চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনা পরিস্থিতিতে কৃষি: প্রেক্ষিত কৃষি শ্রমিক ও যান্ত্রিকীকরণ

প্রফেসর ড. ইসমত আরা বেগম, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, প্রফেসর ড. চয়ন কুমার সাহা, প্রফেসর ড. মোঃ রমিজ উদ্দিন, প্রফেসর ড. মোঃ আবদুল কাদের, সুকল্প দাস, সৈয়দ তানভীর আহমেদ

আমাদের মৌলিক চাহিদাই শুধু নয় বেঁচে থাকার পাশাপাশি সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনের জন্য খাদ্য প্রয়োজন। আর এ খাদ্য উৎপাদনে নিয়োজিত আছে বাংলাদেশের কর্মে নিয়োজিত ১৫+ জনসংখ্যার প্রায় ৪০.৬ শতাংশ। জিডিপি-তে কৃষির যে ১৩.৭ শতাংশ অবদান তার অর্ধেকই আসে ধান থেকে। ধান উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ এখনও পর্যন্ত শ্রমিক নির্ভর হলেও উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যেমন, বপণ, সেচ, কীটনাশক, স্প্রে, ইত্যাদি কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে। কৃষি সবসময়ই অবহেলিত জীবিকা ছিল, তাই বাংলাদেশের জন্মকাল থেকে কৃষি বিভিন্ন সময়ে উৎপাদন পর্যায়ে বিভিন্ন উপকরণ যেমন সার, বীজ, সেচ এর সমস্যা ভোগ করে এসেছে, সময়ের আবর্তে সমাধানও হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে যে সমস্যাটা প্রকট আকার ধারণ করেছে তা উৎপাদন পর্যায়ে নয়, ফসল ঘরে তোলার সময় এবং সেটা হলো ধান কাটার সময়ে শ্রমিক সংকট।

বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনে বর্তমানে বোরো ধানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ১৯৭১-৭২ সালে মোট ধান উৎপাদন ছিল ৯৭.৭৬ লক্ষ মেট্রিক ট্রন যেখানে আমন ধানের অংশ ছিল সবচেয়ে বেশী (৫৮.২৭ শতাংশ) এরপর আউস (২৩.৯৭ শতাংশ) এবং বোরোর অংশ ছিল মাত্র (১৭.৭৭ শতাংশ)। ঐ সময় কৃষি জমির আবাদের পরিসংখ্যান দেখলেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায় আমন ধানের আবাদ হতো ৫৪.৭৪ লাখ হেক্টর জমিতে, আউস ৩০.০২ লাখ হেক্টর জমিতে, আর বোরো ধান মাত্র ৮.৮৪ লাখ হেক্টর জমিতে। সময়ের সংগে সংগে কৃষিতে উপকরণ সহজলভ্যতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, সরকারী নীতি-কৌশল, বেসরকারী উদ্যোগ আরো বিভিন্ন কারণে উৎপাদন বেড়েছে, খাদ্যে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, এক সময় যেখানে ৭ কোটি মানুষকে খাবার সরবরাহ করতে হিমসিম খেতো হতো, এখন অবলিলায় ১৭ কোটি মানুষকে খাওয়ানোর পরও উদ্বৃত্ত থাকছে। আর এক্ষেত্রে বোরোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ২০১৮-১৯ সালে বোরো উৎপাদন ছিল ১৮.৯০৯ হাজার মেট্রিক টন। মোট উৎপাদনের ৫৪.১৭, ৭.১৬, ৩৮.৫৭ ভাগ এসেছে যথাক্রমে বোরো, আউস, আমন ধান থেকে। আমাদের কৃষি জমি আবাদের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় মোট জমির ৪০.৩৭, ৯.৭৩ এবং ৪৯.৯০ শতাংশ জমিতে যথাক্রমে বোরো, আউস ও আমন ধান হয়। আমাদের গড় ফলনের হার বর্তমানে ৩.০৪ মেট্রিক টন/ হেক্টর, ১৯৭১-৭২ এ যেখানে ছিল ১.০৪ মেট্রিক টন/ হেক্টর।

