চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কৃষি উপকরণ সহায়তা: প্রস্তাব ও করণীয়

স্বাতন্ত্র ও স্বকীয়তা যে কোন জাতি বা রাষ্ট্রের তথা প্রত্যেক প্রাণীর জন্য অনস্বীকার্য এবং স্বজাত্যবোধ একজনকে অন্যজনের তুলনায় সহজেই আলাদা করে দেয়। কেননা স্বজাত্যবোধ স্বতন্ত্র ও অনন্য; কাজেই ব্যক্তি বা রাষ্ট্রকে তথা কোন প্রজাতিকে তাদের স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য ও চরিত্রায়নের উপর নির্ভর করতে হয়।

কোন জাতি যদি তাদের নিজস্বতাকে বিকিয়ে দিয়ে অন্য কিছুর উপর নির্ভর করে তাহলে সেই জাতির স্থায়িত্বতা ধীরে ধীরে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আর পরনির্ভরশীলতা যে কোন জাতিকে স্থায়িত্বশীলতা দিতে ব্যর্থ হয়। পূর্বোক্ত আলোচনাটুকু বর্তমানের প্রেক্ষিতে আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়েছে কারণ সঙ্কট কিংবা যে কোন দুর্যোগে নিজস্ব সম্পদের উপর মানুষের নির্ভর করতে হয় হোক সেটি ব্যক্তিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের। কেননা বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ পর্যন্ত করোনার ভয়াবহতায় রাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি তথা দীর্ঘমেয়াদী অভাব ও ব্যাপক জানমালের ক্ষতিসাধনের আশঙ্কা করছে।

বিজ্ঞাপন

প্রাইমারীর বই পুস্তকে মাছে ভাতে বাঙালির কথা বলা হয়েছে, সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশে কৃষি নির্ভর প্রকৃতির বিশেষত্বকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মননে বিকশিত করার চেষ্টা হয়েছে। ভূ-প্রাকৃতিক নিসর্গের বৈচিত্র্যে অনন্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশই মাটির গুণাগুণের উপর নির্ভর করে কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় নিজেদের চাহিদাকে মিটিয়ে নানা ধরনের পণ্যসামগ্রী বিদেশে রপ্তানী করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। কিন্তু কালের বিবর্তনে যেখানে আমাদের নিজস্বতা দিনে দিনে মজবুত ও শক্তিশালী হওয়ার কথা ছিল সেখানে প্রতিনিয়ত নিজস্বতাকে বিকিয়ে দিয়ে পরনির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতি তথা রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

ফাইল ছবি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী আহবান জানিয়েছেন করোনা পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করার জন্য দেশের এক টুকরো জায়গায়ও যেন খালি না থাকে। অর্থাৎ দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রকারান্তরে দেশের মাটিকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানোর তাগিদ দিয়েছেন যার প্রেক্ষিতে দেশজ উৎপাদন পূর্বের ন্যায় বৃদ্ধি পায়। করোনার বৈশ্বিক সমস্যায় বাংলাদেশও নানাভাবে ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে নিপতিত হয়েছে এবং এর প্রভাব দীর্ঘদিন বাংলাদেশকে পোহাতে হবে যদি না কৃষিভিত্তিক সমাজের গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যবস্থা গ্রহণে ব্রতী না হয় রাষ্ট্র।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান খাত হচ্ছে পোশাক শিল্প। পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান অনুসঙ্গ হচ্ছে শ্রমিক, পাশাপাশি পণ্য উৎপাদনের জন্য নানা ধরনের উপকরণ সামগ্রী প্রয়োজন রয়েছে। শ্রমিক শুধু আমাদের, কিন্তু পোশাক খাত পরিচালনার জন্য যে সকল উপকরণ সামগ্রীর প্রয়োজন রয়েছে তার অধিকাংশই আসে দেশের বাইরে থেকে। শ্রমের মজুরী কম থাকায় বাংলাদেশে পোশাক খাত ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু আমাদেরকে এ বিষয়টিও মনে রাখা প্রয়োজন, গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের করায়ত্বে আনার জন্য গার্মেন্টসে খাতে ব্যবহৃত উপকরণ সামগ্রীও নিজেদের দেশে তৈরি করা সম্ভব হলে দেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ লাভ করতো। একটিবারের জন্য হলেও আমাদের চিন্তা করার প্রয়োজন রয়েছে, যে বৈদেশিক মুদ্রা পোশাক শিল্প হতে অর্জিত হচ্ছে তার সিংহভাগ কাঁচামাল যোগানের জন্য ব্যয় করতে হয় বিদেশে। কাজেই বলা যায়, কতই না ভাল হত যদি কাঁচামালও বাংলাদেশেই উৎপন্ন করা সম্ভব হতো এবং তার স্বরূপ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে যুগোপযোগী ভূমিকা পালন করা জরুরী হয়ে পড়েছে।

