চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কেবল আইন বদলালেই কি ধর্ষণ কমবে?

নোয়াখালী জেলা বেগমগঞ্জ থানার ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের এক নারীকে বিবস্ত্র করে অমানবিক নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে৷ ধর্ষকরাই তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে৷ সিলেটে ঘটেছে আরেক গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনা৷ নগরীর শামীমাবাদ এলাকার ৪ নং রোডে এই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। শুধু কি নারী ধর্ষণ? শিশু ধর্ষণ ও বলাৎকারও চলছে৷ নারায়ণগঞ্জের কওমি মাদরাসায় ১১ বছরের এক ছেলে শিশুকে বলাৎকার করেছে ওই মাদ্রাসারই এক শিক্ষক৷ দেশ জুড়ে আসলে হচ্ছেটা কী?ঘর, পথ, মসজিদ, মন্দির গীর্জা সর্বত্রই ধর্ষকদের বিচরণ৷ এটা কতটা কুরুচিপূর্ণ ঔদ্ধত্য যে ধর্ষকরা নিজেরাই ধর্ষণের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়ে দেয়৷ এটা কি দেশব্যাপী ধর্ষণকাণ্ডের প্রতি আরও উদ্বুদ্ধ করার বাসনায় নয়?

কুুষ্টিয়া উপজেলার পোড়াদহ ইউনিয়নের স্বরুপদহ চকপাড়া এলাকার সিরাজুল উলুম মরিয়ম নেসা মাদ্রাসায় ঘটেছে আরেক শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনা । ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মাদ্রাসা ঘেরাও ও ভাঙচুর করেছে। এই মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে দফায় দফায় ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি জানাজানি হতেই এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে লোকটি। শিক্ষার্থীরা যদি তার শিক্ষককেই বিশ্বাস করতে না পারে তবে আর কাকে বিশ্বাস করতে পারবে? কাকে ভরসা করতে পারবে? জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলাতেও এক গৃহবধূকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেছে একদল ধর্ষক৷ হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি ইউনিয়নের পরিত্যক্ত ভবনে ঘটেছে আরেক গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা৷ দেশব্যাপী মহামারির মত ছড়িয়ে গেছে এমন ধর্ষণের ঘটনা৷ ধর্ষণের শিকার হচ্ছে শিশু, কিশোর, কিশোরী, যুবতী, মধ্যবয়সী সকলেই৷ ধর্ষণের শিকার হচ্ছে সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু, আদিবাসী সকলেই৷ কোন নারী, শিশুই যেন নিরাপদ নয় আজকের বাংলাদেশে৷

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

রংপুরের বদরগঞ্জে রুখিয়া রাউৎ নামে এক আদিবাসী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার পাঁচপুকুরিয়ায় আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে শালবাগানে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তার মৃৃতদেহ পাওয়া যায়৷ মেয়েটি রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী৷ ধর্ষণের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছে সাধারণ মানুষ৷ উত্তাল হয়ে উঠছে শাহবাগ৷ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এর আগেও বহুবার ধর্ষণবিরোধী সমাবেশ হয়েছে৷ নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে মারুফা ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ৷ কিন্তু ফল কি হল? ধর্ষক উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বহাল তবিয়তে৷ বিচারহীনতার সংস্কৃতির জন্যই কি ধর্ষণের এই মহামারি সৃৃষ্টি হলোনা? বিভিন্ন জায়গায় ধর্ষকরা এভাবেই নিরাপদে থেকে যাচ্ছে৷ মারুফা ধর্ষণের প্রতিবাদকারী চলে গেছে জেলে৷ আর ধর্ষক পেয়ে গেছে মুুক্তি৷ শুধু কি তাই ঢাকায় ধর্ষণ বিরোধী গ্রাফিতি আঁঁকতে গিয়ে পুুলিশী হামলার শিকার হয়েছে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কর্মীরা৷

শাহবাগে বিক্ষোভকারীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছে৷ আর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান হচ্ছে৷ সব যদি প্রধানমন্ত্রীকেই দেখতে হয় তাহলে এসব মন্ত্রণালয়ের জন্য রাজকোষের অর্থ খরচের যুক্তি কি? মন্ত্রিপরিষদের মন্ত্রীদের কি কোন জবাবদিহিতা নেই? ধর্ষণ এবং ধর্ষণের শাস্তি কী ছিল? ধর্ষণের শাস্তি সম্পর্কে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ৯ মতে, যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন৷ কিন্তু এ আইনে কতজন ধর্ষক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত হয়েছেন? মারুফা ধর্ষকের মত আরও কত কত ধর্ষক আইনের ফাঁক ফোকরে বহাল তবিয়তে রয়েছেন৷ সে হিসাব কি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাখেন? যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সঠিক ব্যবহার হলেও ধর্ষণের এই মহামারি কি শুরু হতো?