বিজ্ঞাপন

এই গড় ফলন বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ হলো বোরো ধান। আউস, আমন ও বোরো ধানের গড় ফলন যথাক্রমে ২.৪৬, ২.৫২ এবং ৪.০৩ মেট্রিক টন/হেক্টর। এই বোরো ধান হাওড় অঞ্চলের একটি প্রধান ফসল। বাংলাদেশে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া এ সাতটি জেলায় প্রধানত আমাদের হাওড় অঞ্চলে অবস্থিত। এই সাতটি জেলার মোট চাষাবাদ হয় ১.২৬ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে এবং এর প্রায় ০.৬৮ মিলিয়ন হেক্টর হাওড় এলাকা। এই হাওড় এলাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ অঞ্চলে বোরো ধান উৎপাদন হয়ে থাকে, আমন ধান উৎপাদন হয়ে থাকে মাত্র ১০ শতাংশ অঞ্চলে। ২০১৮ এর পরিসংখ্যানে দেখা যায় হাওড় এলাকায় মোট ৩.৮২ মিলিয়ন মেট্রিক টন বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে। মোট উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ আসে এ অঞ্চল থেকে। বাকী ৮০ শতাংশ আসে হাওড় ব্যতিত অন্যান্য অঞ্চল থেকে।

হাওড় এবং অন্যান্য অঞ্চলের বোরো ধান বপন ও কাটা এর সময়ে পার্থক্য আছে, বিভিন্ন অঞ্চলে একই সময়ে বপণ ও কাটা হয় না। হাওড় এলাকা সমূহের বোরো ধান বপণ হয় নভেম্বর মাসের প্রথম এবং ধান কাটা হয় এপ্রিল ও মে মাসের প্রথম দিকে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ডিসেম্বরের শেষ দিকে বা জানুয়ারীর প্রথম দিকে বপণ করা হয় এবং ফসল কাটা হয় মে মাসের শেষে, কোন কোন এলাকায় জুন মাসেও বোরো ধান কাটা হয়। হাওড় এলাকায় ধান কাটার সময় শ্রমিক সংকটের একটা বড় কারণ হল সময় খুব কম থাকা। এ সময় পাহাড়ি ঢল নামা, আগাম বন্যা, কালবৈশাখী ঝড়, শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। এ সব কারণে প্রাকৃতিক ঝুঁকি না নিয়ে খুব কম সময়ের মধ্যে ধান কাটতে হয়। তাছাড়া বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে শ্রমিক সংকটের যে কারণ তা হাওড় অঞ্চলেও আছে।

পেশা হিসেবে কৃষিকে কখনোই উচ্চমানের মনে করে না এ সমাজ। কারণ কৃষিতে আয় কম, জলবায়ু নির্ভরতা, বাজার ঝুঁকি, ইত্যাদি বিদ্যমান। তাই বংশানুক্রমে কৃষি পেশা থেকে অনেক পরিবারই সরে এসেছে। পরিসংখ্যান মতে ২০১০ সালে এদেশের মোট ১৫ বছরের উপরে যারা কর্মসংস্থানে আছে তাদের মধ্যে পেশা হিসেবে কৃষিতে নিয়োজিত ছিল জনসংখ্যার ৪৭.৫৬ শতাংশ যার মধ্যে পুরুষ ৫৯.১৬ শতাংশ এবং মহিলা ৪০.৮৪ শতাংশ। আর ২০১৮-তে দেখা যায় ৪০.৬ শতাংশ কৃষিতে পেশা হিসেবে নিয়োজিত এবং যার মধ্যে পুরুষ ৫৪.৯৩ শতাংশ এবং মহিলা ৪৫.০৭ শতাংশ। গ্রামীণ কৃষিতে নিয়োজিত কৃষককে উৎপাদন খরচ উঠিয়ে আনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বেশ কিছু বছর ধরে কৃষি বিশেষ করে খাদ্যশস্য (ধান) অলাভজনক এন্টারপ্রাইজ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে যে কারনে কৃষিতে অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। বিকল্প পেশায় ঝুঁকছে কৃষক। পুরুষেরা গার্মেস্টস, রিক্সাচালক, আটোচালক বা ছোটখাট ব্যবসায় নিয়োজিক হচ্ছে, গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসছে। আর এ কারণেই কৃষি টিকিয়ে রাখতে মহিলা শ্রমিক অংশ্রগ্রহণ করেছে অধিক মাত্রায়। সামাজিক অবস্থার কারণে মহিলারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধান লাগাতে ও কাটতে মাঠে যেতে পারে না কিন্তু কৃষির অন্যান্য কাজগুলো তারা করে থাকে। প্রায় ক্ষেত্রেই মহিলারা ধান কাটতে মাঠে যায় না বলেই ধান কাটা মৌসুমে শ্রমিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করে।

