চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কৃষি, গণমাধ্যম ও শাইখ সিরাজ

৭ সেপ্টেম্বর শাইখ সিরাজের জন্মদিন

কৃষি, গণমাধ্যম ও শাইখ সিরাজ- শব্দগুলো যেন একার্থ হয়ে গেছে। কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ এখন শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি নন, একটি প্রতিষ্ঠানের নাম। সম্প্রচার গণমাধ্যমের জন্য আপাত কৃষির মতো একটি নিরস বিষয়কে তিনি সরস করে তুলেছেন যা অতুলনীয়। এটি যত সহজে বলছি, বিষয়টি তত সহজ মোটেই ছিল না।

যোগাযোগের নগণ্য ছাত্র হিসেবে জানি, শাইখ সিরাজ তার কৃষি অনুষ্ঠানে যোগাযোগের এমন কিছু কৌশল কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছেন, যা শুধু তার অনুষ্ঠান না, তাকেও জনপ্রিয়তার শিখরে নিয়ে গেছে। শুধু অনুষ্ঠান না, উন্নয়ন সংবাদকেও তিনি নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়। গণমাধ্যমের প্রয়োজনে এসব বিষয় অবশ্যই গবেষণার দাবি রাখে।

বিজ্ঞাপন

পেছনের দিকে তাকালে আমরা দেখি, কৃষি সাংবাদিকতার শুরুটা একেবারে নতুন না। ইউরোপীয় প্রযুক্তি বিকাশের ধারায় আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে আমাদের প্রাচ্য অঞ্চলে সাংবাদিকতার একটি ধারা প্রচলিত ছিল। ইংরেজ আমলে ১৮৮৭ সালে প্রচণ্ড খরায় ভারতীয় উপমহাদেশে ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে যায়। কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন তার মার্কিন ধনকুবের শ্বশুরের বন্ধু আরেক ধনকুবের হেনরি ফিপসের দেওয়া ২০ হাজার পাউন্ড দিয়ে বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলায় গড়ে তোলেন ইম্পেরিয়াল এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট। সেখান থেকে ১৯০৬ সালে প্রকাশিত হয়, দ্যা এগ্রিকালচারাল জার্নাল অব ইন্ডিয়া। প্রসার ঘটে কৃষি যোগাযোগের।

তার আগে ১৮৬৩-৮৫ সময়কালে কুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক গ্রামবার্তা। ইতিহাস বলে গ্রামবার্তার পাতায় পাতায় অন্যান্য অনেক খবরের সঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল অনেক কৃষিসংবাদ। তাই বলা যায়, আমাদের কৃষি সাংবাদিকতার ইতিহাস অনেক পুরনো। কৃষির সংবাদ, কৃষকের সংবাদ বরাবরই প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে। কালের পরিক্রমায় বদলেছে তার রূপ, প্রকাশভঙ্গী, উপস্থাপনা আর ব্যাপ্তি। তবে মূলধারার সাংবাদিকতায় কৃষির গুরুত্ব, উপজীব্যতা এখনও কতটা স্থান করে নিতে পেরেছে সেটিই দেখার বিষয়।

এখানেই আসে শাইখ সিরাজের প্রসঙ্গ। জমকালো অনুষ্ঠানের বিপরীতে কৃষির মতো একটি অবহেলিত বিষয়ে অনুষ্ঠান করে জনপ্রিয়তা অর্জন করা কঠিন বৈ সহজ নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শত প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে যে অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ টেলিভিশনে অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল সেটি নিশ্চয় আপনারা বুঝতে পেরেছেন, যদি আপনি আশির দশকের দর্শক হয়ে থাকেন। কৃষি বিষয়ক সেই অনুষ্ঠানের নাম মাটি ও মানুষ। তখন একমাত্র ইলেকট্রনিক মিডিয়া ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)।

