চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কানেরিয়া ইস্যুতে ‘ক্যাচাল’ বাড়ছেই

হিন্দু হওয়ার কারণে পাকিস্তান দলে দানিশ কানেরিয়ার সঙ্গে ঠিকঠাক ব্যবহার করতেন না সতীর্থরা। এমনই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন শোয়েব আখতার। কানেরিয়াকে নিয়ে রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেসের এই সাক্ষাতকার রীতিমতো আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। মন্তব্যের পর ভারত-পাকিস্তান দুদেশের সাবেক ক্রিকেটারদের মধ্যে শুরু হয়েছে কথার যুদ্ধ। সবমিলিয়ে কানেরিয়া ইস্যুতে ‘ক্যাচাল’ বাড়ছেই।

কানেরিয়া পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে দ্বিতীয় হিন্দু ক্রিকেটার। অনিল দলপতের কাজিন। তিনি অষ্টম অ-মুসলিম ক্রিকেটার, যিনি পাকিস্তানের হয়ে খেলেছিলেন। ৬১ টেস্ট খেলে ২৬১ উইকেটও নিয়েছেন। স্পিনার হিসেবে পাকিস্তানের হয়ে যা সর্বোচ্চ। ২০০০-২০১০ পর্যন্ত পাকিস্তানের হয়ে খেলেছেন তিনি। ২০১২ সালে ম্যাচ ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে খেলা থেকে আজীবন সাসপেন্ড হন কানেরিয়া। কয়েক বছর আগে এই বিষয় নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) দ্বারস্থও হয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

কানেরিয়ার প্রতিভার প্রতি কখনোই সুবিচার করেনি পাকিস্তান। ইউটিউব চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাতকারে এমন কথা বলে হইচই ফেলে দেন শোয়েব। পাকিস্তানি সাবেক পেসারের কথায়, ‘সে আমাদের সঙ্গে এক টেবিলে খেতে বসলে অধিনায়ক ভ্রু কুঁচকে তাকাত। আমি তাকে বলেছিলাম, তুমি অধিনায়ক হতে পারো, কিন্তু যেটা করছ, সেটা ঠিক নয়। কানেরিয়া কিন্তু আমাদের জন্য অনেক উইকেট নিয়েছে। তার সঙ্গেই এই ব্যবহার কেন?’

একই সঙ্গে শোয়েব বলেছেন, ‘কানেরিয়াকে তার ব্যতিক্রমী পারফরম্যান্সের জন্য কেউ কৃতিত্ব দিত না। সে একাই ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডে আমাদের টেস্ট জিতিয়েছিল। তারপরও এটা তার সঙ্গে এমন আচরণ করা হত।’

শোয়েব আখতারের আনা অভিযোগ একশ শতাংশ সত্য বলে জানান কানেরিয়াও। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম টাইমসনাউকে কানেরিয়া বলেছেন, ‘শোয়েব একজন কিংবদন্তি। তার কথা তার বোলিংয়ের মতোই তীক্ষ্ণ। আমি যখন পাকিস্তানে খেলতাম তখন আমার এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার সাবাস ছিল না। কিন্তু আখতার ভাইয়ের মন্তব্যের পর আমিও মুখ খুলতে চাই। আখতার ভাই সবসময় আমায় সমর্থন করেছেন। আমি পাশে পেয়েছি ইনজি ভাই (ইনজামাম-উল-হক), মোহাম্মদ ইউসুফ ও ইউনিস ভাইকে ( ইউনিস খান)। যারা আমাকে সমর্থন করেনি শীঘ্রই আমি তাদের নাম প্রকাশ্যে আনব। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি পাকিস্তানের হয়ে খেলার জন্য।’

তিনি এজন্য প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কাছে কাতর আবেদনও করেছেন। বলেছেন, ‘আমি ভালো নেই, আমাকে বাঁচান। ইমরান খানসহ পাকিস্তানের সমস্ত কিংবদন্তি ক্রিকেটার, ক্রিকেট প্রশাসকদের কাছে আবেদন করছি। আমি খুব কষ্টে আছি। আমাকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করুন।’

তবে কানেরিয়া এও বলেছেন যে, তার সঙ্গে বৈষম্য করা হলেও কখনো ধর্ম পরিবর্তনের প্রয়োজন বা চাপ অনুভব করেননি।

শোয়েব আখতারের স্বীকারোক্তি নড়িয়ে দিয়েছে ক্রিকেট মহলকে। ঘটনার উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দিতে বাধ্য হয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। পিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দোষী ক্রিকেটারদের প্রকাশ্যে আনা হোক।

পিসিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তা পাকিস্তান সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলে জানিয়েছেন, ‘আখতার ও কানেরিয়া দু’জনেই অবসরপ্রাপ্ত ক্রিকেটার। পিসিবির সঙ্গে তারা চুক্তিবদ্ধও নয়। তারা যা খুশি তা বলতেই পারেন। তবে তারা পাকিস্তান কিংবা পাকিস্তান ক্রিকেটের সিস্টেম নয়, কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন।’

এরপরেই সাবেক অধিনায়কদের এই বিষয়ে মুখ খোলার বার্তা দিয়েছেন সেই কর্মকর্তা। তিনি জানিয়েছেন, ‘কানেরিয়া খেলার সময়ে ইনজামাম-উল হক, রশিদ লতিফ, ইউনিস খান, মোহাম্মদ ইউসুফ পাকিস্তানের অধিনায়ক ছিলেন। আখতার কিংবা কানেরিয়া যা বলছে, তাতে এই সময়ে তাদের মুখ খোলা উচিত। বোর্ড কেন নিজেকে এর মধ্যে জড়াবে!’

