চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কিন্তু সিনেমা বানাতে তো পয়সা লাগে…

সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুদিনে শ্রদ্ধা

শুধু বাংলা ভাষাভাষি অঞ্চলের নয়, উপমহাদেশের এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সত্যজিৎ রায়। সাহিত্যিক, নির্মাতা, শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এরকম বহু পরিচয়ে তাকে ডাকা করা যায়। তবে নির্মাতা হিসেবেই তিনি বিশ্বে জনশ্রুত, জনপ্রিয়। তাই বলে তার সাহিত্যিক মানও তার সমকালীন সময়ের কোনো প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক থেকে কম ছিলো না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায় তার সমকালকেও ছাড়িয়ে গেছেন। [...]

শুধু বাংলা ভাষাভাষি অঞ্চলের নয়, উপমহাদেশের এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সত্যজিৎ রায়। সাহিত্যিক, নির্মাতা, শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এরকম বহু পরিচয়ে তাকে ডাকা করা যায়। তবে নির্মাতা হিসেবেই তিনি বিশ্বে জনশ্রুত, জনপ্রিয়। তাই বলে তার সাহিত্যিক মানও তার সমকালীন সময়ের কোনো প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক থেকে কম ছিলো না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায় তার সমকালকেও ছাড়িয়ে গেছেন। সত্যজিতের অমর সৃষ্টি ‘ফেলুদা’ তাঁর সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর বয়ে চলছে যুগ থেকে যুগান্তরে।

গত শতকের বিশ্ব সিনেমার নেতৃত্বশীলদের একজনও সত্যজিৎ রায়। সিনেমা যে একটি শক্তিশালী শিল্প মাধ্যম, তা এই উপমহাদেশে তার আগে আর কে বোঝাতে কিংবা বুঝতে পেরেছেন? ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করা বাংলা চলচ্চিত্রের এই স্বপ্নগ্রস্ত মানুষটির মৃত্যুদিনে তাকে শ্রদ্ধা….

বিজ্ঞাপন

যেভাবে সিনেমায় মগ্ন হলেন:
ইতালিয়ান পরিচালক ভিত্তোরি ডি সিকা’র বানানো ‘দ্য বাই সাইকেল থিফ’ ছবিটি দেখে সিনেমা বানানোর স্বপ্নে বিভোর হন এক তরুণ। নাম তার সত্যজিত রায়। সমস্ত আবেগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন সিনেমা বানাবেন বলে। অন্যদিকে মাথার ভেতর গেঁথে আছে সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসটি। পণ করলেন সিনেমা বানাবেন, এবং মাথার ভেতর গেঁথে থাকা ‘পথের পাঁচালী’ দিয়েই শুরু করবেন।

‘পথের পাঁচালী’র চিত্রনাট্য নিয়ে চললো দৌড় ঝাঁপ। স্ক্রিপ্ট নিতে মুখিয়ে ছিলেন আরো অনেকে। কিন্তু বিভূতির স্ত্রী সত্যজিৎকেই দিলেন পথের পাঁচালীর সত্ব। মুগ্ধ হয়ে সিনেমা বানাতে নেমে পড়লেন সত্যজিৎ।

কিন্তু সিনেমা বানাতে তো পয়সা লাগে…
সিনেমা বানাতে আবেগ আর আন্তরিকতার অভাব ছিলো না সত্যজিৎ রায়ের। তবে তাঁর অভাব ছিলো অর্থের। সিনেমা বানাতে যে পয়সা লাগে, তার খুব ভালো জানা ছিলো না। ফলে ‘পথের পাঁচালী’র শুটিং শুরু করেই বন্ধ হয়ে যায়। শুধু পয়সার অভাবে একাধিকবার সত্যজিৎকে বন্ধ করতে হয় ‘পথের পাঁচালী’র শুটিং।

ভারতের নামিদামি প্রযোজক, ব্যবসা, প্রতিষ্ঠান আর উচ্চবিত্তের ধারে ধারে ঘুরেছেন অর্থলগ্নির জন্য। কিন্তু এমন তরুণ একজন নির্মাতাকে অর্থ দিতে সাহস করে কেউ এগিয়ে আসেনি। নিজের জমানো টাকা, স্ত্রীর গয়না বিক্রি এবং সর্বশেষ পশ্চিম বঙ্গ সরকারের সামান্য আর্থিক ঋণের বিনিময়ে শেষ করেন ‘পথের পাঁচালী’ ছবিটি। সেই সাথে পূরণ হয় এক তরুণের স্বপ্ন!

অনন্ত পথের দিকে ছুটে চলা…
‘পথের পাঁচালী’ মুক্তির পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের। ছুটে চলেন। তবে ধীরে। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ দেশে-বিদেশে সিনেমাবোদ্ধাদের আলোড়িত করে। বহু নামিদামি পরিচালক এক নবীন সিনেমা মেকারের ছবি দেখে মুগ্ধতার কথা জানায়। অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে মনোনিত হয় তাঁর ‘পথের পাঁচালী’। ফলে ভারতীয়দের কান খাড়া হয়। পাত্তা না দেয়া এক সিনেমা পাগল তরুণের দিকে দৃষ্টি পড়ে তাদের।

যে তরুণ নির্মাতা একটি স্বপ্ন পূরণের জন্য বিত্তবানদের ধারে ধারে ঘুরেছিলেন, ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তির পর দেখা গেলো তার পিছনে ছুটছে ভারতের সবচেয়ে খানদানি প্রযোজক সংস্থাও। সিনেমা নির্মাণের জন্য পরবর্তীতে আর অর্থ কষ্টে পড়তে হয়নি এই মহান নির্মাতার।