শ্রমিক সংকট ধান কাটা মৌসুমে কয়েক বছর ধরেই ধীরে ধীরে বাড়ছিল। আর এখন করোনাভাইরাসের কারণে সামাজিক দুরত্ব মানতে হচ্ছে বলে তা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই করোনাভাইরাসের পরিস্থিতিতে শ্রমিক সংকট মোকাবেলার মাধ্যমে কিভাবে ফসল ঘরে তোলা যায় সেটাই এখন প্রশ্ন। গার্মেন্টস শ্রমিক, রিক্সাচালক, অটোচালক, ছাত্র করোনা মহামারির কারনে গ্রামে অবস্থান করছিল, তাছাড়া প্রকৃতিও আমাদের অনুকূলে ছিল, পাশ্ববর্তী এলাকা ও শহর থেকে যাওয়া শ্রমিক আনা গিয়েছিল, তাই হাওড় এলাকার সমস্যা আমরা সমাধান করতে পেরেছি। যদিও পাশ্ববর্তী এলাকা থেকে শ্রমিক আনতে গ্রামে স্বাস্থ্য বিধি মানার বিষয়টি নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন থেকেই যায়। যাই হোক, এখনো অন্যান্য অঞ্চলে মোট উৎপাদনের ৩০ শতাংশ মাঠে আছে, যা ঘরে নির্বিঘ্নে তুলতে হবে তবেই সম্ভাব্য খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলা করা যাবে। এক্ষত্রে পুরো মে মাস এবং জুন মাস সময় লেগে যাবে। এখন আমাদের ভাবতে হবে কিভাবে পুরো ধান স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে তুলতে পারি। পরিযায়ীত (মাইগ্রেটেড) শ্রমিকের একটি বড় অংশ আসে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে। এদেরকে করোনা মহামারির এই ক্রান্তিকালে আনতে হলে খরচ বেশী পড়ে যাবে। কেননা স্বাস্থ্য বিধি পালন করার জন্য থাকার জায়গা, খাদ্য, মাক্স, সাবান এসব সরবরাহ করতে হবে একদিক থেকে অন্যদিকে, পরিবহন ব্যবস্থা সীমিত বলে পরিবহন খরচও বেড়ে যাবে। কাজেই শ্রমিক পাওয়া গেলেও মজুরী বাবদ উৎপাদন খরচও বেড়ে যাবে। উপযুক্ত খামার যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে যেমন ভূমি এবং শ্রমিক উৎপাদনশীলতা বাড়বে, তেমনই আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কোভিভ-১৯ কে মোকাবেলা করার জন্য এক ইঞ্চি জমিও ফেলে রাখা যাবে না, অর্থাৎ নিবিড় পদ্ধতিতে চাষের মাধ্যমে শস্য উৎপাদন বাড়াতে হবে, আর এটি সঠিক ও উপযুক্ত খামার যান্ত্রিকীকরনের মাধ্যমেই অর্জন করা যেতে পারে।

এক্ষেত্রে করোনা মহামারি কালীন ও করোনা পরবর্তী সময়ে কৃষি শ্রমিক ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বিষয়ক আমাদের ভাবনাগুলো হলো:
(১) যন্ত্রপাতির (কম্বাইন্ড হারভেষ্টার ও ড্রায়ার) কাজ এক এলাকায় শেষ হলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সঠিক ও নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় অন্য এলাকায় তা পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। করোনাকালীন সময়ে যন্ত্র ব্যবহার করে ধান শুকালে নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখে সঠিক সময়ে ধান ঘরে তোলা সম্ভব। যান্ত্রিকীকরণ যেহেতু খরচসাধ্য, তাই স্বল্প-মেয়াদে করোনা মোকাবেলার জন্য এর পাশাপাশি দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে, মধ্যাঞ্চলে ও দক্ষিণাঞ্চলে শ্রমিকের প্রাপ্যতা নির্ধারণ করতে হবে। কতটুকু খামার যন্ত্রপাতি আছে, শ্রমিক প্রাপ্যতা কেমন, এ দুই এর সমন্বয় করেই সঠিক কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে।

