চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কাশ্মীরে ইন্টারনেটসহ যোগাযোগ মাধ্যম চালুর আহ্বান আর্টিকেল নাইনটিনের

বিশেষ মর্যাদা সংক্রান্ত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের বছরপূর্তিতে ভারত শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে মোবাইল, ইন্টারনেটসহ সবধরনের যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল নাইনটিন।

একইসঙ্গে ওই অঞ্চলের সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য প্রণীত নিউ মিডিয়া পলিসি-২০২০ বাতিলের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিজ্ঞাপন

আর্টিকেল নাইনটিন বলছে, এই নীতিমালা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর) অনুমোদনের সময় ভারতের দেয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি মৌলিক মানবাধিকারের প্রত্যক্ষ লঙ্ঘন। ভারতের সরকারী কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, জম্মু ও কাশ্মীরে প্রবর্তিত যে কোনও পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডকে পুরোপুরি অনুসরণ করে গৃহীত হয়েছে।

বুধবার সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়া কার্যালয় থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংস্থার দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ফারুখ ফয়সল বলেন, ‘’জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আরোপিত যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমের ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞা, সাংবাদিকদের হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন এবং সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচনে গৃহীত পদক্ষেপ গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ সমস্ত পদক্ষেপ মত প্রকাশের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের স্পষ্ট লঙ্ঘন। আর্টিকেল নাইনটিন স্মরণ করিয়ে দিতে চায়, মানবাধিকার সংস্থাগুলি বারবার জোর দিয়ে বলে আসছে যে, যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে প্রবেশগম্যতার বিষয়টি মত প্রকাশের মতো মৌলিক অধিকারের সুরক্ষার অন্তর্গত।’’

বিজ্ঞাপন

বিবৃতিতে বলা হয়, ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫ (ক) অনুচ্ছেদ বাতিলের পর থেকে জম্মু ও কাশ্মীরের পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে অঞ্চল দুটিতে ব্যাপকভাবে সামরিকীকরণ করা হচ্ছে। ল্যান্ডলাইন, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন ব্যবহারে বিধিনিষেধ, সড়ক অবরোধ এবং পরিবহন সেবা স্থগিতের ফলে জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষ পুরো পৃথিবী থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই অঞ্চলে কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য গত একটি বছর ধরে অধিকারকর্মী, সাংবাদিক, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি ভারত সরকারকে উপুর্যপুরি অনুরোধ করে যাচ্ছে, কিন্তু পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ওই অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। শিক্ষা, ব্যবসা এবং বিভিন্ন সভা-সমাবেশের প্রয়োজনে গোটা পৃথিবী এখন অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করছে। অথচ যোগাযোগ ও ইন্টারনেট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার কারণে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চলটি অনেক আগে থেকেই শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যে প্রবেশগম্যতা ও মত প্রকাশের মতো মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হয়ে রয়েছে। ভারতের অন্যান্য অংশের মতো কাশ্মীরেও কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ দিন দিন বাড়ছে। ভারত সরকার এই অঞ্চলে আরও বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়ার জন্য এখন মহামারিকে ব্যবহার করছে। তবে এতে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলটিতে সহিংসতা থেমে নেই; বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাই সংকুচিত হচ্ছে। কাশ্মীর ইস্যুতে যে কোন ভিন্নমত দমনে সরকারী পদক্ষেপ আরও জোরদার করা হয়েছে এবং এবং কাশ্মীরি সাংবাদিকদের দমিয়ে রাখতে ভয় দেখানো ও হয়রানি করাকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত কোন বৈধ কারণ ছাড়াই জম্মু ও কাশ্মীরে অনেক সাংবাদিককে লকডাউনের সময়ে রিপোর্ট করার জন্য গ্রেপ্তার, আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

চলতি বছর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে দুই ধাপ অবনমন হয়ে ভারতের অবস্থান হয়েছে বিশ্বে ১৪২তম। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের মতে, যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘ব্ল্যাকআউটের’ মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করায় ভারতের স্কোর কমেছে এবং এটিকে তারা ‘একটি বিশাল উন্মুক্ত কারাগারের‘ সাথে তুলনা করেছেন যেখানে “সাংবাদিকদের পক্ষে কী ঘটেছিল তা পুরোপুরি জানা অসম্ভব।’’

বিবৃতিতে বলা হয়, সাংবাদিকদের দমন করতে অব্যাহত যোগাযোগ প্রতিবন্ধকতা, ভয় দেখানো ও হয়রানির পর ভারত সরকার এখন জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য একটি ‘নিউ মিডিয়া পলিসি ২০২০’ কার্যকর করেছে, যা এই অঞ্চলে সাংবাদিকদের ও সংবাদমাধ্যমের উপর ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মিডিয়া সংগঠনগুলো ছাড়াও স্থানীয় রাজনীতিকরা এই পলিসির সমালোচনা করেছেন এবং সরকারকে এটি প্রত্যাহার করে নিতে বলছেন। ৫০ পৃষ্ঠার নীতিমালায় এটি প্রণয়নের অন্যতম উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, “ভুল তথ্য ও ভুয়া সংবাদ প্রতিরোধ করা এবং গণমাধ্যম ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক ভাবাবেগ উস্কে দেওয়া, হিংসা প্রচার করা বা ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি আঘাত হানতে পারে এমন যে কোন প্রচেষ্টার বিষয়ে সতর্ক হওয়া।’’

এই নীতিটি জম্মু ও কাশ্মীরের তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগকে (ডিআইপিআর) আগামি পাঁচ বছরের জন্য ওই অঞ্চলের সাংবাদিকতা বিষয়ক সকল প্রকাশনার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী নিয়ন্ত্রণের অনুশীলন করার অধিকার দেয়। এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, জম্মু ও কাশ্মীরের উপর গত এক বছরে চাপানো নিষেধাজ্ঞাগুলি এখনো বলবৎ আছে এবং নতুন এই নীতিটি রাষ্ট্রের সমালালোচনা করার জন্য যে কোনও সাংবাদিকের বিচার এবং হয়রানি করার জন্য সরকারকে মূলত আরও একটি সুযোগ করে দিয়েছে।