চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Cable

কৃষক, কৃষি ও কাজী নজরুল ইসলাম

Nagod
Bkash July

কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) জীবনবোধ ও রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে তাঁর কৃষক ও কৃষিভাবনা নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। প্রান্তিক পর্যায় থেকে উঠে আসবার কারণে শ্রমজীবী কৃষক-ধীবর-শ্রমিকের প্রতি তাঁর সহানুভূতি প্রগাঢ় ছিলো। আবার, আধুনিক কবি ও শিল্পী-সত্তার কারণেও মাটি, মানুষ ও মানবতার প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিলো অকৃত্রিম। ফলে, বাংলা সাহিত্যে উপেক্ষিত শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি কৃষক-ধীবর-শ্রমিককে তিনি শুধু তুলে আনলেন না, তাদেরকে করে তুললেন ঐক্যবদ্ধ শক্তি ও উৎপাদনের দ্যোতক। ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থা ও অর্থনীতি যেহেতু কৃষিনির্ভর, এখানকার ভূমি-প্রকৃতি যেহেতু কৃষিবান্ধব, এখানে কৃষাণরাই যেহেতু খেটে খাওয়া শ্রমিকশ্রেণির বড় অংশ, সেহেতু কৃষক ও কৃষিকে তিনি বিশেষভাবে নির্দেশ করেছেন।

কাজী নজরুল ইসলাম কর্তৃক পরিচালিত সাপ্তাহিক ‘লাঙল’ পত্রিকার কথা আমাদের অজানা নয়। ১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে আত্মপ্রকাশ করা পত্রিকাটি ঐতিহাসিকভাবেই বাংলা ভাষায় প্রথম শ্রেণিসচেতন পত্রিকা। যে পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় কৃষি উৎপাদন ও বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে লাঙল কাঁধে একজন কৃষকের একটি ছবি অঙ্কিত থাকতো। ‘লাঙল’-পর্বের একটি বিখ্যাত কবিতা হলো ‘কৃষাণের গান’। কবিতাটি ১৯২৬ সালে নজরুলের ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থে সংযুক্ত হয়েছে। নজরুলের চেতনায় ‘কৃষাণের গান’ কোনো ফসল তোলার সুখ-সংগীত নয়। উৎসবমুখর কৃষক-কৃষাণিদের হর্ষধ্বনিও নয়। এ গান সম্পূর্ণই শ্রেণিচৈতন্য ও শ্রেণিসংগ্রামের। এ গান উৎপাদনোত্তর উৎপাদিত শস্য ভোগের বিপরীতে হরণ হওয়ার প্রতিবাদী গান। অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে আত্মাহূতি দেয়ার অগ্নিমুখর গান।

‘কৃষাণের গান’ কবিতার প্রথম দুটি পঙক্তি হচ্ছে : ‘ওঠ রে চাষী জগদ্বাসী ধর কষে লাঙল।/ আমরা মরতে আছি—ভাল করেই মরব এবার চল।।’ এ কবিতায় কৃষকদের হালের ফলায় যে শস্য ওঠে বা ফলে, কবি তাকে রামায়ণের ‘সীতা’ কল্পনা করেছেন। আর, এই শস্য-ফসলরূপী সীতাকে প্রতিনিয়ত হরণ করছে দস্যুরূপী সামন্তপ্রভু রাবণ, বণিক রাবণ, ঔপনিবেশিক রাবণ, পুঁজিবাদী রাবণ।

রক্তচোষা ধনিক-বণিকদের শোষণপ্রক্রিয়ায় কৃষকদের লাঞ্ছনার বিষয়টি নজরুলের ‘নতুন চাঁদ’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘ওঠ রে চাষী’ ও ‘কৃষকের ঈদ’ কবিতায় ভিন্নভাবে ধরা পড়বে। কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ হয় ১৯৪৫ সালে। এর পূর্বে ১৯৪১ সালে সাপ্তাহিক ‘কৃষক’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘কৃষকের ঈদ’ কবিতায় ক্ষুধার্ত-বুভুক্ষু-মুমূর্ষু কংকালসার কৃষকদের দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে। কৃষককে কেন্দ্রে রেখে নজরুল মূলত শ্রমজীবী মানুষের যাপিত জীবনে ঈদের বৈরীরূপকে উপলব্ধিতে এনেছেন। কবির শানিত প্রশ্ন : ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ,/ মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?’ আবার, কবি যখন উচ্চারণ করেন, ‘জরির পোশাকে শরীর ঢাকিয়া ধনীরা এসেছে সেথা,/ এই ঈদগাহে তুমি কি ইমাম, তুমি কি এদেরই নেতা?’ তখন কবিতাটি সমাজ ও রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ আধ্যাত্মিক আর রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর মধ্যকার অসম অর্থনৈতিক ব্যবধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নজরুলের চেতনায় ‘ঈদ’ কিংবা ‘ঈদের চাঁদের হাসি’ সেদিনই আনন্দের হবে যেদিন ইমামরূপী নেতা ও মুসল্লিরূপী কর্মীর মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা পাবে। তাদের জীবন-যাপন ও আহার-বিহার হবে একসঙ্গে এবং একরূপ।

