চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনা: নমুনা পরীক্ষার সুযোগ তৈরি জরুরী

এই মুহূর্তে ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারছিনা- কাকে বলবো এই জরুরী কথাগুলো। সেদিন খবরে দেখতে পেলাম- মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয়কে এক সাংবাদিক প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, চিকিৎসকদের কি ব্যক্তিগত সুরক্ষার দরকার নেই? জবাবে বললেন- আমার জানা নাই, আমাকে এই ব্যাপারে আর প্রশ্ন করবেন না। তারপরে প্রকাশ্যে মন্ত্রীর আর কোনো বক্তব্য কোথাও দেখিনি।

খবরে দেখলাম স্বাস্থ্যবিষয়ক সংসদীয় কমিটির নিয়মিত সমন্বয় সভাতেও যাননি। আর সচিব মহোদয়তো আরো বেকায়দায়। কোনো এক পুঁচকে কর্মকর্তা সচিবের অজান্তেই চিকিৎসকদের উপর এক নিবর্তনমুলক প্রজ্ঞাপন জারী করেছেন। আমরা বুঝতে পারছি স্বাস্থ্য-মন্ত্রালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থা করোনার প্রভাবে বিপর্যস্ত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে- প্রশাসন এবং পুলিশ বাহিনী একটু বেশী বেপরোয়া। আইন আর প্রজ্ঞাপনের ঢাল বানিয়ে চরম অত্যাচারিত হয়ে উঠছে। আর আমাদের বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ- এই করোনা দুর্যোগে চিকিৎসকদের পক্ষে পর্যাপ্ত ভুমিকা রাখতে পারছে না।

বিজ্ঞাপন

চিকিৎসকদের বিভিন্ন সভা সমিতিতে অসহিঞ্চু আচরণের অভিযোগ বিভিন্ন পত্রিকার খবরে আসছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সেই ১৯৮৬ সাল থেকে অনেককে চিনি। সবাই পেশার পরীক্ষিত এবং অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। আমার দেখা ৮৬-পরবর্তী চিকিৎসকদের সকল আন্দোলন, পেশাজীবী আন্দোলন (কৃষি চিকিৎসক ও প্রকৌশলী), ২৩-ক্যাডার আন্দোলন, সর্বশেষ এরশাদ সরকারের বিতর্কিত স্বাস্থ্যনীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন থেকে স্বৈরাচারী অবৈধ সরকার পতনের আন্দোলনের সফল নায়ক এরা।

বিজ্ঞাপন

এই মুহূর্তে আমাদের সকলের মেধা, শ্রম আর সহনশীল আচরণের সমন্বয়, যাকে বলে Team Sprit একান্ত প্রয়োজন। সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসাবে- এখন আমাদের করোনা রোগী সনাক্তকরণের সুযোগ সুবিধা সম্প্রসারিত করা অত্যন্ত জরুরী। আমি ভাইরাস সনাক্তকরণের জন্য বেশ কিছু সক্ষম প্রতিষ্ঠানের তালিকা উল্লেখ করেছিলাম। যেমন- আইসিডিডিআরবি (ICDDRB), বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ, পুলিশ প্রশাসনের সিআইডি ল্যাবরেটরি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগ (ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত ল্যাবরেটরিসমূহ।

তাছাড়াও সরকারের দুটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান আছে -ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘National Guidelines on Medical Biotechnology 2010’ নামে চলমান প্রকল্প। এই সম্প্রসারনের কিছু উদ্যোগ বিগত ২-৩ দিন যাবত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে দেখতে পাচ্ছি। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন কোম্পানি থেকে করোনা ভাইরাস নির্ণয়ের উপকরন সংগ্রহের খবরও আসছে।

বিজ্ঞাপন

পাশাপাশি বিভিন্ন নির্ণয়-উপকরণের অকার্যকারিতার খবরও দেখতে পাই। তাই যত্রতত্র থেকে উপকরণ সংগ্রহ না করে- সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ পেশাজীবিদের পরামর্শে সংগ্রহ করা উচিত। এই মুহূর্তে আমাদের সক্রিয় রোগী সনাক্ত করা জরুরী। যে পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাসের জেনেতিক উপকরণের উপস্থিতি নির্ণয় করা সম্ভব, কেবলমাত্র সেই পরীক্ষা পদ্ধতি ব্যবহার করে সক্রিয় রোগী সনাক্ত করতে হবে এবং সেই সকল উপকরণ সংগ্রহ করতে হবে।

