চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনা মহামারী, অপরাধ ও ভিকটিমাইজেশন: বর্তমান-ভবিষ্যত সংকট ও করণীয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকদের দুয়েকজন করোনাকালে ফ্রান্সে প্রায় ৩০ভাগ পারিবারিক নির্যাতন বৃদ্ধির রিপোর্ট নিয়ে ইতোমধ্যে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।  ঐ রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে, যেহেতু মহামারীকালে ‘লকডাউন’ অবস্থায় মানুষ পারিবারিক জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে বাধ্য হয় ফলে স্বাভাবিকভাবে ফ্রান্সের মতো রাষ্ট্রে পারিবারিক নির্যাতন বেড়ে গেছে।

এ অবস্থা বিবেচনা করলে কিন্তু বাংলাদেশেও বেড়ে যেতে পারে বলে তাঁরা মন্তব্যে করেছেন। যদিও বিভিন্ন দেশের অপরাধ পরিসংখ্যানে ভিন্ন ভিন্ন কিংবা বিপরীতমুখী বক্তব্যও এসেছে। তাই সমাজবিজ্ঞানের একজন ছাত্র ও অপরাধবিজ্ঞানের পাঠদানের সাথে যুক্ত হিসেবে বিষয়টিকে শুধুমাত্র সরলভাবে আলোচনা করা উচিত নয় বলেই মনে করি। আরেকটি বিষয়, রিপোর্ট সত্য ধরে নিলে পারিবারিক নির্যাতন বাড়বে বংলাদেশে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সামগ্রিকভাবে অপরাধের গতি-প্রকৃতি কি হবে? আমি মনে করি তা নিয়ে সামগ্রিক আলোচনা ও বিশ্লেষণ করা উচিত। যদিও করোনা মহামারির কালে মানুষের অপরাধের গতি প্রকৃতি কি হবে কিংবা সংকটময় এই সময়ে মানুষ কি পরিমানে ভুক্তভোগী হবে তা নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান, পুলিশ, কোর্ট এবং বিচারব্যবস্থার সাথে যুক্ত ব্যক্তিগণ এখনো তেমনি ওয়াকিবহাল নন কিংবা সচেতন নন। তবে পাশ্চাত্যে এই বিষয়, বিশেষ করে, অপরাধ এবং মানুষের ভুক্তভোগীকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়েছে। ইউরোপ আমেরিকার দুয়েকটি পত্র-পত্রিকা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই এ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশের পাশাপাশি করণীয় কি তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এ বিষয়ে দৃশ্যমান আলোচনা, লেখালেখি কিংবা গবেষণা খুব বেশি একটি চোখে পড়েনি। তাই বাংলাদেশের অপরাধের ভবিষ্যত গতি-প্রকৃতি, সম্ভাবণা ও করণীয় বিষয়ে দুয়েকটি মতামত দিতে চাই।

বিজ্ঞাপন

প্রথমত, গত ২৭ মার্চ আমেরিকায় ‘মার্শাল প্রজেক্ট এ্যানালিসিস’ এর গবেষক সিমন ওয়েইসেলবাওম এবং ওয়েহিয়া লি একটি বিশ্লেষণে দেখান যে, এই সময়টায় গত তিন বছরের তুলনায় আমেরিকার কয়েকটি রাজ্যে বিশেষ করে সানফ্রান্সিসকো (৪২%), ডেট্রয়েট (২২%), লসএঞ্জেলস (১৯%) ও শিকাগোতে (১৩%) গড় অপরাধের হার কমে গেছে। আগে অনেক গবেষকের ধারণা ছিলো যেহেতু মহামারীর কালে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের সংখ্যা কমে গেছে ও কারাগার-জেল থেকে অনেক অপরাধী প্যারোল-প্রবেশনে মুক্তি পাবে সেহেতু অপরাধের হার বাড়বে। কিন্তু এই প্রজেক্টের গবেষকদ্বয় দেখান যে, যেহেতু বেশিরভাগ মানুষ করোনাকালে বাড়ির অভ্যন্তরে অবস্থান করে সেহেতু এখানে অপরাধ কমে গেছে। এবং যুক্তির পক্ষে তাঁরা পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জন ম্যাকডোনাল্ড এর মন্তব্য উদ্বৃত করেছেন, ‘যেহেতু এই সময়ে মানুষ বাড়িতে থাকে ফলে অপরাধের সুযোগ কমে যায়।কারণ পরিবারের বাইরে সম্ভাব্য ভিকটিমের সংখ্যা কমে গেছে।’