(২) সর্বমোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০.৬ শতাংশ লোক কৃষিতে কর্মরত ফলে রাতারাতি যান্ত্রিকীকরণ করা যাবে না। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ পর্যায়ক্রমিক ভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে করতে হবে যাতে কৃষি শ্রমিক ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের দু’টিই ভারসাম্য রক্ষা হয়। দেশে খামার বর্হিভূত অনেক কর্মসংস্থান তৈরী হয়েছে। ফলে, কৃষি থেকে অকৃষিতে অনেক মাইগ্রেশন হয়েছে। সঠিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎতে কী পরিমাণ পরিযায়ী হবে সেটা হিসেবে রাখতে হবে। আমাদের ভাবতে হবে মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন সময়ে কিভাবে কৃষি শ্রমিক ও কৃষি যান্ত্রিকীকরনের ভারসাম্য রক্ষা করে বিভিন্ন পর্যায়ে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষক ও কৃষিকে রক্ষা করা যায়।

(৩) ফসল কাটার জন্য কম্বাইন্ড হারভেস্টার আকারে অনেক বড় বিধায় ছোট ও মাঝারী আকারের হারভেষ্টার এর কথা ভাবা যেতে পারে। বড় আকারের যন্ত্রপাতি নীচু জমিতে ব্যবহার করা যায় না। ছোট ও মাঝারী আকারের হারভেষ্টার ব্যবহারে ৭০ শতাংশ শ্রমিক খরচ বাঁচানো যাবে একদিকে তেমনি অন্যদিকে ব্যাগে ধান ভরতে গিয়ে যে অপচয় হয় সেটাও রোধ করা যাবে। কাজেই ছোট ও মাঝারী আকারের হারভেস্টারের মাধ্যমে ফসল কাটার ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণের ব্যবহার বাড়ানোর কথা ভাবতে পারি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে একটি ৭০ ঘোড়ার কম্বাইন্ড হারভেস্টার জমির অবস্থার উপর ভিত্তি করে প্রতি ঘণ্টায় ০.৮২ একর থেকে ১.১২ একর ধান কাটা, মাড়াইসহ বস্তাবন্দি করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতি একরের ধান কাঁটতে প্রায় ৯ লিটার ডিজেল তেল লাগবে, ৭০ শতাংশ শ্রমিক কম লাগবে এবং সনাতন পদ্ধতির চেয়ে খরচ বাঁচবে প্রায় ৬১ শতাংশ। তাছাড়া শুধু সনাতন পদ্ধতিতে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটা ও মাড়াই করলে যে পরিমাণ ধানের অপচয় হয় ছোট ও মাঝারী আকারের মিনি কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে করলে প্রায় ৫ শতাংশ ধানের অপচয় কম হয়। ফলে, ধান কাঁটা থেকে অর্ধেকের বেশি খরচ বাঁচানো যাবে।
(৪) ধান কাটা শেষ হলে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ধান মাড়াই ও শুকানো। বর্ষাকাল চলে আসে বিধায় রোদ পাওয়া দুঃসাধ্য। কখনো কখনো ধান শুকাতে ৩-৪ দিন রোদের প্রয়োজন হয়। কোভিভ-১৯ মহামারীতে যেহেতু কোনভাবেই খাদ্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেয়া যাবে না, তাই আমরা ধান কাটার পাশাপাশি ধান শুকানো যন্ত্র ব্যবহারের কথা ও ভাবতে পারি। ধান শুকানোর জন্য বিএইউ-এসটিআর ড্রায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। যা দামে তুলনামূলক ভাবে সাশ্রয়ী (৭০ হাজার টাকা), অর্ধ টন ধান শুকাতে ৩-৫ ঘণ্টা সময় লাগে, বারান্দাতেও ব্যবহার করা যায়, ব্যবহার সহজ বিধায় মহিলারা স্বাচ্ছন্দে ব্যবহার করতে পারে এবং সর্বোপরি ২-৩ শতাংশ অপচয়ও রোধ করা যায়। কৃষি উৎপাদনশীলতা বা শ্রম উৎপাদনশীলতা এর উপর ধনাত্মক প্রভাব পড়বে। করোনা মহামারীতে সরকার কৃষিতে বিনিয়োগ করলে তার ধনাত্মক প্রভাব পড়বে শ্রমিকের আয় ও স্বাস্থ্যের উপর। কৃষকের স্বাস্থ্য ভালো থাকলেই তার ধনাত্মক প্রভাব পড়বে কৃষি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের উপর।