১৯৯৬ সালে শাইখ সিরাজ যুক্ত হন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রতিষ্ঠার সঙ্গে। চ্যানেল আই-এ তিনি শুরু করেন কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠান হৃদয়ে মাটি ও মানুষ, হৃদয়ে মাটি ও মানুষের ডাক। বিটিভির কৃষি দিবানিশি অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনাকারী ও উপস্থাপকও তিনি। এসব অনুষ্ঠানেও তিনি সমানভাবে সফল।

আশির দশকে শাইখ সিরাজ যখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে কৃষি অনুষ্ঠান শুরু করেন, তখন তার বন্ধুরা তাকে নিয়ে অনেক ঠাট্টা-তামাসা করেছেন।এসবে কান দিলে আমরা আজকের শাইখ সিরাজকে হয়তো পেতাম না। তিনি হয়তো তখন মনে মনে ভিন্ন কিছু ভাবতেন। সময়ের পরিক্রমায় আমরা দেখি তিনি এসব তামাশার জবাব তার কাজের মধ্য দিয়ে মোক্ষমভাবেই দিয়েছেন। যদিও শুরুটা মোটেই মসৃণ ছিল না। একটি শুটিং এর ক্যামেরার জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দিনের পর দিন। হাল ছাড়েননি তিনি, তরুণ প্রজন্মের জন্য যা শিক্ষণীয়।

বাংলাদেশের কৃষি ও গণমাধ্যমের প্রসঙ্গটি যখন আলোচিত হয়, তখন অনিবার্যভাবে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানটির কথা চলে আসে। ১৯৮০ সালে ‘আমার দেশ’ নামে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূলধারার অনুষ্ঠান। এর দর্শকপ্রিয়তা যে কোনো অনুষ্ঠানকে ছাপিয়ে যায়। বাংলাদেশ টেলিভিশনের এই অনুষ্ঠানটি দেশের সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নে প্রকৃত অর্থেই একটি অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। অনুষ্ঠানটি যখন যাত্রা শুরু করে তখন টেলিভিশনের চরিত্র ছিল অনেক বেশি বিনোদন কেন্দ্রিক; জনপ্রিয় ও মহনীয় অনুষ্ঠানের সুস্পষ্ট প্রাধান্য ছিল সেখানে। মূলত নাগরিক দর্শকদের কথা মাথায় রেখে অনুষ্ঠান বানানো হতো। কারণ তখনও গ্রামীণ এলাকায় টিভি দর্শক শ্রেণী তৈরি হয়নি। তাই কৃষির মতো অতি দরকারি বিষয় ক্রমবিকাশমান টেলিভিশনে ছিল আপাত অপ্রয়োজনীয় এবং নন-গ্ল্যামারাস। টিভি নাটকের স্বর্ণযুগেও অনুষ্ঠানটির আবেদন হয়ে ওঠে সর্বজনীন। সেই শুরু অর্থাৎ ১৯৮২ থেকে ১৯৯৬ সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে আমার দেশ ও মাটি ও মানুষ-এর ৫৮৮টি পর্ব নির্মাণের সাথে যুক্ত ছিলেন শাইখ সিরাজ। এক কথায় তার হাতেই মূলত এসব পর্ব নির্মিত হয়। উল্লেখ্য, শাইখ সিরাজ ছাড়া সে সময় আরও অনেকে মাটি ও মানুষ নির্মাণ করেছেন। অনুষ্ঠানটি এখনও বিটিভিতে চালু রয়েছে।

