চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনা পরিস্থিতিতে শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ

করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসন কোয়ালিশন এবং শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহবান জানিয়েছে তারা।

গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে কোয়ালিশন বলে, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, প্রচার মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ হতে জানা যায়, করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে স্কুল-কলেজ বন্ধ রয়েছে কিন্তু আবাসিক মাদ্রাসাসমূহে ক্লাস এবং প্রাইভেট কোচিং সেন্টারগুলোতে কোচিং ক্লাস চলছে। এই সকল স্থানে শিক্ষার্থীদের উপর বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া পরিবারে অবস্থানরত শিশুরাও পরিবারের নিজ বাবা-মা ও অন্যান্য সদস্য, কর্মক্ষেত্রে গৃহকত্রী/গৃহকর্তা ও চাকরিদাতা, গৃহ শিক্ষক ও প্রতিবেশীদের দ্বারা শিশুরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এমনকি ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাও পর্যন্ত ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর তথ্য অনুযায়ী বিগত জানুয়ারী- এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত, মোট ৩৮৭ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং ২৪২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭-১২ বছরের ৮৮ জন শিশু এবং ৬ বছরের নিচে ৪১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২০২০ সালে পরিচালিত আসক এর এক জরিপ প্রতিবেদনে- জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে ৮২ জন ছেলে ও ৯৬ জন মেয়েশিশু ছিল। ৮ শতাংশের বেশি মেয়েশিশু অনলাইনে যৌন শোষণ, হয়রানি এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সাইবার বুলিং ও যৌন আবেদনমূলক কনটেন্টের মুখোমুখি হয়েছে প্রায় ৮ শতাংশ শিশু। অনলাইনে ৩৬% মেয়ে শিশু বন্ধুদের যৌন নির্যাতনের শিকার। ২৩ শতাংশ মেয়েশিশু যৌন কনটেন্টের মুখোমুখি হয়েছে। ৪৬ শতাংশ অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব পেয়েছে। ২৭ শতাংশের বেশি মেয়েশিশু পরিচিত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ও আত্মীয় এবং ১৮ শতাংশ অপরিচিত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কোন শিশুকে এ ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করার ঘটনা বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত ২৭, ৩১, ৩২ ও ৩৫ (৫) অনুচ্ছেদে বর্ণিত সাংবিধানিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিশেষভাবে বাংলাদেশের সংবিধানে ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না। শিশু আইন ২০১৩ এর ৭০ ধারা অনুযায়ী শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নিষ্ঠুর আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দণ্ডবিধি ১৮৬০ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুযায়ী তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

‘শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসন কোয়ালিশন’ শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, ধর্ষণ, গুরুতর আঘাত করা ও হত্যার ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও যথাযথ শাস্তি প্রদানের জোর দাবি জানায়। ভবিষ্যতে এ ধরণের ঘটনা যেন আর না ঘটে সে ব্যাপারে আইনের প্রয়োগ ও জনমত গঠনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণেরও জোর দাবি জানায়।

‘শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসন কোয়ালিশন’-এর দাবি ও সুপারিশগুলো হলো:

১. শিশুর প্রতি নির্যাতনের ঘটনায় সকল অভিযুক্তকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনা এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা;

২. অবিলম্বে মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং করোনাকালীন পরিস্থিতিতে মাদ্রাসা বন্ধ রাখার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।

বিজ্ঞাপন

৩. নির্যাতিত শিশুর পরিবারকে যথাযথ সুরক্ষা প্রদান এবং নির্যাতনের শিকার শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা;

৪. শিশু সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে সার্বক্ষণিক সরকারি ও বেসরকারি হেল্পলাইন/হটলাইন নম্বর খোলা রাখা এবং যে সকল শিশু হেল্পলাইন বা হটলাইনের আওতার বাহিরে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;

৫. শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রদান কর্মসূচি গ্রহণ।

৬. শিশুর অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো;

৭. করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে শিশুদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে বয়স উপযোগী তথ্য প্রদানের মাধ্যমে সচেতন করার বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণ;

৮. কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী শিশু সুরক্ষা কাঠামো তৈরি ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিতকরণের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো;

৯. অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিশু এবং তার পরিবারের সদস্যদের সামাজিক সুরক্ষা সেবায় অন্তর্ভূক্তিকরণ নিশ্চিত করা;

১০. তথ্য প্রযুক্তি ও টেলিকম সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে অনলাইনে শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং একইসঙ্গে, গ্রাহকদের কাছে অনলাইনে শিশু সুরক্ষা সম্পর্কিত ক্ষুদে বার্তা প্রেরণের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা ইত্যাদি।