চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনা ঝুঁকি রেখেই কেন লকডাউন শিথিল?

চীনের সঙ্গে সীমান্ত থাকা সত্ত্বেও ভিয়েতনামে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা নেহায়েতই কম৷ শুরু থেকে কঠোরভাবে লকডাউন দেয়ার ফলে তারা ভাল ফল পেয়েছে। সারাবিশ্বে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও ভিয়েতনামে ঘটেনি ।চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দেশটিতে করোনা শনাক্ত হয়। কিন্তু চার মাস আগে শনাক্ত হলেও দেশটির একটি মানুষও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়নি। তাছাড়া করোনার লক্ষণ নিয়েও কেউ মারা যায়নি। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃতের সংখ্যা সারা পৃৃৃথিবীতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়লেও এখানে ব্যাতিক্রম৷ দেশটিতে ২৭০ জন আক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত কেউ মারা যায়নি । আক্রান্তের মধ্যে ২২২ জন সুস্থ হয়েছেন। আরও একটি ব্যতিক্রমী দেশ লাওস৷ ১৯ জন আক্রান্ত হলেও ৭জন সুস্থ হয়ে ফিরে গেছে৷ এরপর নতুন করে একজনের শরীরেও ঘটেনি সংক্রমণ।

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার একটি ছোট দেশ এই লাওস। চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, বার্মা, কাম্বোডিয়া ঘেরা এই দেশটি। চীন, ভিয়েতনামের মতোই এটি একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ। ১৯৭৫, লাও জনগণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার থেকেই ক্ষমতায় মার্কসবাদী-লেনিনবাদী লাও পিপলস রিভলিউশনারি পার্টি।

বিজ্ঞাপন

করোনায় আক্রান্ত ১৯ জন এর মধ্যে ১৬ জন রাজধানী ভিয়েনতিয়েনের বাসিন্দা। তারা শুরুতেই রাজধানীতে একটি সরকারি হাসপাতালকে করোনায় আক্রান্তদের জন্য নির্দিষ্ট করে ফেলেছিল । ২৪ মার্চ একজনের শরীরে সংক্রমণ দেখা দিলেই সঙ্গে-সঙ্গেই দৈহিক দূরত্ব৷ আর এর সুফল পেয়েছে দেশটি৷কিন্তু বাংলাদেশে কী ঘটছে? সামাজিক দূরত্বের নামে ছড়াচ্ছে নৈকট্য৷ শহর হতে গ্রাম গ্রাম হতে শহর পরে আবার শহর হতে গ্রাম এভাবেই বাড়লো সামাজিক নৈকট্য৷ ঝুঁকিতে পড়লো জনস্বাস্থ্য৷ কী ভূমিকা নিলো স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয়? একের পর এক চিকিৎসকরা আক্রান্ত হচ্ছে৷ দেশব্যাপী চলছে চিকিৎসা সংকট৷ অধিকাংশ চিকিৎসকই চিকিৎসাসেবাদান হতে বিরত রয়েছে নিজের স্বাস্থ্যনিরাপত্তার প্রয়োজনে৷ চিকিৎসকদের স্বাস্থ্যনিরাপত্তার দাবী তুলে ওএসডি হলো একজন চিকিৎসক৷ কারা তাকে ওএসডি করল ও কেন করল?

বিজ্ঞাপন

৩০ মার্চ মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ৩০০টি এন নাইনটি ফাইভ মাস্ক পাঠানো হলে ডা: শহিদ মোহাম্মদ সাদিকুল ইসলাম তার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং ১ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বরাবর চিঠি পাঠান৷ তিনি বলেন এন নাইনটি ফাইভের এসব ভুয়া মাস্ক চিকিৎসকদের চরম ঝুঁকিতে ফেলবে৷ বাস্তবে ঘটলোও তাই৷
দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ঐ মাস্কের মান নিয়ে অভিযোগ আরও আগেই এসেছিল।

খুলনার একটি হাসপাতালও এই অভিযোগ তুলেছিল। কিন্তু কারোর কথায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তখন কর্ণপাত করলোনা। অবশেষে গোয়েন্দা রিপোর্টে বিষয়টির সত্যতা মিললো৷ প্রথম দিকে ২০০ থেকে ২৫০ পিস প্রকৃত ‘এন-৯৫’ মাস্ক সরবরাহ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। পরে দেশে তৈরি নিম্নমানের মাস্ক ‘এন-৯৫’ প্যাকেটে তা সরবরাহ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

অপরিকল্পিত সামাজিক দূরত্বের সাথে স্বাস্থ্যঝুঁকির আরও একটি কারণ হিসাবে সংযুক্ত হল ভুয়া মাস্ক৷ বলা হচ্ছে এই ভুয়া মাস্ক সরবরাহ করেছে এক জামাতী নেতার প্রতিষ্ঠান জেএমআই৷ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ এই জামাতী প্রতিষ্ঠান কিভাবে সরবরাহের দায়িত্ব পেয়ে গেল৷ কারা ও কেন তাকে এই দায়িত্ব পাইয়ে দিল?

