চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কামলাতন্ত্রের গামলায় বন্দি বাংলাদেশ

‘সরকারি কর্মচারীদের বলি, মনে রেখো,এটা স্বাধীন দেশ। এটা ব্রিটিশের কলোনী নয়। পাকিস্তানের কলোনি নয়। যে লোককে দেখবে, তার চেহারাটা তোমার বাবার মত, তোমার ভাইয়ের মতো। ওরই পরিশ্রমের পয়সায় তুমি মাইনে পাও। ওরাই সম্মান বেশি পাবে। কারণ ওরা নিজেরা কামাই করে খায়।’বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান(১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে ভাষণ)

আশির দশকে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থেচার। ক্ষমতাসীন হয়ে তিনি দেখেন, তার চোখ কান নাক মুখ হয়ে শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের বেড়াজাল হয়ে আছে এক অদ্ভুত ব্যবস্থা। যার নাম আমলাতন্ত্র। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতসীন হওয়ার পূর্ব থেকেই তিনি লক্ষ্য করেন এসব আমলারা অনির্বাচিত, জগণের করের টাকায় তাদের রুটি রুজি অথচ তারাই দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে বসে থাকে। শুধু কি তাই এসব আমলারা কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নয় কিন্তু সব বিষয়ের কাজি সেজে থাকে।

বিজ্ঞাপন

রাজহাঁস নামে একটা প্রাণী আছে। দেখতে বেশ নাদুস নুদুস। ইংল্যান্ডে প্রতিটি শহরে পার্কে হৃদ আছে। সেখানে এই রাজহাস চড়ে বেড়ায়। এসব হাঁসের মালিক ইংল্যান্ডের রানী। কুইনস ডাক নামে আদর করে তাদের বলা হয়। মানুষের দেয়া খাবার দাবার খেয়ে এরা বেশ ভালো মাংসল হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
আমলাদেরকে থেচার ডাক বা হাস বলে ডাকতেন। মার্গারেট থেচার বলতেন,
‘ডাক কেন সুইম বাট কান্ট সুইম ওয়েল
ডাক কেন ফ্লাই বাট ক্যান্ট ফ্লাই ওয়েল
ডাক ক্যান ওয়াক বাট ক্যান্ট ওয়াক ওয়েল। ’

যারা কোন কাজই ভালো ভাবে পারে না তাদের প্রভাব কমাতে হবে। রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন থেচার। তার আমলেই আমলাদের প্রভাব একেবারে কমিয়ে আনা হয়। প্রশাসনিক ও জনসেবার সকল কাজের কেন্দ্র হয় নির্বাচিত কাউন্সিলর ও মেয়র অফিস। শুধু নীতি প্রণয়নের করনীক কাজ করেন সরকারি কর্মচারীরা।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা অর্জনের কিছুদিনের মধ্যেই তিনি লক্ষ্য করেন, তথাকথিত দুর্নীতিবাজ আমলা শ্রেণি অসাধু রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের যোগসাজসে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন ভুলুন্ঠিত করে দিচ্ছে। তিনি এক ভাষণে বলেছিলেন,

‘আমি বিদেশ থেকে ভিক্ষে করে টাকা আনি। চাটার দল সব খেয়ে ফেলে। আমার কৃষক আমার শ্রমিক, আমার দিন মজুর ভিক্ষা করে না।’

ইতিহাসের কি নির্মম পরিহাস, নিজের জন্মশত বার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধু সেই আমলাদের হাতেই নব রূপ পাওয়ার পরিকল্পনার শিকার হতে যাচ্ছিলেন।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও তার প্রায়োগিকতা নিয়ে গবেষণা করছেন অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত। তিনি দু:খ করে বলেন, জন্ম শতবার্ষিকীর নামে যে বঙ্গবন্ধু নির্মানের পরিকল্পনা দেখতে পাচ্ছি তাতে ভয় হয় আমলাতন্ত্রের তৈরী করা এই বঙ্গবন্ধু থেকে প্রকৃত বঙ্গবন্ধু উদ্ধার করতে আবার কত বছর ধরে গবেষণা করতে হয়।’

বাংলাদেশের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের শিরোনাম: নাগরিক ও সরকারি কর্মচারীদের কর্তব্য (২) দফায় বলা হয়েছে:

‘ সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’
এখানে সরকারি কর্মচারীর ইংরেজি করা হয়েছে: Servant of the government.

সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ-অনুসারে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে বেতনাদিযুক্ত পদে অধিষ্ঠিত বা কর্মরত কোনো ব্যক্তি হলো সরকারি কর্মচারী। দন্ডবিধির ১৪ ধারার সংজ্ঞানুসারে কর্মচারী বলতে সরকারের কর্তৃত্ববলে বা অধীনে বাংলাদেশে বহাল নিযুক্ত বা নিয়োজিত সমুদয় কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে বোঝায়।

আমাদের সংবিধান যারা তৈরী করেছিলেন তারা খুব ভালো ভাবেই জানতেন, এভাবে না সংবিধানে লিখিত না থাকলে জনগণের ইচ্ছার অধীন হবে না রাষ্ট্র।

সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে জনগণের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব স্থাপন করা হয়েছে।হাসের পাখা ঝাপটায় অসহায় জনগণ করোনা প্রাদুর্ভাব রোধে দেশের নীতি পরিকল্পনা নিয়ে বেশ সমালোচনা হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, বিশ্বজুড়ে যখন করোনা ছড়াচ্ছে তখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় করোনাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

তখন কামলাতন্ত্রের কুশিলবরা করোনা নিয়ে প্রকৃত অবস্থার চেয়ে অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। গত দু’মাসে দেশে সাধারণ জনগণের উপর কামলাতন্ত্রের বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীরা নিজেদের ক্ষমতার নগ্ন প্রকাশ ঘটিয়েছে। সেটি কখনো ডাক্তারদেরকে ভয় দেখিয়ে নোটিশ দেয়া, কখনো গুজব প্রতিরোধে টেলিভিশন মনিটরিংয়ের নামে, কখনো বয়স্ক নাগরিকদের কান ধরে উঠবস করিয়ে।

যেখানে ডাক্তাররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন সেখানে তাদেরকে উল্টো হুমকি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। যেখানে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরার জন্য সাংবাদিকরা মাঠে ঘাঠে প্রকৃত তথ্য জানাতে ছুটে যাচ্ছেন সেখানে কিভাবে একটি প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হয় সেটি সম্পর্কে নুন্যতম জ্ঞান না রেখে নজরদারির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকের কেনো প্রয়োজন। ব্যক্তি মানুষের ক্ষমতা সীমিত বলে ব্যক্তি মানুষেরা সবাই মিলে একটি পেশাকে দায়িত্ব দিয়েছে দেখো, তোমরা আমাদের পক্ষে সব ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করবে।

পেশাগতভাবে এই দায়িত্ব পালনের অধিকার তাকে বাংলাদেশের সংবিধান দিয়েছে। পেশাগত ভাবে এমন দায়িত্ব বিচারক ছাড়া আর কাউকে দেয়া হয় নাই। মূলত সাংবাদিকরা জনগণের পক্ষে এই ক্ষমতার চর্চা করেন। কিন্তু কি অদ্ভুত কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক? জনগণের টাকা দিয়ে দারুণ পুকুর করে সেই পুকুর নিজের নামে করেন। আবার এই বিষয়ে প্রশ্ন করার দায়ে সাংবাদিককে ক্রসফায়ার দিতে চান। তথ্যমন্ত্রণালয় নজরদারির নামে প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়ে রাখে।

ডিসি, এসিল্যান্ড কান্ডের মনস্তত্ত্ব

দুই বছর পূর্বে সাংবাদিক সায়েম তার বাবার একটা আবেদন নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের! কার্যালয়ে যায়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলাপ হয়। দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় বড় ভাই-ছোট ভাইয়ের সম্পর্ক হয়ে যায়। দুদিন পরে এক সহকারি কমিশনার ফোন দেন। সায়েম অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে ভাই বলায় তিনি ভীষণ মাইন্ড করেন। সায়েমকে রীতিমতো শিখিয়ে দেন, উনি তার ভাই নন স্যার?? আমি রসিকতা করে ফোনে বললাম,স্যার, আমার ভুল হয়ে গেছে। আপনারা তো আমাদের মহান স্যার।

সায়েম একজন সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পরও যখন এই পরিস্থিতি তখন সাধারণ মানুষের কি অবস্থা। ডিসি সুলতানা ও তার বাহিনী সাংবাদিক আরিফকে ক্রসফায়ার দেয়ার ভয় দেখানোর মনস্তত্ব খুবই গভীর ও সুদুরপ্রসারী। আলাদা ভাবে এই ঘটনা দেখলে এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকদিনের মুখরোচক গল্প হিসেবেই থাকবে। ডিসি কান্ড, এসি ল্যান্ডের ক্ষমতার চর্চা, মন্ত্রণালয়গুলোর প্রজ্ঞাপনের মনস্তত্ব একই সূত্রে গাঁথা।

মূল্যহীন জনগণ, অমূল্য আমলা কেনো কিভাবে!!

