চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনা ফান্ডে পাকিস্তানের ‘ত্যাড়ামি’ এব‌ং দেশে ডাক্তারদের পিপিই সঙ্কট

নভেল করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি’র আহ্বানে ইমারজেন্সি ফান্ড তৈরি করেছে সার্ক ( সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন ) ভুক্ত দেশগুলি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রথমে তার দেশের পক্ষে এই ফান্ডে ১০ মিলিয়ন ডলার জমা দিয়ে এই ফান্ডের যাত্রা শুরু করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সাহায্যের জন্য শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মোদি।

সার্ক ভুক্ত দেশগুলির রাষ্ট্র প্রধানদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠক করে মোদি প্রস্তাব দেন, সার্ক এলাকায় করোনা মোকাবিলার জন্য একটা ইমারজেন্সি ফান্ড তৈরি করা হোক। এই প্রস্তাবে সার্কের সব সদস্য দেশ ইতিবাচকভাবে সাড়া দেয়। একমাত্র পার্থক্য ছিল এই যে, সব দেশের রাষ্ট্র প্রধানরা ওই ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নিলেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বদলে দেশটির কার্যত স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাফর মির্জা ভিডিও কনফারেন্সে তার দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

বিজ্ঞাপন

১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সার্ক ছিল দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আঞ্চলিক সংস্থা। এর উদ্দেশ্য ছিল সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক অর্থনীতিকে একীভূত করা। অবশ্য পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বৈরী সম্পর্কের কারণে সংস্থাটি কখনো তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ২০১৪ সালে নেপালে সর্বশেষ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পরের সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালের নভেম্বরে। কিন্তু ভারত তাতে উপস্থিত হতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে তা বাতিল করা হয়। তার পর থেকেই সংস্থাটি আক্ষরিকভাবেই অকার্যকর হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

সার্ক ভুক্ত দেশগুলির মধ্যে এই ভাইরাসের প্রকোপ সবথেকে বেশি ভারতে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। করোনা প্রেক্ষাপটে যেহেতু প্রতিবেশী দেশগুলোর সুস্থ থাকার সঙ্গে প্রতিটি দেশের সুস্থ থাকার বিষয় জড়িত, সেদিক চিন্তা করেই হয়তো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই ‘আইস ব্রেকিং’ উদ্যোগ। পাকিস্তান শুধুমাত্র ইতিবাচক সাড়া না দিলেও সার্কের বাকি সদস্য রাষ্ট্ররা টাকা দেওয়া শুরু করেছে কমবেশি।

কে কতো অর্থ দিয়েছে?
ভারতের ১০ মিলিয়ন ডলারের পাশাপাশি শ্রীলংকা ৫ মিলিয়ন, বাংলাদেশ ১.৫ মিলিয়ন, আফগানিস্তান ১ মিলিয়ন, নেপাল ১ মিলিয়ন, মালদ্বীপ ২ লাখ ডলার এবং ভুটান ১ লাখ ডলার জমা করেছে সার্ক ফান্ডে। পাকিস্তান এই ফান্ড ও বহুজাতিক উদ্যোগে অংশ নিলে এই মহতি উদ্যোগের কার্যকারিতা যথাযথ হতো বলে মনে হচ্ছে। করোনা এমন একটা ভাইরাস যা আসলে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মোকাবিলা করা সম্ভব না। সার্কের দেশগুলোর একে অন্যের সঙ্গে সীমান্ত থেকে শুরু করে আন্ত:যোগাযোগের বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই করোনা প্রতিরোধে। এক প্ল্যাটফর্মে থেকে কাজ করলে সবাই নিরাপদ থাকবে, এটা পাকিস্তানের বোঝা উচিত ছিল বলে অনেক আন্তজার্তিক বিশ্লেষকরা মত দিতে শুরু করেছেন। অতীতের ভারত-পাকিস্তানের নেতিবাচক সর্ম্পক এই আপদকালীন কর্মসূচির মাধ্যমে কিছুটা ইতবাচক হতো বলেও অনেকে ধারণা করছেন।