এছাড়াও লকডাউন নিয়েও চলছে স্ববিরোধিতা৷ ১৪ দল শরীক ওয়ার্কার্স পার্টি দাবী তুলছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী লকডাউন তুলে দেয়ার পক্ষে সাফাই গাইছেন৷ তারা বলছে,যেখানে নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের অবসান ঘটিয়ে পাঁচ-ছয় সপ্তাহ পর লকডাউন তুলে নিয়েছে, সেখানে সেই উদাহরণ টেনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী লকডাউন তুলে দেয়ার পক্ষে সাফাই গাইছেন।

৩০ এপ্রিল এপ্রিল এক বিবৃতিতে তারা বলেন, বাংলাদেশের করোনাভাইরাস পরিস্থিতি যখন ক্রমাগত জটিল রূপ নিচ্ছে তখন দেশের শিল্প-ব্যবসায়ের মালিকরা তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে জনগণের জীবন ও জীবিকা উভয়কে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ইতোমধ্যে গার্মেন্টস শিল্প মালিকদের চাপে কারখানাগুলো খুলে দেয়া হয়েছে, অন্যদিকে দোকান মালিকরা বিপণিবিতানসমূহ খুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছে৷ তারা বিবৃতি দেয়ার আগে সভাটিও করেছে ভিডিও কলে৷ একটা রাজনৈতিক দল দলীয় সভা করতে পারছেনা৷ ভিডিও কলে করতে হচ্ছে৷ আর সেখানে গার্মেন্টস, বিপনীবিতান কিভাবে খুলে দিতে পারে?

এদিকে গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম গাজীপুর সিটি করপোরেশনের যেসব এলাকায় করোনা সংক্রমণ নেই, সেসব এলাকায় সব মসজিদ মুসল্লিদের স্বাভাবিক প্রবেশের জন্য খুলে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন । ফেসবুকে এক ভিডিওবার্তায় তিনি এ ঘোষণা দেন। মেয়রের এই ঘোষনা কি প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনার সাথে মিললো?এক দেশে দুইরকম রীতি কিভাবে হয়?এভাবে যার যার ইচ্ছাস্বাধীন কথা বললে কি ফল ভাল হবে?এতে কি বিশৃংখলা বাড়বেনা?গাজীপুর কি করোনামুক্ত হয়ে গেলো? বাংলাদেশ কি করোনামুক্ত হয়ে গেল? মেয়র কোন যুক্তিতে এই ঘোষনা দিলেন?মূলত এমন অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তই কি দেশের সংক্রমণ ঝুঁকির মূলে নয়?প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকারী ছুটি ঘোষনা হল৷ ছুটির মেয়াদ বাড়ল৷ গণপরিবহন, ট্রেন অটো সিএনজি বন্ধ হল৷ স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক দলের সভা বন্ধ হল৷ মসজিদের জামাত, জানাযার নামাজ,তারাবীহর নামাজেও নিষেধাজ্ঞা জারী করা হল৷ হাটবাজারে লাঠিপেটা করে মানুষকে সামাজিক দূরত্বে যেতে বাধ্য করা হল৷ সামাজিক দূরত্বের বাজার সৃষ্টি করা হল৷ এমন পরিস্থিতিতে গাজীপুরের মেয়রের এই ঘোষনাকে কী করে যৌক্তিক বলা যায়?

ভিয়েতনাম ও লাওসে এমন দৈশিক বিশৃংখলা ছিলনা বলেই তারা করোনা ঝুঁকি হতে মুক্ত হতে পেরেছে?বাংলাদেশ কি করোনা মুক্ত হয়েছে?নাকি ঘরে ঘরে করোনা ভেকসিন পৌঁছে দেয়া হয়েছে?চিকিৎসকদের সুরক্ষা ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হয়েছে?প্রতি হাসপাতালে পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে?বাস্তবতা কী বলে?অনেকেই মৃত্যুবরন করছে আর মরার পরে জানা গেল তার করোনা হয়েছে৷ বেচারা জীবদ্যশায় জানতে পারলোনা তার মৃত্যুর কারণ৷ লকডাউন কেন দেয়া হল?নিশ্চয়ই করোনা সংক্রমন হতে মানুষকে বাঁচাতে৷ এমন পরিস্থিতিতে গার্মেন্টস গুলো কীভাবে খুলতে পারল৷ এমন বিশৃংখল লকডাউন কি করোনা ঝুঁকি কমাচ্ছে না বাড়াচ্ছে? করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে৷গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা রোগী৷ সুতরাং লকডাউন তুলে দেয়া কি যৌক্তিক?মেয়র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে লকডাউন তুলে দেয়ার পক্ষ নেয়ার কথা উঠছে৷আসলে কতিপয়ের এমন খামখেয়ালীপনার জন্যই করোনা ঝুঁকি কমছে না এটা বললে কি অত্যুক্তি হবে?কেন লকডাউনকে লকডাউনের মত রাখা গেলোনা?করোনার বিপদ কমছেনা এরই মাঝে কথা উঠছে লকডাউন তুলে দেয়ার৷ সবমিলিয়ে এসব কারনেই বাংলাদেশ ভিয়েতনাম ও লাওসের মত হতে পারছেনা৷ অথচ হতে পারাটাই ছিল সময়ের জনদাবী৷ অফিস আদালত ও স্কুল কলেজের ছুটি বেড়েই চলেছে৷ ক্ষতি হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক৷ ভোগান্তিতে জনগণ৷ কিন্তু কমছেনা করোনা ঝুঁকি৷ আর নানামুখী সিদ্ধান্তে তা আরও জটিলতার দিকেই যাচ্ছে৷

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)