চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কেন খুন হয়েছিলেন জন লেনন, খুনী কে?

গুলি করে পালিয়ে যাননি চ্যাপম্যান। কোট খুলে ল্যাম্পের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রহরী যখন তাকে খুঁজতে যান, তখন চ্যাপম্যান ‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’ বইটি পড়ছিলেন…

৪০ বছর আগে ১৯৮০ সালের এই দিনে (৮ ডিসেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে নিজ বাসভবনের সামনে গুপ্তঘাতকের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন কিংবদন্তি রক স্টার জন লেনন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৪০ বছর। কেন খুনের শিকার হয়েছিলেন তিনি? খুনিই বা কে?

৫ বছরের লম্বা বিরতির পর খুন হওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে গানে ফিরেছিলেন জন লেলন। ইএমআই-এর সাথে চুক্তি শেষ হওয়ার পর বেশ অনেকদিন কোনো শো-তে অংশ নেননি তিনি। ১৯৭৫-এ তার ছেলের জন্ম হয়। এরপর ছেলের দেখাশোনায় কয়েকটি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। এর মাঝে আমেরিকার গ্রিন কার্ড পেয়ে যান। এরপর স্ত্রী ইয়োকো ওনোর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে টোকিওতে যান।

বিজ্ঞাপন

১৯৮০ সালের গ্রীষ্মে জন লেলনের ছেলে সিন এর বয়স পাঁচ হয়। জন লেনন আবার গান লেখা শুরু করেন। বারমুডাতে সময় কাটান নতুন গান নিয়ে কাজ করার জন্য। নতুন দুটি অ্যালবামের জন্য বেশ অনেকগুলো গান লিখে ফেলেন।

জন এবং ইয়োকো অ্যালবামের প্রথম গানটি রেকর্ড করার পরিকল্পনা করেন। নিউ ইয়র্কের হিট ফ্যাক্টরি স্টুডিওতে গানটি রেকর্ড করা হয় আগস্ট থেকে অক্টোবরের মাঝে কোনো এক সময়। শ্রোতাদের পছন্দ হয় গানটি। কেউ কেউ সেকেলে বলে সমালোচনাও করেন। তবে বিটলসের ভক্তরা তাদের প্রিয় তারকার প্রত্যাবর্তনে খুবই খুশি ছিলেন।

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জন লেননকে তার ছেড়ে আসা ব্যান্ড ‘বিটলস’ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়। কখনো উত্তর দেন, কখনও এড়িয়ে যান।

১৯৮০ সালের ৮ ডিসেম্বর ডাকোটা থেকে বের হয়ে হিট ফ্যাক্টরি যাওয়ার পথে জন লেনন ও তার স্ত্রী। এরপরেই ‍গুলিবিদ্ধ হন

জন লেনন থাকতেন নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কের বিপরীতে অবস্থিত ডাকোটা বিল্ডিং-এ। ১৯৮০ সালের ৮ ডিসেম্বর জন লেলন রোলিং স্টোন ম্যাগাজিনের জন্য ডাকোটা বিল্ডিংয়েই ফটোশুটে অংশ নেন। এরপর একই জায়গায় রেডিওর জন্য একটি সাক্ষাৎকার দেন।

রেডিওতে সানফ্রানসিসকো ডিজে ডেভ শোলিন-এর নেয়া এক সাক্ষাৎকারে লেনন বলেন, ভক্তদের সামনে স্টেজে দাঁড়িয়ে নতুন গান গাইতে তিনি ইচ্ছুক। তবে সোলো আর্টিস্ট হিসেবে তিনি কখনও ঠিকমতো মিউজিক ট্যুর করতে পারেননি। তবে তিনি ট্যুরের আগে আরও কয়েকটি গান রেকর্ড করে নিতে চান, অন্তত আরেকটি অ্যালমানের কাজ করতে চান।

সাক্ষাৎকারে শেষে বিকাল ৫টার দিকে ডাকোটা ছেড়ে হিট ফ্যাক্টরির উদ্দেশে বের হন জন লেনন ও তার স্ত্রী। সেখানে ইয়োকো ‘ওয়াকিং অন থিন আইস’ শিরোনামের একটি আধুনিক ধারার গান রেকর্ড করেন।

ডাকোটা থেকে বের হয়ে স্টুডিওর পথে যাওয়ার সময় ভক্তরা ঘিরে ধরেছিলেন জন লেনন ও তার স্ত্রীকে। এক ভক্ত জন লেননের নতুন অ্যালবাম ‘ডাবল ফ্যান্টাসি’ এগিয়ে দেন অটোগ্রাফের জন্য। জন লেননও আন্তরিকতার সাথে স্বাক্ষর দেন। সেই ভক্তই ছিলেন ডেভিড চ্যাপম্যান, জন লেননের খুনি।