শাইখ সিরাজ কৃষি তথ্য ব্যবস্থায় একটি বিশেষ মডেল তৈরি করেন। তিনি এই মডেলে সফলভাবে গণযোগাযোগ অর্থাৎ টেলিভিশন, সংবাদপত্র এবং আন্ত:ব্যক্তিক যোগাযোগের কৌশল ব্যবহার করেন। শুরুর দিকে তার অনুষ্ঠান মূলত উদ্বুদ্ধকরণের কাজ করে। মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠান মূলত কৃষির বিশেষ সফল প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য জ্ঞাপন করত। পরে কলাকৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত লিখতেন দৈনিক জনকণ্ঠের চাষবাস পাতায়। সেই সঙ্গে দেখাতেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে। আগ্রহী কৃষক বা অন্যরা আরও তথ্য জানতে চাইলে তার সঙ্গে সরাসরি বা চিঠিপত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন। গণমাধ্যম ব্যবহার করে কৃষি সম্প্রসারণের এই বিশেষ মডেলটি সনাতন সম্প্রসারণ কৌশলের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল।সফল যোগাযোগের আরও কিছু কৌশল আমরা ব্যবহার করতে দেখি শাইখ সিরাজের অনুষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে। বার্তা প্রেরক ও গ্রহীতার মধ্যে দূরত্ব ঘোচাতে না পারলে যোগাযোগ কখনও সফল হয় না। ভাষা, পোশাক, উপস্থাপনা সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এনে কৃষকের সাথে সফল যোগাযোগের দূরদর্শী প্রচেষ্টা আমরা দেখি অনুষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সেই সময়ে বিটিভির অনুষ্ঠানে প্রমিত বাংলা ভাষার বাইরে গিয়ে মানুষের কথ্য ভাষা বা আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার করতে হলে কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমোদন লাগত। অথচ কৃষকের সঙ্গে কথোপকথনে এরকম প্রমিত ভাষার ব্যবহার কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করত। আবার উপস্থাপকের খুব কেতাদুরস্ত পোশাক-আশাকও কৃষকদের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের ক্ষেত্রে দূরত্ব তৈরি করত। এরকম সমস্যাগুলো সৃজনশীলতা, অভিজ্ঞতা ও দরদ দিয়ে সমাধান করেছেন শাইখ সিরাজ।

তিনি স্টুডিও বা কোনো আবদ্ধ ঘরে নয়, কৃষকদের কর্মক্ষেত্রে গিয়ে বিভিন্ন পর্ব ধারণ করা শুরু করেন। প্রথম দিকে দেখা যেত যে কৃষক মাঠে কাজ করছেন, কিন্তু যখন কৃষকের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে তখন তাকে ভিন্ন একটি জায়গায় এনে কথা বলা হতো বা সাক্ষাৎকার নেওয়া হতো। এ অবস্থায় কৃষক আড়ষ্ট বোধ করতেন। দেখা যেত কৃষকের চেয়ে উপস্থাপকই বেশি কথা বলছেন। এর পরিবর্তন ঘটানো হয় কৃষকদের নিজেদের জায়গায় অর্থাৎ ফসলের মাঠে বা গোয়ালঘরে গিয়ে কথা বলার মাধ্যমে।

আবার ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা দেখি কৃষকদের সঙ্গে কথোপকথনের বিশেষ আঙ্গিক নির্মাণ করেছেন। তাদের মতো করে সাধারণ বাংলায় কথা বলতে শুরু করায় কৃষকরাও খুব সাবলীল ও নির্ভয়ে কথা বলা শুরু করেন ক্যামেরার সামনে। কথা বলার অনানুষ্ঠানিক ধরনটি তাদের সহজ করে দেয়।

বিজ্ঞাপন

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পোশাকের ব্যবহার। কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটি সবসময় একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। এই বাধা অতিক্রম করতে অত্যন্ত সচেতনভাবে মাঠঘাটের পরিবেশ উপযোগী কৃষকের পছন্দের সবুজ রঙের পোশাক বেছে নেন শাইখ সিরাজ। একই রঙের পোশাকে প্রতিটি পর্বে কৃষকসহ দর্শকের মুখোমুখি হন নির্মাতা ও উপস্থাপক।

