চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কামরুল হাসান মঞ্জু: মানুষের কণ্ঠস্বর

প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে তিনি ভালোবাসতেন। আর এই কাজকেই জীবনের ব্রত মেনেছিলেন। এই ব্রত তিনি পালন করে গেছেন গবেষণা, লেখা আর তার প্রিয়তম বিচরণ ক্ষেত্র আবৃত্তিশিল্পসহ সকল কাজে। বঞ্চিত মানুষের কথা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশের জন্য তিনি গণমাধ্যমকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন। তৃণমূল মানুষের জন্য তিনি শক্তিশালী গণমাধ্যম গড়ে তুলতে চেয়েছেন। ‘উপর-নিচ’ তথ্য প্রবাহের উজানে ‘নিচ-উপর’ তথ্য প্রবাহের ধারা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। এ লক্ষ্যে সারাজীবন কাজ করে গেছেন তিনি। আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে তার পরিচয় সব চেয়ে জোরালো। আর সেই আবৃত্তির কবিতা নির্বাচনেও প্রাধান্য পেয়েছে বঞ্চিত মানুষের জীবন। ‘দরিদ্র্যরেখা’, ‘গরিবগঞ্জের রূপকথা’, ‘সোনার মেডেল’ আর ‘কালো মেয়ের জন্য পঙক্তিমালা’র মতো কবিতা অনন্য ব্যঞ্জনা পায় তার কণ্ঠে। তার কণ্ঠ হয়ে ওঠে তাদেরই কণ্ঠ যাদের কণ্ঠস্বর সাধারণত শোনাই হয় না।

কামরুল হাসান মঞ্জু কৈশোরে যশোরে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘উন্মেষে’র সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সময় লেখক-সাংবাদিক-সাংস্কৃতিক সংগঠক মহসিন শস্ত্রপাণির মতো যাদের সংস্পর্শে আসেন, সেখান থেকেই তার শিল্পমানসের রাজনীতিমনস্কতা গড়ে ওঠে। যে রাজনীতি ‘মুক-মূঢ় মুখে’ ভাষা ফোটানোর মধ্য দিয়ে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার। পরবর্তী জীবনেও যে বোধের জায়গায় অনড় ছিলেন মঞ্জু।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর পাস করে নেদারল্যান্ডস এবং লন্ডনে পড়াশুনার সময়ও তিনি তার গবেষণায় সমাজ-পিরামিডের নিচে বাস করা বেশিরভাগ মানুষকে অধিকার আর উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে আসার উপায় নিয়ে কাজ করেন। আর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার ছাত্র হিসেবে এক্ষেত্রে কাজের জায়গা হিসেবে বেছে নেন গণমাধ্যমকে। যার মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন প্রান্তিক মানুষকে প্রাধান্য দেওয়া উন্নয়ন যোগাযোগ কৌশল। এর ধারাবাহিকতায় দেশে উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করার সময় মানবাধিকার, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের প্রেক্ষাপটে গ্রামভিত্তিক সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করে গেছেন তিনি। এক পর্যায়ে তার গবেষণার ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন গণমাধ্যম বিষয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ম্যাস্-লাইন মিডিয়া সেন্টার- এমএমসি’। এমএমসি’র মাধ্যমে তিনি উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশজুড়ে সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ ও গবেষণাসহ নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। ‘মেঠোবার্তা’, ‘লোকসংবাদ’ও ‘সবার কথা’ পাক্ষিক পত্রিকা এবং ‘প্রান্তজন’ নামে জার্নাল প্রকাশ ও সম্পাদনা করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

গণমাধ্যম এবং উন্নয়ন বিষয়ে বেশ কিছু বইও প্রকাশ করেছেন সে সময়। বরগুনায় প্রতিষ্ঠা করেছেন কমিউনিটি রেডিও ‘লোক বেতার’। এসব কিছুরই অভিন্ন লক্ষ্য ছিল, প্রান্তিক মানুষের চাওয়া-পাওয়া-বঞ্চনার কথা সমাজের মূলধারার আলোচ্যসূচিতে নিয়ে আসা। নীতিনির্ধারণী মহলকে প্রভাবিত করা।