বিজ্ঞাপন

এ ব্যাপারে প্রকৃত অর্থে সংখ্যাগত বিচারে অপরাধ নাও কমতে পারে তার কারণ হলো, মানুষের মধ্যে আতঙ্কের কারণে কেউ কেউ ছোটোখাটো অপরাধের শিকার ও ভুক্তভোগী হলেও তা রিপোর্ট করেন না বা করবেন না। এবং এর কারণেই সংখ্যাগত দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধের সংখ্যা কমবে। যাকে আমরা অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডার্ক ফিগার’ বলে চিহ্নিত করি। তবে লেখকদ্বয়ের সাথে একমত হয়ে আমিও মনে করি, বাংলাদেশেও করোনাকালে সুনির্দিষ্ট কিছু অপরাধ যেমন পকেটমার, ছিনতাই, রাস্তাঘাটে ইভটিজিং ও সামগ্রিকভাবে নারী নির্যাতন কমবে।

তবে আমার কথা হচ্ছে লকডাউনের কারণে ব্যবসা বাণিজ্যসহ দোকাট-পাট বন্ধ, স্কুল-কলেজসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, মার্কেটসহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ সেহেতু এখানে ভিন্ন ধরনের অপরাধ যেমন চুরি, ডাকাতি, সিঁদেল চুরি সংখ্যা বাড়বে। করোনার সময়ে নিন্মবিত্ত পরিবারের মানুষজনের যেহেতু কাজের সুযোগ কমে গেছে এবং অনেকেই ইতিমধ্যে বেকার হয়েছেন ফলে অর্থনৈতিক নিয়মেই এই বেকার শ্রেণির মধ্যে এই ধরনের সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়বে। অপরাধবিজ্ঞানের জ্ঞান থেকে আমরা জানি যে, মানুষের অর্থনৈতিক প্রান্তিকতা, কাজহীনতা এবং বেকারত্ব দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ বৃদ্ধির সাথে সরাসরি যুক্ত।

ফলে সরকারকে অবিলম্বে দরিদ্র জণগোষ্ঠীর মানুষকে অপরাধ থেকে জড়িয়ে পড়া রোধ করতে বিশেষ কর্মসূচি এখনই নিতে হবে। তাদের সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর আওতায় এনে বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে যাতে তারা অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা পায়।

উদাহরণ হিসেবে আমরা যদি, যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া ও জ্যাকসনভিলে গত বছরের মার্চের তুলনায় এ বছরের মার্চে অপরাধের হার বিশেষ করে গোলাগুলি ও অস্ত্র অপরাধের  সংখ্যা বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে তারা তুলে আনছেন, করোনাকালে আতঙ্কিত হয়ে কিংবা অসুস্থতাজনিত কারণে অনেক পুলিশ অফিসার (তাদের হিসেবে শতকরা ২%) ছুটিতে ‘হোম কোয়ারেন্টিন’ থাকার বিষয়টিকে। এবং এর কারণেই পুলিশ পাহারা বা পেট্টোলিং, গ্রেপ্তার ও কমিউনিটি কালেকশনের সুযোগ কমে যায় কারণে সাধারণ মানুষেরা অপরাধ থেকে দূরে থাকলেও সেখানে পেশাদার অপরাধীরা সচেতনভাবে অপরাধের সুযোগ বেশি পায়।বিষয়টির সাথে সম্পর্কিতভাবে যদি দেখি, তবে বাংলাদেশের বাইরে আফগানিস্তানে কিন্তু করোনার কালেই জঙ্গি হামলার ঘটনা আমরা দেখতে পেয়েছি।