একটি রাষ্ট্রে জনগণের মূল্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম নির্বাচন। নির্বাচন প্রক্রিয়া যখন সঠিক ভাবে কাজ করে না তখন দেশের দন্ডমুন্ডের কর্তা সেজে বসে থাকেন সংবিধানে উল্লেখিত কর্মচারীরা। আমাদের দেশে যেভাবে ধীরে ধীরে জনগণ মূল্যহীন হয়ে গেছে, জনগণের সাথে রাজনীতিও যে মূল্যহীন হয়ে গেছে সেটি রাজনীতিবিদরা বুঝেও না বোঝার ভান করে আছেন। করোনা সংক্রমণের পর থেকে একই ভাবে এই সিভিল-পুলিশি আমলাতন্ত্র যতটা দৃশ্যমান তার চিটেফোঁটাও কোথাও নেই রাজনীতিবিদরা।

একটি দেশে সরকারি কর্মচারীর প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি অস্বীকার করার উপায় এখনো নেই। কিন্তু আমলারা মিলে মিশে যখন আমলাতন্ত্র হয়ে যায় তখন সেটি পাগলা ঘোড়ায় পরিণত হয়। মার্গারেট থেচারের মতো দক্ষ রাজনীতিবিদরা তার লাগাম টেনে ধরেন। যখন সেটি হয় না তখন সুলতানাদের মতো আমলাতন্ত্রের ধারক ও তাদের দোসররা জনগণের কর টাকায় গাড়ি বাড়ি হাকান আর জনগণের ঘাড়ের পর বসে নিজেদেরকে রাষ্ট্রের মালিক মনে করেন। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধের নামে ক্ষমতার চর্চা করতে গিয়ে এসি ল্যান্ড পর্যায়ের কর্মকর্তা সিনিয়র সিটিজেনকে শাস্তি দিয়ে এবং সেটি ছবি তুলে প্রচার করেন। তাদের নূন্যতম সমালোচনা করলে তারা অন্য কাডারের যেই হোক সেই কলেজের শিক্ষক কি ডাক্তার কাউকে ক্ষমতা দেখাতে কসুর করেননা!

অনেক সরকারি কর্মচারী দাবি করেন তারাও তো এদেশের নাগরিক। তারাও কর দেন। তাদের নিজেদের অবস্থান সঠিক ভাবে অনুধাবন করার জন্য বঙ্গবন্ধুর নামে মুখে ফেনা না তুলে তার বক্তব্যকে হৃদয়ে ধারণ করে কর্মে তার বাস্তবায়ন করলে অনেক সমস্যার উদ্ভবই হয়না। এটি সত্য অনেক সরকারি কর্মচারী নিজেদের জনগণের সেবকই মনে করেন। তারা সবসময় নমস্য। কিন্তু পুরো ব্যবস্থার মধ্যে সেই মনস্তত্ব রুধির ধারার মতো প্রবাহিত হওয়া সময়ে দাবি।

পাদটীকা: ডিসি সুলতানা, আরডিসি, এসিল্যান্ড কান্ড, মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন এইসবগুলো একই সূত্রে গাঁথা। আমি আমার সাথে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শ্রেণিতে পড়া এক ভাইয়ের কাছে এই মনস্তত্ব বুঝতে চেয়েছিলাম। তিনি প্রশাসন ক্যাডারের এক কর্মকর্তা। জিজ্ঞাসা করেছিলাম আপনারা এতটা পরিবর্তন হয়ে যান কেনো? তিনি বলেছিলেন, প্রশিক্ষণের ব্রিটিশ মনস্তত্বে কি যেনো আছে। প্রশিক্ষণটি একজন প্রথম শ্রেণির কর্মচারীকে তার উর্ধতনের দাসে আর জনগণের স্যারে পরিনত করে। বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)