ্যা হাজার হাজার। যারা মাইনে পান না, বেচাবিক্রি করাই মূল সম্বল। ভাল বিক্রি হলে ভাল বাজার করে হাসিমুখে ঘরে ফেরেন। আবার সাতসকালে পুুঁজি নিয়ে ছুটেন পাইকারের দোকানে নতুন কোনো পণ্য আনতে। কিন্তু বেচাবিক্রি ভাল না হলে পুঁজির সংকট তাদের তীব্র হতে থাকে। এই করোনাকালে পুঁজির সংকট থেকে কোনোভাবেই তাদের মুক্তি মিলছে না। আর তাই প্রতিদিনই চিন্তার ভাঁজ তাদের মুখে। প্রতিদিনই বাড়ছে দায়-দেনা। দারিদ্র্যের মহা এক চক্রের মধ্যে নিত্য ঘুরপাক খেতে হচ্ছে তাদের। উদ্বেগ-সংকটে ডুবে থাকলেও তাদের পাশে কেউ নেই বললেই চলে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)