বিষয়টিকে কিন্তু গুরুত্ব সহ বিবেচনায় নিয়ে বিশদভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। কারণ প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের প্রয়োজন দিনে দিনে কমে আসছে। সম্প্রতি ধান মাড়াইয়ের মেশিনের সাহায্যে দৈনিক যে পরিমাণ জমির ধান কাটা যাচ্ছে সেখানে কমপক্ষে ১০০-১৫০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন রয়েছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে ১৫০-২০০ জন শ্রমিক ৬ ঘন্টা পরিশ্রম করে যে পরিমাণ ধান কাটতে সক্ষম হচ্ছে মেশিনের উৎকর্ষতায় ১ ঘন্টায় উক্ত পরিমাণ কাজ শেষ হচ্ছে অর্থাৎ সেখানে শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। কাজেই কৃষিক্ষেত্রে যে রকমভাবে শ্রমিকের প্রয়োজন কমে যাচ্ছে অন্যান্য খাতেও কিন্তু শ্রমিকের শ্রমের প্রয়োজনীয়তা প্রযুক্তির উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। সে ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় ইস্যুভিত্তিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য কাজ করা যেতে পারে।
সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে এখন আর আগের ন্যায় শ্রমিকদের কাজের সুযোগ নেই বললেই চলে। কারণ, একজন শ্রমিক একাই ২-৩টা মেশিন পরিচালনা করতে পারে এবং উক্ত মেশিনগুলো সুনির্দিষ্ট সংখ্যক শ্রমিকের কাজ সম্পন্ন করে দিতে পারে যার ধরুণ সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে পূর্বের ন্যায় শ্রমিকের ভিড় লক্ষ্য করা যায় না। ধারাবাহিকভাবে বলা যায়, অন্যান্য যে গার্মেন্টস শিল্প রয়েছে সেখানেও পর্যায়ক্রমে প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় শ্রমিকের প্রয়োজন কমে যাবার সম্ভাবনায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সংখ্যা বেশি হবে সে কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় এবং সে সব বিষয় মাথায় নিয়ে স্বজাত্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের অর্থনীতির বিষয়টি মাথায় রেখে সুবিবেচনা প্রসূত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন গ্রহণ করা প্রয়োজন।
কাজের কথায় আসা যাক, সরকারের উচিত হবে বাংলাদেশের মাটি ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যতা বজায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেখানে আমাদের কৃষি, ফলজ ও বনজ উৎপাদন যথাযথভাবে সুসম্পন্ন করে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে দেশের বাইরে রপ্তানী করার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়। কৃষি ও কৃষকবিমুখ সমাজব্যবস্থাকে দূরীভূত করে কৃষকের মানসে সমাজকে বিনির্মাণ করা, জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে কৃষকদের চিহ্নিত করে মূল্যায়ন করা যেন দেশ মাতৃকার টানে সেবাধর্মী পেশা হিসেবে কৃষকদের ভাবনায় বিষয়টাকে প্রোথিত করা যায়। প্রায়শই দেখা যায়, পণ্যের উপযুক্ত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক কিংবা উৎপাদন ব্যয়ের সাথে অসামঞ্জস্যতা দেখা যায় যেখানে আর্থিক ক্ষতিতে পরতে হয় কৃষককে। কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণে এ বাধাগুলোকে অতিক্রম করতে হবে, অন্যথায় স্থায়িত্বশীলতায় ফিরে আসতে পারবে না স্বদেশ। পেশা হিসেবে কৃষিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে হবে। রাষ্ট্র কর্তৃক কৃষকদের জন্য অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রণোদনাসহ নানামাফিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকার কৃষকদের প্রণোদনার জন্য কৃষি সহায়তা কার্ড বিতরণ করে এবং উক্ত কার্ডের মাধ্যমে সরকারের নিকট থেকে কৃষকরা সরকার প্রদত্ত সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে। গ্রামাঞ্চলে এই কৃষি কার্ড বাছাইকরণ ও বিতরণের ক্ষেত্রে ত্রুটি বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়, ধরুণ যেদিন কার্ড করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তরা আসেন সেদিনের তথ্য অনেকের কাছে গোচরীভূত হয় না। আবার চেয়ারম্যান মেম্বাররা নিজেদের পছন্দসই মানুষদের কার্ড প্রদান করে থাকে, পছন্দসই বলতে যারা কার্ড পাবার উপযুক্ত নয় তাদেরকে কার্ড প্রদান করা হচ্ছে। আবার যার জমি বেশি তাকে কম জমির মালিক দেখিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কম সুবিধা পাবার বিষয়টি নিশ্চিত করে থাকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষরাই। এ সকল বিষয়ের সুরাহা করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

প্রকৃত কৃষকদের নিকট হতে সরকারের ধান ক্রয় নিশ্চিত করতে হবে যার প্রেক্ষিতে কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য পাবে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বাড়ি বাড়ি তালিকা যাচাইয়ের মাধ্যমে কৃষকের তালিকা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোন ধরনের গাফিলতি কিংবা স্বজনপ্রীতির নজির দেখা গেলে প্রকৃত কৃষক এবং কৃষি ভিত্তিক সমাজ বাধাগ্রস্থ হবে। গঠিত কমিটির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে এ কার্ডের মাধ্যমেই সরকারের কৃষি উপকরণ সহায়তা কৃষকদের নিকট সরবরাহ করতে পারলে প্রকৃত কৃষকরাই সুবিধাভোগী হবে। কৃষকদের সরকার বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করলে কৃষকরাও আরো উদ্যমী হয়ে কাজ করার মানসিকতা অর্জন করতে পারবে। কৃষকদের বিশেষ নাগরিক হিসেবে সরকারের স্বীকৃতি প্রদান করা জরুরী হয়ে পড়েছে, অন্যথায় কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণ অসম্ভব।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)