এই রোগের জীবানু সনাক্তকরনের একমাত্র অনুমোদিত পদ্ধতি হলো- RT-PCR (Reverse Transcription Polymerase chain reaction)। একটি মলিক্যুলার নির্ভর পরীক্ষা, যাহা দ্বারা করোনা ভাইরাসের জেনেতিক উপকরণের উপস্থিতি নির্ণয় করা হয়। কেবল এই পরীক্ষা পদ্ধতি ব্যবহারে রোগ নির্ণয় সর্বত্র গ্রহনযোগ্য, যাকে ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরির ভাষায় গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড (Gold Standard) বলে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ (FDA) এই পরীক্ষার পরিপূরক আরেকটি পরীক্ষার অনুমোদন দিয়েছে। এই অনুমোদিত পদ্ধতিতে ৪৫ মিনিটেই পরীক্ষার ফলাফল পাওয়া যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের সান্যিভেইল-এ অবস্থিত Cepheid নামক কোম্পানী ৩০ মার্চের মধ্যে বাজারজাত করবে।

অত্যন্ত সুখবর হলো, করোনা ভাইরাস নির্ণয়ের এই উপকরন ব্যবহারের উপযোগী যন্ত্র আমাদের দেশে জাতীয় যক্ষ্মারোগ নিয়ন্ত্রন (NTP, National Tuberculosis Control Program) প্রকল্পে বিগত ৪-৫ বছর যাবত ব্যবহৃত হয়ে আসছে। GeneXpert নামক এই যন্ত্রটির সাহায্যে যক্ষ্মারোগের জীবানু সনাক্তকরন করা হয়। পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন দেশে প্রায় ২৩০০০ GeneXpert ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের দেশেও সরকারীভাবে প্রায় ২১৯ টি GeneXpert বিভিন্ন হাসপাতাল এবং টিবি ক্লিনিকে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক বেসরকারী ল্যাবরেটরি এবং এনজিও (NGO) প্রতিষ্ঠানও GeneXpert যক্ষ্মারোগের জীবানু শনাক্তকরণে ব্যবহার করে।

এখনি আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে- করোনা নির্ণয়ের এই পদ্ধতি আমরা ব্যবহার করতে পারি কি না। এই পদ্ধতি অনেকাংশ স্বয়ংক্রিয় এবং সংক্রামণের বা Contamination-এর সম্ভাবনা কম বিধায় ব্যয়বহুল বিশেষায়িত ল্যাবরেটরির প্রয়োজন হবেনা। শুধু বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। আমাদের দেশের বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে নীতি-নির্ধারকদের ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে যতই কালক্ষেপণ হবে- ততই উপকরণ পাওয়া বিলম্বিত হবে।

হয়তো এই উপকরনের জন্য বিশ্বজুড়ে অনেক চাহিদাও থাকবে। যেহেতু আমাদের সকল সন্দেহভাজন রোগীকে করোনা ভাইরাস নির্ণয়ের আওতায় আনা সম্ভব হয় নাই, সেইহেতু করোনা রোগ বিস্তারের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারনা পাওয়া সম্ভব নয়। এই মহামারী কতদিনব্যাপী বিরাজ করবে- তা সঠিকভাবে নির্ণয়ও সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঠিক তথ্য পরিসংখ্যান সরকারের নীতিনির্ধারণে অবশ্যই প্রয়োজন। তবে আমাদের সাধারনের ধারনা- ব্যাপক প্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন। আমরা সকলেই দেখছি করোনার কি ভয়াল আগ্রাসন- চীন, আমেরিকা, ইউরোপজুড়ে। অসহায় আত্মসমর্পণ। তারপরেও আমাদের চাওয়া- সঠিক দিকনির্দেশনা, সঠিক কর্মপরিকল্পনা এবং সর্বোপরি সকল বিভাগের সমন্বিত আন্তরিক প্রয়াস।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)