বিজ্ঞাপন

(৫) কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার ১৯৬০ সালে শুরু হলেও ১৯৯০ সালের পর যন্ত্রপাতির ব্যবহার ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, পাম্প, থ্রেসার, স্প্রেয়ার, কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপারের ব্যবহার। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের যে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে তা কৃষি উৎপাদন পর্যায়ে সীমিত। যেমন ৭০ শতাংশ জমিতে সেচ দেয়া হচ্ছে ভূ-গর্ভস্থ পাম্প ব্যবহারের মাধ্যমে, ৯৮ শতাংশ জমি প্রস্তুতি করা হচ্ছে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের মাধ্যমে, ৮০ শতাংশ ধান মিলিং করা হচ্ছে অত্যাধুনিক চালকলের মাধ্যমে, ৭০ শতাংশ জমিতে স্প্রেয়ার ব্যবহার কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে। এগুলোর প্রায় সব-ই ধান উৎপাদন কেন্দ্রিক যার ভাল ফলাফল ও পেয়েছি নিঃসন্দেহে। ধান ব্যতিত কৃষির অন্যান্য উপ-খাতে যান্ত্রিকীকরণ তেমনভাবে হয়ে উঠেনি। পোষ্ট-হারভেষ্ট, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে খামার যন্ত্রপাতির ব্যবহার খুবই কম। এ ব্যাপারে ও নীতি-নির্ধারকদেরকে ভাবতে হবে। রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন কখনো উৎপাদক ও ভোক্তার জন্য ভাল ফল বয়ে আনবে না যদি না সে উৎপাদন সঠিকভাবে ঘরে তোলা, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা যায় ও তার মাধ্যমে সময় ও স্থান উপযোগিতা তৈরী করা যায়। শুধু উৎপাদন হলেই হবে না ভোক্তার কাছে গুণগত মান অক্ষুন্ন রেখে পৌঁছাতে না পারলে কৃষক যেমন ন্যায্য মূল্য পাবে না, ভোক্তাও তৃপ্তি সহকারে ভোগ করতে পারবে না। (৬) হাওড় এলাকায় ৭০ শতাংশ ভুর্তকী ও হাওড় ব্যতিত অন্যান্য এলাকায় ৫০ শতাংশ ভুর্তকী দিয়ে কম্বাইন্ড হারভেষ্টার ও রিপার প্রদান করা অত্যন্ত যুগোপযোগী পদক্ষেপ ও যার ফলাফল আমরা দেখছি। হাওড় অঞ্চলে প্রায় ৯৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। কিন্তু কম্বাইন্ড হারভেষ্টার ও রিপারের সঠিক ব্যবহার নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে। ২০ লক্ষ টাকার হারভেষ্টার ভুর্তকী বাদ দিয়ে ৬ লক্ষ টাকা দিয়ে কেনার সুযোগ বড় কৃষক বা এলাকার প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তি ব্যতিত অন্যান্য কৃষকের সাধ্যের বাইরে ভিতর থাকবে না। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ও মাঝারী কৃষকরা পরিসেবা ফি প্রদান সাপেক্ষে সেবা কিনবে। আমাদের কৃষি যান্ত্রিকীকরণের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মেশিন মালিকরা নিজের, প্রতিবেশী কৃষকদের এবং আশেপাশের গ্রামগুলিতে পরিসেবা সরবরাহ করে থাকে, এটা অবশ্যই আশাব্যাঞ্জক, ফি প্রদানের মাধ্যমে সেবা গ্রহণ। কিন্তু এক্ষেত্রে মালিকরা যাতে বেশী ফি নিতে না পারে তার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষক দল বা নতুন কৃষক দল গঠন করে পরিসেবা প্রদান করতে পারে। এ ব্যাপারে মেশিন মালিক ও কৃষকদের মাঝে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রেফারীর ভুমিকা পালন করতে পারে। এ ব্যবস্থা মালিকদের একচেটিয়া ভাবে পরিসেবা ফি নির্ধারণ করা থেকে বিরত রাখবে। যা কৃষকদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।