বিজ্ঞাপন

কামরুল হাসান মঞ্জু’র কাছে শিল্প-সাহিত্য চর্চা ছিল শিল্পী-সাহিত্যিকের সামাজিক দায়িত্ব পালনের উপায়। তার লেখালেখির ক্ষেত্র কিংবা আবৃত্তির বিষয় নির্বাচনে এই চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। বৃন্দ আবৃত্তি আর আবৃত্তি প্রযোজনার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর পরিসরে বার্তা পোঁছে দেওয়ার প্রয়াসে সংগঠন গড়ে তোলেন তিনি। তার সংগঠন ‘স্বরিত’র আবৃত্তি প্রযোজনাগুলোর বেশিরভাগই অন্যায়-অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আর শোষিত মানুষের পক্ষে বার্তা তুলে ধরে। দারিদ্র্য-বৈষম্য-বর্ণবাদ- সবই উঠে আসে মঞ্জু’র গ্রন্থনা আর নির্দেশনায়। ‘কালো মানুষের গান’ ‘আমরা অনার্য আমরা দ্রাবিড়’ ‘চির প্রণাম অগ্নি’ ‘এক অচ্ছুত অনার্য’র মতো আবৃত্তি প্রযোজনা ও অ্যালবামগুলোর নামই এর প্রমাণ বহন করে। তার অগ্রজ আবৃত্তিশিল্পী, প্রয়াত তারিক সালাউদ্দিন মাহমুদের বস্তুবাদী আবৃত্তির চিন্তার প্রভাবও তার কাজে দেখা যায়। বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাথে জন্মলগ্ন থেকে জড়িত থাকার সুবাদে, এমনকি ব্যক্তিগত আবৃত্তি চর্চার পরিসরেও ৮০ থেকে ৯০ এর দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন মঞ্জু। ঝুঁকি নিয়েও প্রতিবাদি আবৃত্তির মঞ্চে নিয়মিত ছিলেন কামরুল হাসান মঞ্জু। আবৃত্তিশিল্পে ধারবাহিক অবদানের স্বীকৃতিতে বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ তাকে গোলাম মুস্তাফা পদক ২০১৯ এ ভূষিত করে।

মঞ্জুকামরুল হাসান মঞ্জু’র লেখালেখিতেও শোনা যায় অন্যায়-শোষণ-বঞ্চনা-অসঙ্গতির শিকার মানুষের কণ্ঠ। সাংবাদিক ফখরে আলম লিখেছেন, ‘কবিতায় তার স্বতন্ত্র আবেগ, প্রেম, দ্রোহ আমার কাছে খুব স্পষ্ট হয়ে আছে। ১৯৮৪ সালে লেখা ‘সংবর্ধনা’ নামের একটি কবিতা আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। কবিতার শেষ স্তবক এমন- ‘আমরা ঊর্ধ্বস্বরে জয়ধ্বনি করলাম/জয় মহারানীর জয়/আমাদের চৈতন্যের গোলাপগুলি উত্তরপুরুষের জন্যে/আরো একবার পুরানো কেরানির মতো বিবর্ণ হয়ে গেল/আমরা ধন্য হলাম/ধন্য হলাম’’। সাংবাদিকতা, গণমাধ্যম ও সমাজ উন্নয়ন নিয়ে তার বইগুলোতেও তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন প্রান্তিক মানুষ ও নারী উন্নয়নের মতো বিষয়ে।

১৯৫৬’র ১৬ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া কামরুল হাসান মঞ্জু’র সাড়ে ৬৩ বছর কয়েক মাসের জীবনকাল শেষ হয়ে গেল ২০১৯ এর ২১ সেপ্টেম্বর। এই সময়ে এসে পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, তার সাংবাদিকতা-উন্নয়ন-শিল্প-সাহিত্যের সহযাত্রী এবং অনুজদের অনেকেই আজ সুুপ্রতিষ্ঠিত-সুপরিচিত। তারা কতোটা এগিয়ে নিচ্ছেন, প্রান্তিক মানুষের সমস্যা-সম্ভাবনাকে মূলধারার আলোচ্যসূচিতে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন? মাঠ পর্যায়ে কতোটা চলমান তার অসমাপ্ত কাজ? শিল্প-সংস্কৃতি চর্চায় কতোটা বহমান সামাজিক অঙ্গীকারের দায়?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই হোক প্রথম প্রয়াণ দিবসে কামরুল হাসান মঞ্জুকে শ্রদ্ধা জানানোর উপায়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)