সফল যোগাযোগের পূর্বশর্ত এই কৌশলগুলোর মধ্য দিয়ে কৃষকের সঙ্গে দূরত্ব কমে আসে; অনুষ্ঠানগুলোতে কৃষক অনেক বেশি সরব ও সক্রিয় হন; সমস্যা, সম্ভাবনা, নতুন ধারণা ও কৃষি প্রযুক্তিসহ অনুষ্ঠানগুলোর বক্তব্য কৃষকসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য, আকর্ষণীয়, মাটি ও মানুষ (বিটিভি) চাষবাস (জনকণ্ঠ) কৃষি কৌশল (উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়) বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর হয়ে ওঠে। এখানেই অন্যদের সাথে শাইখ সিরাজের পার্থক্য গড়ে দেয়। অনেকেই কৃষি অনুষ্ঠান করেন। কিন্তু আমরা দেখেছি মাঠেঘাটে সাধারণ কৃষকদের টেলিভিশনের কৃষি অনুষ্ঠানের নাম বলতে বললে তারা অনুষ্ঠানের নাম বলতে না পারলেও শাইখ সিরাজের নাম বলেন। এই যে সাধারণ মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়া, তাও আবার কৃষির মতো একটা নন-গ্লামারাস অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, এটি ব্যতিক্রম। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদকসহ অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন, ভবিষ্যতে হয়তো আরো পাবেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেওয়া তার জন্য সবচেয়ে বড় পাওয়া বলে আমি মনে করি।

শাইখ সিরাজের কৃষি অনুষ্ঠানের বিষয় নির্বাচন যেমন বৈচিত্র্যপূর্ণ তেমনি, সময়োপযোগী ও চাহিদা নির্ভর। তার সাফল্যের পেছনে এটিও একটি বড় কারণ বলে মনে হয়। সাধারণ কৃষকসহ কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অবদান, অনিয়ম, সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাবনার কথা তিনি তুলে ধরেন দৃষ্টান্তসহ। সেখানে প্রয়োজনীয় পরামর্শও থাকে। তার অনুষ্ঠান দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক শিক্ষিত বেকার যুবক নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত অনেক। ছাদে, টবে সবজি চাষের মতো ছোটখাটো বিষয় থেকে বাণিজ্যিক কৃষি, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিপণন, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, নীতি বিতর্ক প্রভৃতি বিষয় উঠে এসেছে তাঁর অনুষ্ঠানে। ধান ও পাট অধ্যুষিত বাংলাদেশের কৃষি যেমন অন্যান্য ফসল বা শস্যের আগমনে বহুমুখী হয়েছে, তেমনি তাঁর অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু এগিয়েছে ফসল বৈচিত্র্যের মতো। কৃষি বিষয়ক দরকারি সব তথ্য ও জ্ঞান কৃষকরা জানতে পারেন তাঁর কৃষি অনুষ্ঠান থেকে, কারণ কৃষকদের তথ্য জানানোর বা কারিগরি সহায়তার জন্য সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাওয়া বিপুল সংখ্যক কৃষক এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দরকারি তথ্য পেয়ে থাকেন।

গণমাধ্যমে কৃষির সকল খাত যেমন: ফসল ও শস্য, মাছ, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ইত্যাদির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কারিগরি ও অন্যান্য তথ্য উঠে আসে তার অনুষ্ঠানে। টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখে উৎসাহিত হয়ে শিক্ষিত তরুণরাও কৃষির দিকে ঝুঁকেছেন। শহরে চাকরির সন্ধানে থাকা বেকার যুবক গ্রামে ফিরে গেছেন পুকুরে মাছ চাষ করতে, উদ্যোগ নিয়েছেন গরু মোটাতাজাকরণ, ফুলচাষ, সবজিচাষ, হাঁসমুরগির খামার এবং সমন্বিত খামারসহ বৈচিত্র্যময় কৃষি কর্মকাণ্ডের। যে উদ্যোগগুলোর ধারণা ও কৌশল দৃষ্টান্তসহ একের পর এক তুলে ধরা হতে থাকে অনুষ্ঠানে। এর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগসহ অর্থনীতিতে এক ইতিবাচক সূচনার সৃষ্টি হয়। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ফসল চাষ, মৎস্য খামার ও পোল্ট্রি ফার্মের ব্যাপক বিকাশের ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানটির অবদান সব সময় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। বহু সম্ভাবনাময় কৃষি-প্রযুক্তির প্রসারের মাধ্যমে, নতুন নতুন জাত ও প্রজাতির প্রসারের মাধ্যমে মাটি ও মানুষ (এবং পরবর্তীকালে চ্যানেল আই-এর হৃদয়ে মাটি ও মানুষ) কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষকদের পরীক্ষাগার এবং কৃষকদের মধ্যে যে একটা দূরত্ব সবসময় ছিল, তা কমিয়ে আনে।