(৭) কৃষি আধুনিকীকরন ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ পাশাপাশি এগিয়ে যায়। কৃষি আধুনিকীকরণ করে কৃষিকে বাণিজ্যে রুপান্তর করতে হলে অবশ্যই কৃষির সব পর্যায়ে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার কখনই কৃষি শ্রমিকের বেকারত্বের কারণ হবে না। কৃষি আধুনিকীকরনের মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। যেমন কটেজ শিল্প, ধান-চাল থেকে মুড়ি, চিড়া তৈরী, প্যাকেটজাত ও বাজারজাতকরণে প্রচুর কর্মসংস্থান হয়েছে। কৃষির আধুনিকীকরন করতে হলে তার উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত সর্বস্তরেই যান্ত্রিকীকরণ করতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমানে শীতলীকরণ ট্রাক, গুদাম, বরফকল,  স্বাস্থ্যসস্মত ও আধুনিক সুবিধা সম্বলিত বাজার ঘর, ইত্যাদি তৈরী করতে হবে। কেবল উৎপাদন কেন্দ্রিক কৃষি যান্ত্রিকীকরণ “ঘোড়া বিহীন গাড়ী” বা “গাড়ী বিহীন ঘোড়ার মত”।

(৮) কৃষি খামারের আকার মাথায় রেখে স্কেল বান্ধব কৃষি যন্ত্রপাতির উৎপাদন ও তার সর্ভিস সেন্টার আমাদের দেশে গড়ে তুলতে হবে। বড় আকারের যন্ত্রপাতি ক্ষুদ্র আকারের উচ-নীচু জমিতে ব্যবহার অনুপযোগী। যেমন হাওড়ের নীচু এলাকায় কম্বাইন্ড হারভেষ্টার ব্যবহার করা সম্ভব নয়। সরকারী নীতি সহায়তা (যেমন কর ছাড়) প্রদান করার মাধ্যমে বেসরকারী খাতের উদোক্তা তৈরী করা গেলে নতুন নতুন অনেক কর্মসংস্থানও তৈরী হবে। দেশের কয়েকটি অঞ্চলে (যেমন বগুড়া, চুয়াডাঙ্গা, ইত্যাদি) কৃষি যন্ত্রপাতির সার্ভিস সেন্টার গড়ে উঠেছে। সরকারী সহযোগীতায় যাতে বগুড়া, চুয়াডাঙ্গার ন্যায় কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদন, মেরামত ও সার্ভিস সেন্টার দেশের অন্য এলাকাসমুহে গড়ে ঊঠে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

(৯) কৃষি উদোক্তারা সরকারের ঘোষিত ৪ শতাংশ হার সুদে ৫ হাজার কোটি টাকা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩ হাজার কোটি টাকা থেকে ঋণ নিতে পারবে। একজন উদোক্তা সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা ঋণ নিতে পারবে। তবে, যারা ঋণ খেলাপী তারা এ ঋণ পাবে না। এক্ষেত্রে যাতে প্রকৃত কৃষি উদোক্তা ও প্রকৃত কৃষি যন্ত্রপাতির উৎপাদন, মেরামত ও সেবা প্রদানকারী উদোক্তারা ঋণ পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে কৃষি ঋণ নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণ থাকলেও এবার যাতে প্রকৃত কৃিষ উদোক্তারা ঋণ নিয়ে লাভবান হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায়, কৃষি ঋণ ও যান্ত্রিকীকরণের কাঙ্খিত ফল আসবে না। এক্ষেত্রে কৃষি ঋণ কিস্তি ও সুদ জমা দেবার জন্য কমপক্ষে একটি মৌসুম দেয়া যেতে পারে।

