চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কানাডায় রাজনীতি এবং কর্মক্ষেত্রে রয়েছে নারী পুরুষের বৈষম্য

পশ্চিমের উদার উন্নত দেশ হওয়া সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্র এবং নেতৃত্বের পর্যায়ে কানাডায় নারী পুরুষের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। অভিবাসী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হন বলে কানাডার রাজনীতি, কর্পোরেট এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিত্বকারী তিনজন নারী বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন।

অভিবাসী বিশেষ করে কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশি নারীদের নিজেদের স্বাচ্ছ্যন্দের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে মূলধারায় জায়গা করে নেয়ার চেষ্টা চালানোর আহ্বান জানান তারা। তারা বলেন, কেবলমাত্র নিজেদের কমিউনিটির ভেতর বৃত্তাবদ্ধ হয়ে থাকলে কোনোভাবেই সাফল্য অর্জন করা যাবে না।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

কানাডার বাংলা পত্রিকা ’নতুনদেশ’ এর প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগরের সঞ্চালনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রচারিত ‘শওগাত আলী সাগর লাইভ’ অনুষ্ঠানে তারা এ মতামত দেন।

স্থানীয় সময় বুধবার রাতে ‘কানাডা কি এখনো বয়েজ ক্লাব” শিরোনামে এই আলোচনায় অংশ নেন উইনিপেগ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং ম্যানিটোবা এনডিপি’র স্ট্যাটাস অব উইম্যান কমিটির চেয়ারপার্সন ড. দুরদানা ইসলাম, রয়্যাল ব্যাংক অব কানাডার সিনিয়র পরিচালক,ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর অধ্যাপক নাজিয়া শাহরিন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারি অধ্যাপক,লেখক ও অনুবাদক ফারহানা আজিম শিউলি।

আলোচকরা কানাডার রাজনীতি, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্সেত্রে পুরুষ আধিপত্য ‘বয়েজ ক্লাব সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে বলে মত প্রকাশ করে বলেন,সমাজের নেতৃত্বে নারীরা এগিয়ে এলে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের প্রাধান্য থাকলে পুরো সমাজই তাতে উপকৃত হয়। কেননা, নারীদের সিদ্ধান্তে শিশু, নারী পুরুষ সবারই মঙ্গল কামনা গুরুত্ব পায়।

কানাডার মূলধারার নারী কর্পোরেট নির্বাহীদের সংগঠন ’উইম্যান এক্সিকিউটিভ নেটওয়ার্কে’র ‘কানাডার ১০০ শক্তিশালী নারী’ পদকে ভূষিত হওয়া নাজিয়া শাহরিন বলেন, কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতায় কোনো দেশেই কর্পোরেট জগতের নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে যাওয়া যায় না। এমনকি উচ্চ পর্যায়ের চাকরীতেও শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি নেটওয়ার্ক বা যোগাযোগ একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

তিনি বলেন, কর্পোরেট জগতে নারীদের আগমন ঘটেছে অনেক পরে। ফলে এখানে একটি বয়েজ ক্লাব সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ’নেতৃত্ব’ নির্ধারণ করার যোগ্যতা এবং শর্তগুলোও তৈরি করা হয়েছে পুরুষদের বিবেচনা অনুসারে। ফলে সেই বিবেচনায় নারীরা নেতৃত্ব পর্যায়ে এগিয়ে যেতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

নাজিয়া শাহরিন কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশি মেয়েদের নানা পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েরা পড়াশোনা শেষ করে, ডিগ্রী নিয়ে চাকরিতে ঢুকে কঠোর পরিশ্রম করে কিন্তু ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে পৌছুতে পারে না। কর্মক্ষেত্রে নেটওয়ার্ককে তারা বিবেচনায় নেন না বলে সবসময়ই পিছিয়ে পরেন।

ড. দুরদানা ইসলাম তার আলোচনায় কানাডায় রাজনীতিতে নারী এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নেই বলে মন্তব্য করে বলেন নারীদের আরো বেশি রাজনীতি এবং সামাজিক কর্মকান্ডে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বাংলাদেশি কানাডীয়ান নারীদের নিজেদের স্বচ্ছন্দ্যের পরিবেশের বাইরে বৃহত্তর পরিবেশে নিজেদের তুলে ধরার পরামর্শ দিয়ে বলেন, আমরা নিশ্চয়ই বাংলাদেশ, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবো। কিন্তু কানাডার রাজনীতি, সমাজনীতি এবং ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গেও আমাদের পরিচয় ঘটতে হবে। তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সাথে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করে নিজেদের যোগ্য করে তোলার পরামর্শ দেন।

ড. দুরদানা ইসলাম বলেন, রাজনীতি কিংবা কর্মক্ষেত্রে একজন নারীকে সবসময় সংসার ও কর্মক্ষেত্রে কিভাবে ভারসাম্য রাখেন- এই প্রশ্ন শুনতে হয়। কিন্তু কোনো পুরুষকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় না। এটি দীর্ঘদিনের চলে আসা স্টেরিও টাইপ মানসিকতা।

তিনি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সতর্কতার পরামর্শ দিয়ে বলেন, রাজনীতি কিংবা কর্মক্ষেত্রে যারা নেতৃত্ব পর্যায়ে যেতে চান, তাদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনি কী পোস্ট করেন, কী ভাষায় আচরণ করেন- সেগুলো দিয়েই আপনার প্রোফাইল তৈরি করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনি নিজেকে কিভাবে উপস্থাপন করছেন- সেটি আপনার ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করবে।

লেখক ও অনুবাদক ফারহানা আজিম শিউলি কোভিডে নারীদের চাকুরী হারানোসহ সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার পরিসংখ্যানের পাশাপাশি কানাডার নারীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামী আন্দোলনের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কোভিড কানাডিয়ান সমাজের ভেতরকার বৈষম্যটাকে নগ্নভাবে সবার সামনে নিয়ে এসেছে।

ফারহানা আজিম শিউলি আরও বলেন,কানাডা নিসেন্দেহে একটি মানবিক রাষ্ট্র এবং নারীবান্ধব রাষ্ট্র। বাংলাদেশ বা বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশ থেকে আসা নাগরিকরা কানাডায় এসে রাষ্ট্রের এই ইতিবাচক সিস্টেমের সুফল ভোগ করেন। কিন্তু দেশ থেকে নিয়ে আসা মানসিকতা এবং এখানকার নানা পরিস্থিতিতে সহিংসতার হলেও সেগুলো নিয়ে তারা মুখ খুলেন না। অভিবাসী নারীরা আরো বেশি মুখ বন্ধ করে রাখেন।

’নতুনদেশ’ এর প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগর তার বক্তব্যে কানাডার মূলধারার কর্মকান্ডে বাংলাদেশি নারী-পুরুষদের সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কানাডীয়ান সমাজে বাংলাদেশি কানাডীয়ানরা বেশি সংখ্যায় নেতৃত্ব পর্যায়ে জায়গা করে নিতে পারলে কেবল কমিউনিটিই নয়, কানাডার কাছে বাংলাদেশ্ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।

বিজ্ঞাপন