তার হাত ধরে উপমহাদেশের সিনেমায় নতুন ভাষা… 
সিনেমা যে শিল্পের একটি শক্তিশালী মাধ্যম, এই কথা কখনো ভুলেননি নির্মাতা সত্যজিৎ। তাই বলে তিনি শুধু সিনেমার ভিতর দিয়ে প্রস্তর কঠিন শিল্প চর্চাই করেননি। প্রেম, বিরহ, যাতনা, সমকালীন রাজনীতি, সমাজের অবক্ষয়, অবদমন এই সবকিছুই তার চলচ্চিত্রে বিষয়বস্তু হয়েছে। তবে তা গতানুগতিক ধারাকে উপেক্ষা করে, পুরো সত্যজিৎ স্টাইলে।

সত্যিকারের বাংলা সিনেমার যাত্রা তাঁর হাত ধরেই এগিয়েছে। প্রাণহীন বাংলা সিনেমা শিল্পকে দূর আকাশ হতে ধরে এনে তার ভেতর জীবন দিয়েছেন তিনি। তার সিনেমায় প্রতিটি চরিত্র সত্যিকার জীবনের কথা বলে, জীবন্ত গল্প আর অপরূপ দৃশ্যের সমাহার বাংলা সিনেমায় শুধু নয়, বিশ্ব সিনেমায়ও বিরল!

যুগে যুগে মুগ্ধ করে চলা ছবিগুলো
‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণের পর সত্যজিৎ হাত দিলেন বিভূতিভূষণেরই ‘অপরাজিত’ নামের ছবিটিতে। পথের পাঁচালী’র সেই দুরন্ত ছোট্ট ‘অপু’কে মাথা থেকে ছেটে ফেলতে পারেননি তিনি। তাই দেখা যায় এটি নিয়ে তিনি নির্মাণ করেন ‘ট্রিলজি’। যা সত্যজিতের ট্রিলজি নামে এখন পরিচিত। সত্যজিতের ট্রিলজি মানে ‘পথের পাঁচালী’ ‘অপরাজিত’ এবং ‘অপুর সংসার’ এই তিনিটি সিনেমার অপূর্ব সমাহার।

সত্যজিতের বেশীর ভাগ ছবিই কোনো প্রখ্যাত সাহিত্যিক কিংবা লেখকের গল্প উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করা। সত্যজিৎ রায় বাংলার আরেক মহান সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দ্বারা প্রভাবিত থাকায় তাঁর লেখার চলচ্চিত্রায়ন করেন তিনি। যে ছবিগুলো আজ কালোত্তীর্ণ ছবির মর্যাদায় আসিন। যেমন চারুলতা, দেবী, তিন কন্যা এবং ঘরে বাইরে।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথের গল্প ছাড়াও তারাশঙ্কর, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প নিয়ে ছবি নির্মাণ করেছেন সত্যজিৎ রায়।

সত্যজিৎ যেমন ভিত্তোরি ডি সিকা, জ্যাঁ রেঁনোয়া, ফ্রাঁসোয়া ত্রুঁফোদের মতো মহান নির্মাতাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সিনেমা নির্মাণে আসেন; ঠিক এইভাবে তাঁর দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছেন দেশ-বিদেশের অগণিত নির্মাতা।যার মধ্যে আছেন প্রখ্যাত মার্কিন পরিচালক ও অভিনেতা মার্টিন স্করসেস, বিশ্ব জনপ্রিয় ইরানিয়ান পরিচালক আব্বাস কিয়ারোস্তামি, ঋতুপর্ণ ঘোষ ও গৌতম ঘোষ।এক নজরে সত্যজিৎ রায়
১৯২১ সালের ২মে কলকাতায় জন্মগ্রহন করেন সত্যজিৎ রায়। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে। চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, সাহিত্যিক, সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার হিসেবে তিনি পরিচিত।

‘পথের পাঁচালী’ সিনেমা নির্মানের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্র শিল্পে সত্যজিৎ রায়ের যাত্রা শুরু। এরপর একে একে নির্মাণ করেন, পরশ পাথর , জলসা ঘর, অপুর সংসার, অভিযান, মহানগর, কাপুরুষ ও মহাপুরুষ , নায়ক, গুপি গাইন বাঘা বাইন , অরণ্যের দিন রাত্রি, সীমাবদ্ধ, অশনি সংকেত সোনার কেল্লা জন অরণ্য, শতরঞ্জ কি খিলাড়ী জয় বাবা ফেলুনাথ হীরক রাজার দেশে, ঘরে বাইরে, গণ শত্রু, শাখা প্রশাখা এবং সর্বশেষ বানানো সত্যজিতের সিনেমার নাম আগুন্তুক।

অসাধারণ সব চলচ্চিত্র নির্মাণ যেমন করেছেন, তার জন্যে হয়েছেন পুরস্কৃতও। তাঁর পুরস্কারের ঝুলি দেখে মনে হবে যেনো জাতীয় পুরস্কারের চেয়ে তিনি আন্তর্জাতিকভাবেই বেশী স্বীকৃত! আজীবন সম্মানস্বরূপ একাডেমি পুরস্কার অর্জন ছাড়াও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছিলেন তিনি। যা তার আগে একমাত্র মহান নির্মাতা ও অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনই পেয়ে ছিলেন।

ফ্রান্সের সরকার ১৯৮৭ সালে তাঁকে সেদেশের বিশেষ সম্মনসূচক পুরস্কার ‘লেজিওঁ দনরে’ প্রদান করেন। ১৯৮৫ সালে অর্জন করেন ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বেই ভারত সরকার তাঁকে প্রদান করেন দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন। সেই বছরেই মৃত্যুর পরে তাঁকে মরণোত্তর আকিরা কুরোসাওয়া পুরস্কার প্রদান করা হয়।