(১০) আমাদের দেশে উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন নিড়ানী, থ্রেসার, স্প্রেয়ার ইত্যাদির উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য নীতি সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়কে স্কেল বান্ধব ও সাশ্রয়ী কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনের বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে আর্ন্তজাতিক বাজার নির্ভরতা কমিয়ে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় সাশ্রয় করতে পারবো। করোনা উত্তরকালীন পরবর্তীত বিশ্ব বাজার ব্যবস্থায় (যা ঘটবে বলে অনেকটা অনুমান করা হচ্ছে) নিজেদের বাচিয়ে রাখতে হলে আমাদের নিজেদেরকে নিয়ে ভাবতে হবে। নতুবা ২০০৭-০৮ সালে চাল-ডালের জন্য যেভাবে হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়েছিল সেভাবে ঘুরতে হবে আবারও বিশ্ব বাজারে।

(১১) কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য ৩ হাজার ২ শত কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। আমরা অত্যন্ত আশাবাদী এ প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কৃষি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের জন্য বিভিন্ন এলাকা ভিত্তিক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যে যে স্তরে কৃষি শ্রমিকের স্বল্পতা আছে তা নির্ধারন করে যান্ত্রিকীকরণ করা যেতে পারে। উৎপাদনের (যেমন রোপন, চারা ট্রান্সপ্লাটিং, সার প্রয়োগ, ইত্যাদি) ও বিপণনের (শীতলীকরণ ট্রাক, গুদামঘর, ইত্যাদি) বিভিন্ন স্তরে পর্যায়ক্রমে যান্ত্রিকীকরণ কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমাবে ও সঠিকভাবে বাজারজাতকরন কৃষকদের সরাসরি সহয়তা। এক্ষেত্রে কৃষি যান্ত্রিকীকরনের রোডম্যাপ ২০২১, ২০৩১ ও ২০৪১ অতিদ্রুত অনুমোদন সাপেক্ষে বাস্তবায়ন করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

কৃষি মন্ত্রণালয় এর আগেও কৃষকের পাশে ছিল এখনও জাতির এই দু:সময়ে দ্রুততার সাথে যথাযথ কৃষিযন্ত্র নিয়ে পাশে থাকবে। কৃষিযন্ত্রের যথাযথ ব্যবহারের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি প্রকৌশলীদের বিশেষভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। করোনাকে ভয় নয়, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমই শুধু জয় করা যাবে। পরিশেষে, বলতে চাই কৃষি আমাদের দিচ্ছে, খাদ্য, আয়, কর্মসংস্থান প্রাকৃতিক পরিবেশ ইত্যাদি। কৃষি মাল্টি-ফাংশনাল। কৃষিকে লালন পালন করে ভালভাবে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে, আমরা ভালভাবে বেঁচে থাকব। সুস্বাস্থ্যের জন্য এ করোনাকালীন সময়ে পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন “এক ইঞ্চি জায়গাও খালি রাখা যাবে না’”। তা বাস্তবায়নের জন্য কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ও শ্রমিকের ঘাটতি সমস্যা সমাধানের জন্য সঠিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। করোনা মহামারী আমাদের সে বার্তাই দিয়ে যাচ্ছে।

লেখকবৃন্দ
১. প্রফেসর ড. ইসমত আরা বেগম, প্রধান, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
২. প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, কৃষিব্যবসা ও বিপণন বিভাগ ও পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব এগ্রিবিজনেস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
৩. প্রফেসর ড. চয়ন কুমার সাহা, কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
৪. প্রফেসর ড. মোঃ রমিজ উদ্দিন, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
৫. প্রফেসর ড. মোঃ আবদুল কাদের, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
৬. সুকল্প দাস, অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (এল-আর), কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর, খামারবাড়ী, ঢাকা
৭. সৈয়দ তানভীর আহমেদ, অতিরিক্ত উপ-পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর, নেত্রকোনা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)