‘নতুন চাঁদ’ কাব্যগ্রন্থের আর একটি কবিতা হচ্ছে ‘ওঠ রে চাষী’। কোরাসধর্মী জাগরণীমূলক এ কবিতা বা গানে কৃষকের প্রতি কবির সহমর্মিতা বহুদিনের বিবিধ যৌক্তিক প্রশ্নবন্ধে শিল্পসম্মত হয়েছে : ‘চাষি রে! তোর মুখের হাসি কই?/ তোর গো-রাখা রাখালের হাতে বাঁশের বাঁশি কই?/ তোর খালের ঘাটে পাট পচে ভাই পাহাড়-প্রমাণ হয়ে,/ তোর মাঠের ধানে সোনা রঙের বান যেন যায় বয়ে,/ সে পাট ওঠে কোন্ লাটে?/ সে ধান ওঠে কোন্ হাটে?/… তোর গাইগুলোকে নিঙড়ে কারা দুধ খেয়েছে ভাই?/ তোর দুধের ভাঁড়ে ভাতের মাড়ের ফেন—হায়, তাও নাই!’ এই যখন ভূমিপুত্র কৃষক-চাষীদের জীবন, তখন সেই জীবনের তল খুঁজতে কবির আহ্বান : ‘তোর হাঁড়ির ভাতে দিনে রাতে যে দস্যু দেয় হাত,/ তোর রক্ত শুষে হলো বণিক, হলো ধনীর জাত—/ তাদের হাড়ে ঘুণ ধরাবে তোদেরই এই হাড়/ তোর পাঁজরার ঐ হাড় হবে ভাই যুদ্ধের তলোয়ার!’ এখানে কৃষক-চাষীদের অনুপ্রেরণা হয়েছে মহাভারতের দধীচি। যে দধীচি মুনির অস্থি দ্বারা নির্মিত বজ্র দিয়ে দেবতা ইন্দ্র হত্যা করেছিলো বৃত্রাসুরকে।

কৃষক ও কৃষি বিষয়ক কাজী নজরুল ইসলামের অনন্য সৃষ্টি ছোটগল্প ‘জিনের বাদশা’। যা ১৯৩১ সালে প্রকাশিত ‘শিউলিমালা’ গল্পগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। ফরিদপুর জেলার স্থানিক প্রেক্ষাপটে রচিত এ গল্পে কেন্দ্রীয় চরিত্র আল্লা-রাখা ওরফে কেশরঞ্জন বাবু তার প্রেয়সী চান ভানুকে পেতে নিজেকে জিনের বাদশা হিসেবে দাঁড় করায়। গল্পে আল্লা-রাখার প্রেম ও জিনের বাদশার কেরামতি রোমান্টিক আমেজ আর হাস্যরস সঞ্চার করে। যদিও পরিসমাপ্তিটা বিষাদের। অনেক চেষ্টা-অপচেষ্টা করেও প্রেয়সীকে আল্লা-রাখা ওরফে কেশরঞ্জন বাবু পায় না। চান ভানুর অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। গল্পের শেষে দেখা যায় যুবক আল্লা-রাখার ‘কৃষাণ-মূর্তি’।

গল্পের শেষটা এমন : ‘দূরে হিজল গাছের তলায় আরো দুটি চোখ আল্লা-রাখার কৃষাণ-মূর্তির দিকে তাকিয়ে সে-দিনকার প্রভাতের মেঘলা আকাশের মতোই বাষ্পকুল হয়ে উঠল—সে চোখ চান ভানুর। সে দৌড়ে গিয়ে আল্লা-রাখার পায়ের কাছে পড়ে কেঁদে উঠল, ‘কে তোমারে এমনডা করল?’ আল্লা-রাখা শান্ত হাসি হেসে বলে উঠল—‘জিনের বাদশা!’’

