চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনা দুর্যোগে পুলিশিং

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী গত ২৪ ঘন্টায় বাংলাদেশে ১২০২ জন করোনা রোগী সনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যুবরণ করেছে ১৫ জন। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২০০৬৫ জন এবং করোনায় মোট মৃত্যু হয়েছে ২৯৮ জনের। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্যানুযায়ী জানা যায়, কোভিড-১৯ এ বিশ্বে ৩ লাখ ৩ হাজার ৭০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, একই সঙ্গে সনাক্তের সংখ্যা ৪৫ লাখেরও বেশি এবং করোনায় আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুবরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রে। বৈশ্বিক এ দুর্বিপাকের শিকার হয়ে হতবিহবল পরিস্থিতিতে জীবিকা নয় জীবনের তাগিদে মানুষকে করোনা মোকাবেলায় অস্থিতিশীল সংকটকে অতিক্রম করতে হচ্ছে। করোনা দুর্যোগে বাংলাদেশে সামনের সারির যোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের অগ্রনী ভূমিকা ইতিমধ্যে সকলের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। ঘর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে মানবিক পুলিশিং এর গল্প সবার মুখে মুখে, অনেকেই বলছেন করোনা পরিস্থিতিতে পুলিশকে নতুন করে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন তারা এবং সেটি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবেই।

মানবিক পুলিশের অনন্য উদাহরণ হিসেবে করোনা সংকট মোকাবেলায় পুলিশের বৈচিত্র্যময় ভূমিকাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি, পেশা, লিঙ্গ, সংস্কৃতি, অভিবাসন, অভিগমন ইত্যাদিকে বিবেচনায় না নিয়ে নিরপেক্ষভাবে যখন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা জনগণবান্ধব জনমুখী দায়িত্ব পালনে ব্রতী হয় ঠিক তখনই মানবিক পুলিশিং এর চর্চা অব্যাহতভাবে লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃতঅর্থে পুলিশ বাহিনীর প্রত্যেকটি কাজই মানবিক ও গ্রহণযোগ্য হওয়া বাঞ্ছনীয় কিন্তু বিভিন্ন ধরনের প্রভাব, প্রতিপত্তি, পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক গতি প্রকৃতি প্রভূত কারণে পুলিশরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়ে থাকে। ফলশ্রুতিতে পুলিশ সম্বন্ধে নানা রকমের নেতিবাচক খবরের শিরোনামও পত্রিকার পাতায় মোটা অক্ষরে ছাপা হয়ে থাকে।

বিজ্ঞাপন

পুলিশের গাড়ির জন্য অপেক্ষা অভুক্তদের, করোনায় কর্মহীন চালক হেলপারদের পুলিশের মানবিক সহায়তা, পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের পাশে পুলিশ, করোনা আক্রান্তদের খুঁজে প্রযুক্তির ব্যবহার পুলিশের, করোনা আক্রান্ত গর্ভবতী নারীর পাশে পুলিশ, করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ দাফন করে পুলিশ, করোনা যুদ্ধে জয়ী হয়ে আবারো জনসেবায় যোগদান করল পুলিশ, সাগর পাড়ের অসহায় জেলেদের পাশে পুলিশ, জ্বর নিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা যুবককে হাসপাতালে নিল পুলিশ, হরিজন, কামার ও মুচি সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে পুলিশ, বাড়িভাড়া কমাতে ভাড়াটিয়াদের প্রতি পুলিশের আহবান, ভুট্রা, ধান কাটতে সহযোগিতা করছে পুলিশ- এমন হাজারো ইতিবাচক সংবাদে বাংলাদেশ পুলিশের করোনার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশে পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে/ছিল তার থেকে পরিত্রাণ পেতে মহামারী করোনা যেন মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে পুলিশের ইতিবাচকতা আনয়নে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

পুলিশের ইতিবাচক পরিবর্তন কেন এবং কিভাবে সাধিত হয়েছে তার কার্যকারণ অনুসন্ধানে অনেকগুলো ফ্যাক্টরকে সামনে নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। প্রথমত: পরিস্থিতি আপনাকে বাধ্য করছে; এমন একটা সংকটের সৃষ্টি হয়েছে করোনা পরিস্থিতিতে-অর্থাৎ করোনা পরিস্থিতিতে সার্বিক দিকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণকে বাড়িতে অবস্থান করতে বাধ্য করার জন্য এবং সচেতনতা সৃষ্টিতে পুলিশের বিকল্প নেই বললেই চলে। দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশ পুলিশে নিয়োগ বাণিজ্যের অবসান ঘটায় মেধাবী ও দায়িত্বশীল প্রার্থীদের পুলিশে অন্তর্ভুক্তির কারণে দেশের দুর্যোগ মুহূর্তে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তৃতীয়ত: পুলিশ বাহিনীর জন্য চাহিদা মোতাবেক সরকারের পক্ষ থেকে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ, সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি, চাকুরির সামাজিক মর্যাদা সুসংহত করায় সদস্যরা দেশেপ্রেমে বলীয়ান হয়ে জনমুখী পুলিশিং এ উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। চতুর্থত: পুলিশ বাহিনীতে জবাবদিহীতা ও দায়বদ্ধতার চর্চা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে যার ধরুণ সরকারের পক্ষ থেকে প্রণিত যে কোন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও হুকুমত যথার্থভাবে পালনে ব্রতী হন। বিশেষ করে সরকার ও গণমাধ্যম পুলিশের জবাবদিহীতাকে নানাভাবে পরিমাপ করায় পুলিশের সদস্যরা আরো বেশি সক্রিয় ও সতর্ক অবস্থায় দায়িত্ব পালন করে থাকে। পঞ্চমত: জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পৃক্তায়ন প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে বিভিন্ন রকমের কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে যেমন হ্যালো ওসি, হটলাইন-৯৯৯, ডোর টু ডোর শপ এবং পুলিশও চাচ্ছেন জনগণের সম্পৃক্তায়ন বৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য ও স্বাভাবিক রাখায় অতন্ত্র ভূমিকা পালন করার জন্য। উপর্যুক্ত কারণগুলো সহ অন্যান্য বেশ কিছু কারণে বাংলাদেশ পুলিশের ইতিবাচক পরিবর্তন সকলের নিকট ক্রমান্বয়ে প্রতীয়মান হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