বাংলাদেশে লকডাউনের কারণে যেহেতু রাস্তাঘাট ফাঁকা এবং পুলিশ যেহেতু অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে ‘সামাজিক দূরত্ব’ নিশ্চিতকরণ এবং ত্রান বিতরণসহ বিভিন্নরকম সেবামূলক কাজে ব্যস্ত আছে সেহেতু এই সময়ে পেশাদার সহিংস অপরাধীসহ এমনকি জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদীরা সক্রিয় থাকবে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই পত্রিকায় কয়েকটি খুনের ঘটনা দেখতে পেয়েছি। ফলে করোনার কালে পেশাদার অপরাধীসহ জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদীরা যাতে কোন কার্যক্রম না করতে পারে সেই ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়সহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর একটি স্বমন্বিত উদ্যোগ এখনই নিয়ে হবে। যেখানে সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ, পুলিশ বাহিনী, বর্ডার গার্ড এমনকি সেনাবাহিনীরও একত্রিত হয়ে স্বমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে করোনার কালে ব্যাপকভাবে মানুষের হয়রানি বাড়বে। কিংবা আমরা বলতে পারি ইতিমধ্যেই তার কিছু আমরা দেখতেও পাচ্ছি। বিশেষ করে বিদেশ ফেরত যাত্রী, করোনা আক্রান্ত রোগী, মেডিক্যালের স্টাফগণ এ ধরণের ব্যাপক হয়রানির শিকার হচ্ছে।গত কয়েকদিনের পত্রিকার পাতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সাধারণভাবে জ্বর, সর্দি-কাশির লক্ষণ থাকলেই হাসপাতালে ভর্তি করানো হচ্ছেনা। একজন মুক্তিযোদ্ধা পর্যন্ত এই করোনাসদৃশ লক্ষণের কারনে প্রায় ৬টি হাসপাতালে এম্বুলেন্স নিয়ে ঘুরলেও তাকে ভর্তি করানো হয়নি। এমনকি মৃত ব্যক্তির কবরস্থান নিয়ে গ্রামবাসীদের প্রতিরোধ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কূটকৌশলের কারণে জেলা পুলিশের পুলিশ সুপারকে স্বউদ্যোগী হয়ে তাকে দাফন করতে হয়। আমরা ঢাকায় খিলগাঁও তালতলা কবরস্থানের করোনায় মৃতব্যক্তিকে দাফনের ব্যাপারে প্রতিরোধের মত অমানবিক ঘটনা দেখছি। বিদেশ ফেরত ভুক্তভোগী মানুষের উপর কলঙ্ক দেয়ার ঘটনা আমরা সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে দেখেছি। মানবজাতির এতদিনের অর্জনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘মানবিকতা’ এর প্রশ্নগুলো সংবেদনশীল মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে হাজির হচ্ছে আজকাল। প্রশ্ন হচ্ছে এ পরিস্থিতি কি শুধু বাংলাদেশে? আমি দেখতেছি সমগ্র পৃথিবীতেই এই ধরণের বিষয়গুলোই ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অসমজাতীয়, বহুসাংস্কৃতিক দেশগুলোতে বর্ণবাদ ও ঘৃণ্য অপরাধের নতুন নতুন ঘটনা প্রকাশিত হচ্ছে। আমেরিকার ইউএসটুডে পত্রিকা ও লন্ডনভিত্তিক পত্রিকা নিউইয়র্কের পত্রিকার তথ্য মতে, করোনা মহামারীর কালে ব্যাপকভাবে ঘৃণ্য অপরাধের সংখ্যা বাড়বে বা সম্ভাবনা বেড়ে গেছে। ইউএসটুডে পত্রিকার সংবাদিক ক্রিস্টাইন ফিলিপ এর রিপোর্ট থেকে দেখতে পারি, আমেরিকায় এশিয়া বংশদ্ভেূাত আমেরিকান অধিবাসী বিশেষ করে চীনের নাগরিকরা ব্যাপকভাবে ঘৃণ্য অপরাধের শিকার।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেহেতু বিভিন্ন বক্তৃতায় কোভিড-১৯ কে ‘চীনা ভাইরাস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সেহেতু সেখানে নাগরিকদের মধ্যে বিশেষভাবে চীনের নাগরিক এবং সাধারণভাবে সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, জাপানিসহ এশিয়া আমেরিকানদের প্রতি বিদ্বেষমূলক, ঘৃণ্য ও নেতিবাচক আচরণ আছে। তাদেরকে দেখলেই সাধারণ আমেরিকান অধিবাসীরা মুখ ঘুড়িছে নিচ্ছেন বা নেতিবাচক ও উগ্র মন্তব্য করেছেন। এই প্রতিবেদন থেকে দেখতে পারি, এমনকি গবেষণা ল্যাবে পর্যন্ত সহকর্মী এবং সহগবেষকরা বাজে মন্তব্য করছেন। একইরকম পর্যবেক্ষণ আমেরিকার ‘হিউম্যান রাইটস কমিশন’ এর বক্তব্য থেকেও এসেছে। শুধু তাই নয় ঐতিহাসিককাল থেকেই আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন সময়ে প্যানডেমিক আমলে এই ধরনের ঘৃণ্য মন্তব্য দেখতে পাই। ১৮৫৮ সালের দিকে আইরিশ অধিবাসীদেরকে হলুদ জ্বর ছড়ানোর অভিযোগে তাঁদের প্রতি সেইসময়ে বৈষম্যমূলক ঘৃণ্য আচরণ করা হত।