শাইখ সিরাজ কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার বিভিন্ন দিক, উদ্ভাবন, বাজারব্যবস্থা, ভিনদেশী কৃষি, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতজনিত বিষয়াবলী তুলে আনেন টেলিভিশনের পর্দায়। কৃষকের প্রথাগত সংজ্ঞাটা ভেঙে দেন তিনি। একসময় কৃষক বলতে শুধু গ্রামের কৃষক সমাজকে বোঝানো হতো। এখন কৃষক বলতে, সেই কৃষকরা তো আছেনই, তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী, গৃহিণী ও শিক্ষিত যুবশ্রেণী।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে শাইখ সিরাজের যে উদ্যোগটি বিশেষভাবে নজর কাড়ে তা হলো টেলিভিশনের প্রধান বুলেটিনে আলাদা সংবাদ হিসেবে কৃষি সংবাদের অন্তর্ভুক্তি। ২০০৭ থেকে চ্যানেল আইয়ের প্রধান সংবাদে নিয়মিত কৃষি সংবাদ প্রচারিত হয়ে আসছে এবং ২০১০ সাল থেকে প্রতিদিন ১৫ মিনিটের একটি আলাদা কৃষি বুলেটিন প্রচার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় অন্য চ্যানেলগুলোও কৃষি সংবাদ প্রচারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃষি ও কৃষির বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা নীতি নির্ধারণী মহলে সরাসরি পৌঁছে দিতে তিনি ২০০৬ থেকে এখন পর্যন্ত ৬৪টি স্থানে কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট অনুষ্ঠান করেছেন। মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে তিনি সরাসরি কৃষকের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। এসব অনুষ্ঠানের সুপারিশমালা তিনি তুলে দিয়েছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে। এভাবেই তিনি কৃষিকে অর্থনীতির মূলকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন বারবার।

শাইখ সিরাজের কৃষি অনুষ্ঠান, কৃষি ভাবনা এসব বিষয় স্বল্প পরিসরে লিখে শেষ করা যাবে না। কৃষি অনুষ্ঠান ও কৃষি সাংবাদিকতা নিয়ে শাইখ সিরাজের একটা অভিমত তুলে ধরে এই লেখা শেষ করব। শাইখ সিরাজের মতে, আমাদের দেশে কৃষি সাংবাদিকতা এখনও একটি বিশাল সম্ভাবনাময় জায়গা। আর কৃষি সাংবাদিকতা করতে হলে একজন সাংবাদিককে কৃষির প্রতি পুরোমাত্রায় নিবেদিতপ্রাণ হতে হবে স্বাভাবিকের চেয়ে নিজেকে বেশি উজাড় করে দিতে হবে। তাঁদের মধ্যে দেশপ্রেমবোধ থাকতে হবে।

কৃষি বিষয়ক সংবাদে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয় বলে অনেকে এটা করতে আগ্রহী হয় না। নবীন যারা সাংবাদিকতায় আসছেন তাদের মধ্যে একটা প্রবণতা থাকে রাজনৈতিক বা অপরাধ বিষয়ক রিপোর্ট করার দিকে। তারা মনে করেন এতে সহজেই খ্যাতি পাওয়া যায়। প্রভাবশালীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় কিন্তু এতে মানুষের সঙ্গে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় না।

শাইখ সিরাজের মতো এরকম বিষয়ভাবনায় ও অনুষ্ঠান নির্মাণে- আমাদের চাই আরো দক্ষ ও কৃষির প্রতি সংবেদনশীল মানুষ। মূলত কৃষিনির্ভর এই দেশে কৃষিকে যথাযথভাবে এগিয়ে নিতে আমাদের চাই শাইখ সিরাজের মতো নিবেদিতপ্রাণ, কুশলী ও কৃষি সংবেদনশীল আরও শাইখ সিরাজ।

ছবি: তানভীর আশিক

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View