‘জিনের বাদশা’ অচরিতার্থ প্রেমের গল্প হলেও এখানে মৃত্তিকাসংলগ্ন মানুষের আত্মশক্তির উদ্বোধন প্রদর্শিত হয়েছে। এ গল্পে উপেক্ষিত ও অসম্পূর্ণ প্রেম রূপান্তরিত হয়েছে কর্মপ্রেরণায়। আর, এই কর্মপ্রেরণার সম্প্রসারণ ঘটেছে কৃষিনির্ভর উৎপাদশীলতায়। প্রেমে উপেক্ষিত বা পরাজিত হয়ে নষ্ট, উদাসীন ও সন্ন্যাস-জীবন গ্রহণ করার গল্প-কাহিনি বাংলা সাহিত্যে অনেক রয়েছে। কিন্তু ব্যর্থ প্রেমিক প্রেয়সীর বিয়ের পরদিনই বাবরি চুল ছেঁটে পরনে একটা গামছা বেঁধে হাতে পাঁচনি আর কাঁধে লাঙল নিয়ে উৎপাদনে সবল-সক্রিয় হওয়ার দৃশ্য অভূতপূর্ব এবং এখনও বিরল। প্রেমের ছোঁয়ার জীবনের যে আমূল পরিবর্তন, তা এখানে মাটি ও মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

কৃষক ও শ্রমিকের প্রতি নজরুলের প্রাণের টান অনুভব করা যাবে তাঁর একটি অভিভাষণে। ১৯২৬ সালে অনুষ্ঠিত ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনে নজরুলের একটি চিঠি অভিভাষণের মর্যাদা লাভ করে। ‘কৃষক-শ্রমিকের প্রতি সম্ভাষণ’ শীর্ষক ঐ অভিভাষণের একাংশে নজরুল কৃষকদের উদ্দেশ্যে উল্লেখ করেন :

‘আপনারাই দেশের প্রাণ, দেশের আশা, দেশের ভবিষ্যত। মাটির মায়ায় আপনাদের হৃদয় কানায় কানায় ভরপুর। মাটির খাঁটি ছেলে আপনারাই। রৌদ্রে পুড়িয়া বৃষ্টির জলে ভিজিয়া—দিন নাই রাত নাই—সৃষ্টির প্রথম দিন হইতে আপনারাই তো এই মাটির পৃথিবীকে প্রিয় সন্তানের মতো লালন পালন করিয়াছেন, করিতেছেন ও করিবেন। আপনাদের মাঠের এক কোদাল মাটি লইলে আপনারা আততায়ীর হয় শির নেন কিংবা তাকে শির দেন—এত ভালোবাসায় ভেজা যাদের মাটি, এত বুকের খুনে উর্বর যে শস্যশ্যামল মাঠ, —আপনারা আমার কৃষাণ ভাইরা ছাড়া অন্য অধিকারী কেহ নাই। আমার এই কৃষাণ ভাইদের ডাকে বর্ষায় আকাশ ভরিয়া বাদল নামে, তাদের বুকের স্নেহধারার মতোই মাঠ-ঘাট পানিতে বন্যায় সয়লাব হইয়া যায়, আমার এই কৃষাণ ভাইদের আদর সোহাগে মাঠ-ঘাট ফুলে-ফলে-ফসলে শ্যাম সবুজ হইয়া ওঠে—আমার কৃষাণ ভাইদের বধূদের প্রার্থনায় কাঁচা ধান সোনা রঙে রাঙিয়া উঠে, —এই মাঠকে জিজ্ঞাসা কর, মাঠে ইহার প্রতিধ্বনি শুনিতে পাইবে, এ মাঠ চাষার এ মাটি চাষার, এর ফুল-ফল কৃষক-বধূর।’

অর্থাৎ, কাজী নজরুল ইসলামের সত্তা ও চৈতন্যে কৃষক ও কৃষি খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। কৃষক ও কৃষিই যে দেশের প্রাণ ও ভবিষ্যৎ এবং কৃষক ও কৃষির উন্নয়নের মধ্য দিয়েই যে সমাজ ও রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি, মানবতার বিজয়, তা নজরুলসাহিত্যে স্পষ্ট। ধনিক ও বণিক নিয়ন্ত্রিত সমাজকাঠামো ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলে কৃষক ও কৃষি বিষয়ক নজরুলের এই চেতনা বাস্তবায়ন করা আজো সম্ভব হয় নি। যে চেতনা বাস্তবায়ন করা মানুষের জন্যই জরুরি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

BSH
Bellow Post-Green View
Bkash Cash Back