অন্যদিকে, নিউইয়র্কার পত্রিকার এ্যানা রাসেল এর, ‘দি রাইস অব করোনা ভাইরাস হেট ক্রাইম’ নামে একটি প্রবন্ধে দেখা যায়, জোনাথন মক নামে সিঙ্গাপুরের একজন অধিবাসী বৃটেনের আর্ট গ্যালারীতে কাজ করতে গেলে তাঁর প্রতি ‘জাতীয় বর্ণবাদী ও ঘৃণ্য মন্তব্য ছোড়া হয়। উপরোক্ত বিদেশি এই প্রতিবেদনগুলো হয়তো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভিকটিমাইজেশনের শিকার কিংবা কলঙ্কের শিকার নারী পুরুষকে কিভাবে বাঁচাতে হবে বা সংবেদনশীলতা তৈরি করতে হবে তা বুঝতে সহায়ক হবে। তাই বাংলাদেশেও বিদেশ ফেরত অভিবাসী, করোনা আক্রান্ত রোগী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যবৃন্দ, করোনা রোগীদের হাসপাতালে কর্মরত পেশাদার ডাক্তার, নার্সসহ অন্যরা যাতে কোনভাবে ঘৃণ্য অপরাধের শিকার না হন সেই বিষয়ে সরকারের উচ্চমহল, ক্রিমিনাল জাস্টিজ এজেন্সী এবং নাগরিক সমাজকে একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে। আমি মনে করি এই বিষয়টি জরুরী ভিত্তিতে সরকারের আশু কর্মসূচীর আওতায় আনতে হবে।