কীভাবে ব্যবহার হবে ওই ফান্ড?
সে যাইহোক, এখন আসা যাক ওই ফান্ডের কার্যকারিতা বিষয়ে। নরেন্দ্র মোদি তার ভাষণের পরে দিল্লীর গান্ধীনগরের সার্কের অফিস থেকে একটি ওয়েবসাইট (http://www.covid19-sdmc.org/) খোলা হয়েছে, যেখানে ওই ফান্ড ব্যবহারের সরাসরি উদাহরণ বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য না থাকলেও কিছু পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও করোনা বিষয়ক কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েব লিংক এবং দৈনিক আক্রান্ত/মৃতের একটা পরিসংখ্যান নিউজ লেটার আকারে প্রকাশ করা হচ্ছে।

নরেন্দ্র মোদি ভিডিও কনফারেন্সে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি কিছু বিষয় উল্লেখ করেছিলেন ওই ফান্ড ব্যবহারের বিষয়ে

মোদি বলেছিলেন, ‘এই মহামারীর বিরুদ্ধে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের (সার্কের) দেশগুলি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ফলে এক দিকে যেমন স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না, তেমনই অযথা আতঙ্কিত হওয়াও যাবে না।’

এছাড়া ফান্ড ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা একটি র‌্যাপিড রেসপন্স টিম তৈরি করছি। তাতে চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞরা থাকবেন। থাকবে করোনা পরীক্ষার কিট, ওষুধপত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জামও। আপনাদের প্রয়োজন পড়লে তাদের পাঠানো হবে। এছাড়া অনলাইনে চিকিৎসকদের ট্রেনিং দেয়া হবে। এ সংকট উত্তরণে ও বাণিজ্য ক্ষতি পোষাতে সার্ক অঞ্চলের বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।

এছাড়া টেকনোলজি ব্যবহার করে কীভাবে এই মহামারী প্রতিরোধ করা যায়, তার সফল ও কার্যকর উদাহরণগুলোর এই ফান্ড ব্যবহার করে সার্ক সেক্রেটরিয়েটের মাধ্যমে তুলে আনা হবে বলেও জানান মোদি।

করোনায় বাংলাদেশ পরিস্থিতি

বিজ্ঞাপন

বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মত বাংলাদেশও কার্যত অবরুদ্ধ দশার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। বিশ্বের ১৯৫ দেশে ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ১৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে; আক্রান্ত হয়েছে চার লাখের অধিক মানুষ। আর বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ৩৯ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে, যাদের চারজন ইতোমধ্যে মারা গেছেন।

বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে অতি সংক্রামক এই ব্যাধি করোনা ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে কী পরিণতি ঘটবে- তা নিয়ে সবার মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ-আতঙ্ক।

সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে ‘যথেষ্ট প্রস্তুতি’ আছে বলে আওয়াজ দেয়া হলেও ৪০ জনের কম আক্রান্তের মধ্যে ৪ জনের মৃত্যুকে অংকের হিসেবে ফেললে শতকরা প্রায় ১০ এ এসে দাঁড়ায়। তারমানে দেশে এক লাখ আক্রান্ত হলে এই হিসেবে ১০ হাজার জনের মৃত্যু হবে বলে শঙ্কা। এই হিসেব ও শঙ্কা ভুল প্রমানিত হোক, এটা আমাদের কামনা।

গত কয়েকমাসের অভিজ্ঞতায় বর্তমানে যে দুটি বিষয় সামনে চলে এসেছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে জনসচেতনতার অভাব এবং আরেকটি চিকিৎসা কর্মীদের নিত্য ব্যবহার্য সরঞ্জাম যা পিপিই (ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম) নামে পরিচিত। করোনা প্রতিরোধে জনগণকে বিচ্ছিন্ন থেকে নিরাপদ থাকা ও সংক্রমণ না বাড়াতে অনুরোধ করার বিষয়টি একেবারেই কার্যকর হচ্ছে না বললে ভুল হবে না। সেইসঙ্গে করোনা চিকিৎসাসেবা দেয়া ডাক্তার-নার্সদের পিপিই’র অভাবের বিষয়টি মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে পুরো জাতিকে। ৯০ হাজার চিকিৎসক ও কয়েক লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য প্রতিদিন কয়েক লাখ পিপিই খুবই জরুরি যা আসলে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়নি। তার প্রমাণ হিসেবে নানা ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক মেমো নয়তো চিকিৎসকদের ক্ষোভকে উল্লেখ করা যেতে পারে।

পিপিই কোথায় পাওয়া যায়, দাম কেমন?