পুলিশকে সাধারণত দু’ ধরনের ভূমিকা পালন করতে হয় বিশেষ করে অপরাধ প্রতিকার ও প্রতিরোধে বাংলাদেশ পুলিশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে এবং স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই বিশেষত বাংলাদেশের প্রত্যেক দুর্যোগে, সংকটে, দুর্বিপাকে, সমস্যায় পুলিশের উপর মানুষের দ্বারস্থ হতে হয় এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক, সকলের জন্য স্বাচ্ছন্দ্য করাবর প্রয়াসে নিরন্তর কাজ করতে হয় পুলিশ বাহিনীকে। স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলে তৎকালিন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। তদুপরি পুলিশকে নিয়ে মুখরোচক সংবাদও দেখা যায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। অথচ পুলিশের ইতিবাচক কাজের সংবাদ তেমন ফলাও করে পরিবেশিত হয় না শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে। তবে এ কথাটি অত্যন্ত সত্য যে পুলিশের ইতিবাচক সংবাদের তুলনায় নেতিবাচক সংবাদকে বিশেষ ফোকাস করে নিউজে পরিবেশন করা হয় জনগণের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য।

পুলিশের দর্শন এবং মূলনীতিকে যদি আলোকপাত করা যায় তাহলে বলতে হবে, পুলিশের মৌলিক কাজ হচ্ছে অপরাধ এবং অনিয়মকে প্রতিহত করা। জনগণের সদিচ্ছার উপর ভিত্তি করে পুলিশিং প্রয়োগ করার বাস্তবসম্মত উদাহরণ তৈরি করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। জনগণের স্বেচ্ছা সহযোগিতা পুলিশের গ্রহণ করা উচিত এবং জনগণকে পুলিশের ন্যায় দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে তার ভিত্তিতে পুলিশ-পাবলিক পার্টনারশিপের মাধ্যমে অপরাধের মাত্রাকে কমিয়ে আনা সহজতর ও সম্ভবপর হবে। কমিউনিটি পুলিশিং এর দর্শনকে ব্যবহার করে সামাজিক অনিয়ম থেকে শুরু করে সহিংস অপরাধের হার এবং মাত্রাকে হ্রাস করে নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণে কাজ করা যেতে পারে । পুলিশের নিজস্ব কর্মদক্ষতা এবং কর্মক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তদুপরি সামষ্টিকভাবে কাজ করা ব্যতীত সার্বিক সফলতা অসম্ভব। অপরাধ এবং অনিয়মের অনুপস্থিতি পুলিশের কর্মদক্ষতাকে প্রমাণে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। কাজেই, পুলিশিং এর দর্শন এবং মূলনীতিকে কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের জন্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাষ্ট্র গঠন করা পুলিশ বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

সকলেই আমরা জানি অপরাধ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পুলিশ বিশেষভাবে করোনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করার নিমিত্তে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। করোনা আক্রান্তদের খুঁজে প্রযুক্তির ব্যবহার পুলিশের শীর্ষক শিরোনাম থেকেই অবগত হওয়া যায়, করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থায় পুলিশের বিশেষ নজর থাকার কারণে পুলিশ বাহিনী নিজ উদ্যোগে হোম কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা, দরিদ্র অসহায় মানুষদের মাঝে খাদ্য সহায়তা প্রদান ইত্যাদি ইতিবাচক ও মানবিক কাজগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সম্পাদন করায় সকলের প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়েছে। সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে প্রভাবশালী, রাজনীতিবিদ প্রত্যেকেই একযোগে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশের ভূমিকাকে ঈর্ষণীয় অবস্থায় গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ সর্বদাই পুলিশের নিকট হতে ইতিবাচক পুলিশিং এর প্রত্যাশা করে থাকে। যে পুলিশিং ব্যবস্থায় এমন কালচার তৈরি করা হবে যেখানে প্রত্যেক সদস্য নতুন একটি পরিবেশে এসে আধুনিক ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থায় জনমুখী পুলিশিং এর চর্চা করবে এবং ফলশ্রুতিতে সেখানে জবাবদিহীতা, দায়বদ্ধতা, নিয়োগ বাণিজ্য রহিতকরণ, অন্যদের হস্তক্ষেপ বন্ধকরণ, ঘুষের প্রচলন বন্ধ করা, যথাযথ প্রক্রিয়ায় পুলিশ সদস্যদের প্রমোশন নিশ্চিত করা, প্ররোচনায় নির্দোষকে অভিযুক্ত হিসেবে সাব্যস্ত করা রদকল্পে যথার্থ দাপ্তরিক ব্যবস্থা গ্রহণই বাংলাদেশের পুলিশের মর্যাদা ও সেবার মানকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)