বিজ্ঞাপন

ধর্ষণ মামলাগুলোকে কেন দ্রুত বিচার আইনে নেয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না? অথচ আইনে রয়েছে, সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, জনস্বার্থে, হত্যা, ধর্ষণ, আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য এবং মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত অপরাধের বিচারাধীন কোন মামলা উহার যে কোন পর্যায়ে ক্ষেত্রমত, দায়রা আদালত বা বিশেষ আদালত বা ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত হইতে বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করিতে পারিবে৷ এ দেশে এ পর্যন্ত কয়টি ধর্ষণ মামলা দ্রুত বিচার আইনের অধীনে গেছে? ধর্ষণ মামলার শাস্তি তো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ছিল৷ সেই আইনেই সব মামলার রায় দ্রুত বিচার আইনে সম্পন্ন হলে কি ধর্ষণ আজকের মতো এইরকম মহামারি আকার ধারন করতো?আর রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা কী? ভারতে ধর্ষিতা পরিবারের সাথে স্বাক্ষাৎ করে ক্ষমা প্রার্থনা করলো বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা৷ কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থা কি?তারা কি বিবেকের তাড়নায় এর বিরুদ্ধে একাট্টা হতে পেরেছে? তারা কি পারেনা গঠনতন্ত্রে একটি ধারা সংযোজন করতে যাতে ধর্ষণকারীকে দল থেকে বহিষ্কার ও তাকে আইনে সোপর্দ করা হবে ? আর বাস্তবে কী ঘটছে? সিপিবির একজন কেন্দ্রীয় নেত্রী শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনেছে দলেরই একজন মহানগর নেতার বিরুদ্ধে৷ কেন এই নেত্রীকে বিচারের দাবিতে অনশনে বসতে হলো?কেন দল তার দ্রুত সুবিচার করতে পারলো না? ধর্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের উচিত নয় কি কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া?

শিশু, কিশোর, কিশোরী, স্কুল ছাত্রী, মাদ্রাসা ছাত্রী, কলেজ ছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী, শিক্ষিকা, নেত্রী কেউই ধর্ষণ ঝুঁকিমুক্ত নয়৷ এক্ষেত্রে কেবল ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করলেই হবেনা৷

রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ,ধর্মীয় সংগঠন, সরকারী বেসরকারী অফিস আদালত কর্তৃক ধর্ষককে প্রত্যাহার করে আইনে সোপর্দ করার শপথ করতে হবে৷ আর প্রতিটি মামলার বিচার হতে হবে দ্রুতবিচার আইনে৷ দুঃখের বিষয় হলো এমনটি না করে কেউ কেউ এটাকে নিয়ে ইস্যুবাজী করে চলছে৷ ধর্ষণবিরোধী সমাবেশে সরকার পতনের দাবি করছে৷ এসব বিভ্রান্তির কারণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা আন্দোলন হচ্ছে দ্বিধাবিভক্ত৷

এই মুহূর্তে দাবি ওঠা উচিত সকল ধর্ষণ মামলাকে দ্রুত বিচার আইনে নিতে হবে৷ সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন সমূহে ধর্ষক সম্পর্কে গঠনতান্ত্রিকভাবে স্পষ্ট অবস্থান ঘোষণা করতে হবে৷ ধর্ষকের পক্ষাবলম্বনকারীদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে৷ ধর্ষকের পক্ষে কোন আইনজীবী কোর্টে দাঁড়াতে পারবেনা৷ সরকারী বেসরকারি অফিসে কারও বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে তাকে চাকরিচ্যুত করে সংশ্লিষ্ট অফিসকেই তাকে আইনে সোপর্দ করতে হবে৷ কোন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে তাকেও আইনে সোপর্দ করার উদ্যোগও সংশ্লিষ্ট দলকেই নিতে হবে৷ এসব না করে কেবল ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে মৃত্যদণ্ডে নিলে কাজের কাজ কিছুই হবেনা৷ তাই মানুষ চায় কেবল আইনের কাগুজে ধারা নয়। চায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ৷

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)