পিপিই মূলত আমদানি নির্ভর একটি পণ্য। যা মূলত চীন নয়তো অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশে নানা ধরণের মেডিক্যাল গাউনের চল থাকলেও দ্রুত সংক্রমিত হওয়া এবং বাতাসে ভেসে বেড়ানো করোনা ভাইরাস রোধে বিশেষ ধরণের পিপিই দরকার বলে বিশেষজ্ঞদের মতামত। পিপিই তৈরির সরঞ্জাম (বিশেষ ধরণের টিস্যু ফেব্রিক্স, মাস্ক, জুতার কাভার, চোখের-মাথার সুরক্ষা) দেশে পাওয়া যায় না এবং তা তৈরির সুযোগও কম। হাই-ভেল্যু ট্যাক্সের কারণে বেশি পরিমাণে এটি আমদানিও করা ছিল না দেশে। তাছাড়া চীনে করোনার প্রকোপের কারণে খোদ চীনেও এর সংকট রয়েছে। সব মিলিয়ে এক জটিল সমস্যার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। তবে যথেষ্ট পরিমান (প্রায় ৬০দিন) সময় পেয়েও কেন ওইসব সরঞ্জাম আমদানির দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেয়া হলো না, এই প্রশ্নের জবাবের সাথে সাথে এই ক্ষতি হজম করার পথ খুঁজতে হবে পুরো জাতিকে।

চীনে তৈরি হওয়া ওইসব পণ্য এখন সারাবিশ্বেই একটি বহুল কাঙ্খিত একটি পণ্য। চাহিদা বেশি থাকলে বাংলাদেশে যেমন ২০ টাকার পেঁয়াজ ১০০ টাকা হয়েছে, তেমনি চীনেও ওইসব ৮-১০ ডলারের সামগ্রী ২০-২৫ ডলার হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকা করোনায় আক্রান্ত হবার পরে চীনে প্রচুর ক্রয়াদেশ আসছে, দামের দিকে তাকাচ্ছে না তারা। তাছাড়া ওইসব পণ্য আসলে ডিসপোজেবল (মাত্র একবার ব্যবহার উপযোগী)। সেদিকে চিন্তা করলে এটি বেশ ব্যয়বহুল একটি বিষয়। সরকারের এদিকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া দরকার। তবে দ্রুত পদক্ষেপ হিসেবে ওইসব পণ্যের আমদানি শুল্ক উঠিয়ে প্রজ্ঞাপণ জারি করেছে এনবিআর। এটি খুবই সময়োচিত সিদ্ধান্ত।

আরেকটি বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। তা হচ্ছে, পিপিই তৈরির বেসিক ম্যাটেরিয়াল আমদানি শুল্ক উঠিয়ে দিয়ে ওইসব পণ্য দেশে তৈরির প্ল্যান্ট স্থাপন করা। তাহলে দেশেই ওইসব পণ্য তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ কীভাবে সার্ক ফান্ড থেকে উপকৃত হবে?
নরেন্দ্র মোদির ভাষণ অনুসারে প্রয়োজন অনুসারে যে দেশের যেটা প্রয়োজন তা ওই ফান্ড থেকে সাহায্য পেতে পারে। সেক্ষেত্রে পিপিইসহ ওইসব সরঞ্জাম যার যার দেশে তৈরিতে প্ল্যান্ট স্থাপনে সার্ক কাজ করতে পারে। আর বর্তমানে সঠিক ও কার্যকর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পিপিই দেশে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

বিশ্ব কূটনীতিতে একেক দেশের প্রতি একেক দেশের মধুর নয়তো তিক্ত ‘ওপেন সিক্রেট’ সর্ম্পক থাকে। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ-চীনসহ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সেগুলো পরিষ্কার লক্ষ করা যায়। বর্তমানে পরিস্থিতি যথেষ্ট নাজুক হওয়াতে বাংলাদেশের উচিত ‘প্রয়োজনের কূটনীতি’ করা। পাকিস্তানের মতো ত্যাড়ামি আর একা থাকার দিন এই বিশ্বে আর নেই বললেই চলে, অন্য দেশের ভাল থাকার সঙ্গে সঙ্গে সবার ভাল থাকা, এটা দ্রুত বুঝে সবাইকে পদক্ষেপ নিতে হবে। সবার মঙ্গল হোক, পৃথিবী করোনা মুক্ত হোক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)