আখতার কিংবা কানেরিয়া যদিও পাকিস্তান ক্রিকেটের একাংশকে পাশে পেয়েছেন। সাবেক দুই তারকা ইকবাল কাশিম, মহসিন খানরা সরাসরি কানেরিয়ার পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন। কাশিম জানিয়েছেন, ‘যদি কোনো ক্রিকেটার কানেরিয়াকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হেনস্থা করে থাকে, তাহলে তাদের নাম প্রকাশ্যে আনা হোক।’

বিজ্ঞাপন

মহসিন খান জানিয়েছেন, ‘ধর্ম, বর্ণ নয়, দলের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ক্রিকেটীয় স্কিলই একজন ক্রিকেটারের পরিচয় হওয়া উচিত।’

তবে শোয়েবের দাবির নিন্দা করেছেন সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ ইউসুফ। তাদের খেলার দিনগুলোতে পাকিস্তান দলে ধর্মীয় বৈষম্যের দাবি উড়িয়ে দেন তিনি। এই ব্যাটিং কিংবদন্তি তার টুইটার অ্যাকাউন্টে অভিযোগের নিন্দা জানান।

ইউসুফ বলেন, ‘পাকিস্তান দলে সংখ্যালঘু খেলোয়াড়দের নিয়ে বৈষম্য সম্পর্কে করা মন্তব্যের নিন্দা জানাই। আমি দলের সদস্য হয়েছি এবং সবসময়ই দল, পরিচালনাপর্ষদ ও অনুরাগীদের কাছ থেকে অনেক ভালোবাসা এবং সমর্থন পেয়েছি! পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’

খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণকরা ইউসুফ ২০০৫ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

কানেরিয়াকাণ্ডে মুখ খুলেছেন গৌতম গম্ভীর। তিনি সরাসরি জানান, এতেই স্পষ্ট পাকিস্তানের অবস্থান। পাশাপাশি ভারতের জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আজাহারউদ্দিনের দৃষ্টান্ত এনে গম্ভীর জানান, ভারত কোথায় আলাদা পাকিস্তানের চেয়ে।

কানেরিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে গম্ভীর সাংবাদিকদের সামনে তুলোধোনা করেন পাকিস্তানকে। বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের অধিনায়ক ছিলেন আজাহারউদ্দিন। এটা এমন একটা দেশে ঘটছে যেখানের প্রধানমন্ত্রী একজন ক্রিকেটার।’

আগাগোড়াই পাকিস্তানের প্রতি বিরাগ গম্ভীর এমনটা জানিয়ে আরও বলেছেন, ‘ মোহাম্মদ কাইফ, ইরফান পাঠান, মুনাফ প্যাটেলদের ভারত সম্মান দিয়েছে। মুনাফ আবার আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমরা একসঙ্গে খেলে দেশকে গর্বিত করেছি। পাকিস্তান থেকে যে রিপোর্ট আসছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক।’

গম্ভীর এই ঘটনাকে ‘পাকিস্তানের আসল মুখ’ বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘একজন ক্রীড়াবিদ যদি এমন নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে হিন্দু, শিখসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের কীভাবে বসবাস করতে হয়, তা কল্পনারও অতীত।’

ভারতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে দেশজোড়া যখন জটিলতা, তখন পাকিস্তান নিয়ে এমন মন্তব্য করেন গম্ভীর। সুযোগ বুঝে তার পাল্টা দিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক জাভেদ মিঁয়াদাদ।

বিদেশি দলগুলোর কাছে সুরক্ষিত নয় ভারত। তাই ভারতে ক্রিকেট বন্ধ করে দেয়া হোক। আইসিসিকে এমনই আর্জি জানিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক তারকা জাভেদ মিঁয়াদাদ। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের প্রতিবাদে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ চলছে। হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। এমন অবস্থায় আইসিসির কাছে ভারতকে কালো তালিকাভুক্ত করার বার্তা দেন তিনি।

পাকিস্তানের ওয়েবসাইট পাকপ্যাশনডটনেটকে দেয়া সাক্ষাতকারে মিঁয়াদাদ বলেন, ‘আইসিসি সামনে এসে বিশ্বের সমস্ত ক্রিকেট খেলিয়ে দেশকে বলো। অবশ্যই জানাও যে ভারতে আর ক্রিকেট খেলা নিরাপদ নয়। কারণ ওখানের জনগণ একে অন্যের সঙ্গে মারামারি করছে, লড়াই করছে নিজেদের মধ্যে। তাকিয়ে দেখো, কী ঘটছে। আইসিসির অবশ্যই এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

মিঁয়াদাদ এখানেই না থেমে আরও বলেছেন, ‘আইসিসির কাছে আমার বার্তা স্পষ্ট। সমস্ত সফরকারী দলকে ভারতে আসতে নিষেধ করা হোক। এখন সবাই দেখতে পাচ্ছে। ন্যায়ের পথে হাঁটুক আইসিসি। আইসিসি কী করবে, বিশ্বকে কোন কথা জানাবে, দেখা দরকার।’