তৃতীয়ত, এএফপির রিপোর্ট, ইউনিসেফের প্রতিবেদনে ইউরোপীয় দেশগুলো বিশেষ করে ফ্রান্স ও স্পেনে যে পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতা বাড়ার যে চিত্র আমরা দেখতে পাই তা খুবই আশংকাজনক। আমি মনে করি ইউরোপীয় দেশগুলোর মত লকডাউন, কাজহীনতা এবং হোম কোয়ারেন্টিনে মানুষ বেশি থাকলে পারিবারিক নির্যাতনের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। তবে ইদানিংকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কিন্তু মধ্যবিত্ত স্বচ্ছল পরিবারগুলোর সদস্যদের যৌথ কাজকর্মের ইতিবাচক ছবি দেখি। প্রাথমিকভাবে আমি দেখতে পাচ্ছি, পরিবারের সদস্যবৃন্দ সবাই মিলে হয়তো একসাথে রান্নাবান্না করছে বা একসাথে মিলে বাগানের কাজ করছে বা সবাই মিলে একসাথে নাটক সিনেমা দেখছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের যুগে মানুষের মধ্যে আবার সামাজিক জীবন ও যৌথায়নের চিত্র প্রাথমিকভাবে ইতিবাচকভাবেই আসবে। তবে আমি মনে করি দীর্ঘমেয়াদে লকডাউনের কারনে পরিবারে বন্দী থাকলে নারীদের কাজের পরিসর বাড়ে।ফেসবুকে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষককে পর্যন্ত সারাদিন কাজের ফিরিস্তি দিতে দেখেছি। আমার মনে হয় এই ধরনের অতিরিক্ত কাজের বিষয়টি পরিবারের গন্ডীতে মধ্যবিত্ত নারীর সংকটগুলোকে সামনে আনবে এবং এর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক সংকটই বেশি হবে। যে বিষয়টি অনেক আগেই ব্রেটি ফ্রাইডান তার ‘ফেমিনিন মিস্টিক’ বইয়ে তুলে ধরেছিলেন।

অন্যদিকে, কাজহীন বেকার নিন্মবিত্ত পরিবারগুলোতে সামাজিক সংকট দেখা দিবে আরো তীব্রভাবে। ফলশ্রুতিতে, এখানে পারিবারিক নির্যাতনসহ আরো বিভিন্ন ধরণের সামাজিক সংকট বাড়বে। আমি দেখতে পাচ্ছি, নিন্মমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে বেশিরভাগক্ষেত্রে নারীরা যেহেতু পরিবারের কর্তা নয় সেহেতু শ্রেণিগত অবস্থান ও লৈঙ্গিক অবস্থান বিবেচনায় প্রান্তিক দরিদ্র নারীরাই বেশি সহিংসতার শিকার হবেন। আমেরিকান জেন্ডার বিশ্লেষক কিব্রার্লি ক্রেনশ্ তাঁর ‘ইন্টারসেকনালিটিজ’ তত্ত্বে এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।

তিনি দেখিয়েছেন যে, কোন একটি ক্ষেত্রে কেউ ভুক্তভোগী হলে সেখানে যে শ্রেণিগত, লিঙ্গগত ও বর্ণগত অবস্থান থেকে প্রান্তিক ও নেতিবাচক অবস্থানে থাকেন তিনিই সবচেয়ে বেশি ভিকটিমাইজেশনের শিকার হন। ফলে সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায়, দরিদ্র পরিবারে গৃহীনি নারীরা যেহেতু বেশি প্রান্তিক অবস্থানে থাকে তারাই নির্যাতন, সহিংসতাসহ বেশি বৈষম্যর শিকার হবেন।

যে বিষয়টিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, নাগরিক সমাজ, নারীবাদী সংগঠক ও জেন্ডার বিশ্লেষকদের এখনই সচেতন হবে, সূনির্দিষ্ট নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, করোনা মহামারীর সময়ে বাংলাদেশে চুরি, ডাকাতিসহ সম্পত্তিসংক্রান্ত অপরাধের হার বৃদ্ধি, খুন-হয়রানি, জঙ্গিহামলাসহ পেশাদার অপরাধের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা, দরিদ্র পরিবারগুলোতে সহিংসতা বৃদ্ধি ও বিভিন্ন ধরনের ঘৃনাজাত মোটিভ থেকে ঘৃণ্য অপরাধের হার বৃদ্ধি পেতে পারে তাই এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের এখনোই সচেতনার পাশাপাশি জরুরীভিত্তিতে সামগ্রিক ও সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। কারণ এই বিষয়ে সঠিক পরিকল্পনার অভাব আমাদের করোনাকালীন সময়ে ও তার অব্যবহিত পরেই ‘সামাজিক স্বাস্থ্যে’র জন্য ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং যা কোনভাবেই কাম্য নয়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।