জন লেননের খুনী ডেভিড চ্যাপম্যান…

টেক্সাসে জন্ম হলেও ১৯৮০ সালে স্ত্রীকে নিয়ে হাওয়াই থাকতেন মার্ক ডেভিড চ্যাপম্যান। তার তখন ২৫ বছর বয়স। টিনএজ থেকেই বিটলসের ভক্ত ছিলেন। কিন্তু খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠা চ্যাপমানের জন লেননের একটি কথা পছন্দ হয়নি একদমই। ১৯৬৬ সালে জন লেলন বলেছিলেন, ‘যীশুর চেয়েও বেশি জনপ্রিয় ব্যান্ড’।

১৯৮০ সালে জন লেননের প্রত্যাবর্তন এবং মিডিয়ায় ঘন ঘন উপস্থিতি চ্যাপম্যানের ক্রোধ বাড়িয়ে দিয়েছিল। জন লেননকে হত্যার জন্য হাওয়াই থেকে নিউ ইয়র্ক শহরে থাকা শুরু করেন চ্যাপম্যান। সাথে রাখা শুরু করেন একটি রিভলভার।

৮ ডিসেম্বর পরিকল্পনা মতো দিনের শুরুর দিকে লেননকে হত্যা করতে ব্যর্থ হন চ্যাপম্যান। এরপর জন লেননের ভক্তদের ভিড়ে ডাকোটা বিল্ডিং এর বাইরে দাঁড়িয়ে মার্ক চ্যাপম্যান অপেক্ষা করতে থাকেন। জন লেননকে দেখে নিজের উত্তেজনা সামলাতে না পেরে অটোগ্রাফ নিয়ে ভালো লাগায় ভরে যায় চ্যাপম্যানের মন। তবে রাত হতেই আবার বদলে যায় তার চিন্তা।

রাত ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে জন লেনন ও তার স্ত্রী তাদের লিমুজিন গাড়িতে চড়ে ডাকোটায় ফেরেন। বিল্ডিং এর মূল ফটক পর্যন্ত কিছুটা পথ হেঁটে যান তারা। এই সময়েই মার্ক চ্যাপম্যান তার রিভলভার থেকে ৫টি ‘হলো পয়েন্ট’ গুলি ছুড়ে দেন জন লেলনের পিঠ বরাবর। ডাকোটার ফটকের সামনে ঢলে পড়ে যান লেনন।

দ্রুত এগিয়ে আসেন প্রহরী। নিউ ইয়র্কের পুলিশ অফিসাররাও ছুটে আসেন দ্রুত। অফিসার জেমস মোরান জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি জন লেনন?’ উত্তরে লেনন বলেন, ‘জী।’

গুলি করে পালিয়ে যাননি চ্যাপম্যান। কোট খুলে ল্যাম্পের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রহরী যখন তাকে খুঁজতে যান, তখন চ্যাপম্যান ‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’ বইটি পড়ছিলেন। প্রহরী তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি জানেন আপনি কী করে ফেলেছেন?’ ঠাণ্ডা মাথায় চ্যাপম্যান উত্তর দেন , ‘হুম, জন লেননকে গুলি করেছি’।

বইটির একটি পাতায় চ্যাপম্যান লিখে রেখেছিলেন- ‘এটাই আমার স্বীকারোক্তি’। আর এর নিচেই নিজের নামের বদলে তিনি স্বাক্ষর করেন বইটির নায়ক চরিত্র ‘হোল্ডেন কফিল্ড’ নামে।

রুজভেল্ট হাসপাতালে যখন জন লেননকে নিয়ে আসা হয়, তখন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল জন লেননের। ১০ মিনিট পরে পালসও চলে যায়। তবুও আরও ২০ মিনিট ধরে তাঁকে বাঁচানোর বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যান চিকিৎসকরা। ময়না তদন্তের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, জন লেননের ৮০ শতাংশ রক্ত বের হয়ে গিয়েছিল শরীর থেকে।

১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে মার্ক চ্যাপম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সাজা এড়াতে চ্যাপম্যানের পক্ষের আইনজীবীরা তাকে উন্মাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালান। ১৯৮১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত নিউ ইয়র্কের অ্যাটিকা কারাগার ও সংশোধনাগারে বন্দি ছিলেন চ্যাপম্যান। পরে তাকে ওয়েন্ডে সংশোধনাগারে স্থানান্তর করা হয়। লেননকে খুন করার দায়ে এখনো জেলে বন্দি আছেন ৬৫ বছরের ডেভিড চ্যাপম্যান। -রেডিওএক্স