চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনা চিকিৎসা: হাজারীর পর এলো ‘ট্রাম্প মেথড‘

করোনাভাইরাস রসাত্মক কোনো বিষয় নয়। এই ভাইরাসকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশ্বকে যেভাবে একের পর এক আঘাত করে চলেছে,  তাতে মনে হচ্ছে এই ভাইরাস স্থায়ী আবাস করতেই এসেছে পৃথিবীতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তেমনটাই আশঙ্কা করে বলেছে, ‘দীর্ঘ পথ চলার জন্যই করোনার আগমন। এটির সংকট আরও বাড়বে। এখনো ভয়াবহ অবস্থা বাকি আছে‘।

করোনা থেকে মুক্তির জন্য বিশ্বব্যাপী অনেক গবেষক ও বিজ্ঞানী প্রতিষেধক আবিষ্কারে উঠেপড়ে লেগেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে প্রায় ৭০টি টিম ভ্যাকসিন আবিষ্কারে কাজ করছে। এছাড়াও ওষুধ আবিষ্কারে কাজ করছে অনেক প্রতিষ্ঠান ও গবেষক।

বিজ্ঞাপন

ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টিম ইতোমধ্যে মানবদেহে ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগও করেছে। এলিসা গ্রানাটো নামক ৩২ বছর বয়স্ক বিজ্ঞানীর দেহে প্রথম এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভ্যাকসিন নিয়েছেন তিনি। যদি ভ্যাকসিন ব্যর্থ হয় তবে এই নারীর মৃত্যু হতে পারে। সবকিছু জেনেই ঝুঁকি নিয়েছেন এই ব্রিটিশ বিজ্ঞানী।

বিজ্ঞাপন

এ যেন মহামারীর বিরুদ্ধে একজন মহাযোদ্ধা। এমন অসংখ্য বীর বিশ্বব্যাপী করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। নিজের পরিবার, বাবা-মা, ভাই-বোনের স্নেহের কথা ভুলে বিশ্ববাসীর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করছেন।

বিশ্বে যখন করোনার বিরুদ্ধে এমন মহাযুদ্ধ চলছে, আর সম্মুখে অনেক যোদ্ধা যুদ্ধে লিপ্ত, তখন কিছু বিজ্ঞানী ও গবেষক অনেক মেথড বা পদ্ধতিও নিয়ে আসছেন। যার অনেকগুলো গুরুত্ববহন করলেও এমন কিছূ সামনে আসছে যা হাস্যকর ও রসাত্মক এবং গবেষক ও বিজ্ঞানীদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করছে।

আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে, কয়েকদিন আগে করোনাভাইরাস নিয়ে হাজির হওয়া হাজারী মেথডের কথা। আওয়ামী লীগের উপদেষ্ঠামন্ডলীর সদস্য জয়নাল হাজারী এক ভিডিও বার্তায় সেদিন করোনা চিকিৎসায় অভিনব এক পদ্ধতি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। যা ফুসফুস কেটে স্যানিটাইজার বা জীবাণুনাশক দিয়ে ধুয়ে-পরিষ্কার করার এক অভিনব ও আজগুবি মেথড বা পদ্ধতি।

ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, “ফুসফুসের উপর বসে আছে ভাইরাসগুলো। এটাকে অপারেশন করে হার্ট যেমন কাটা হয় তেমনি করে কেটে ফুসফুসটাকে বাইরে এনে বা সেখানে রেখে এটার উপর হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ডেটল কিংবা অ্যালকোহল, এমনকি শুধু সাবান দিয়ে এটাকে ধুয়ে দেওয়া হোক।”…

জয়নাল হাজারীর সেই ভিডিও বার্তা বেশিদিন হয়নি। এ নিয়ে বহু ট্রল হয়েছে দেশে ও বিদেশে। তবে তার সেই অভিনব পদ্ধতি প্রকাশের অল্প কিছুদিন যেতে না যেতেই এবার প্রায় একই রকমের আরেকটি পদ্ধতি চলে আসলো পৃথিবীতে।  আর সেটাকে আমরা বলতে পারি ‘ট্রাম্প মেথড‘। কেননা, পরবরর্তী এই মেথডটি এসেছে বিশ্ব পরাশক্তির দেশ আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকেই।

আসল ঘটনাটি বলা যাক। নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন চলছে হোয়াইট হাউসে। সেখানে উপস্থিত করোনা নিয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ ট্রাস্কফোর্সের স্বনামধন্য চিকিৎসক, গবেষক ও বিজ্ঞানী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তো আছেনই।

বৃহস্পতিবার শুরুতে সে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ইউএস হোমল্যান্ড সিকিউরিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান উইলিয়াম ব্রায়ান।

সেখানে ব্রায়ান বললেন, মার্কিন সরকারের গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে,করোনা ভাইরাসটি বাড়ির অভ্যন্তরে এবং শুষ্ক পরিবেশে সবচেয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকে এবং  তাপমাত্রা, আর্দ্রতা বৃদ্ধি ও প্রখর সূর্যের আলোয় এটা দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে সংক্রামক ক্ষমতা হারায়। মানে হলো, সূর্যরশ্মি, তাপ এবং আর্দ্রতার সংস্পর্শে এলে করোনাভাইরাস দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। সরাসরি সূর্যের আলোতে ভাইরাস দ্রুত মারা যায়।

একটু অন্যরকম হলেও এই পর্যন্ত বক্তব্য নিয়ে খুব বেশি অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটলো ব্রায়ানের বক্তব্যের পরপর, যখন সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে উঠলেন  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্রায়ানের বক্তব্যের রেস ধরে তিনি শুরুতে বলেন, অনুসন্ধানগুলো সতর্কতার সাথে ব্যাখ্যা করা উচিত। এর আগেও পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যে, গ্রীষ্মে করোনভাইরাস কমতে পারে। তার সপক্ষে প্রমাণ দরকার।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি একবার উল্লেখ করেছি যে, এটি উত্তাপ এবং আলোয় দূরে যায়। তবে এটার সঠিক প্রমাণ দরকার।

বিজ্ঞাপন

এবার ট্রাম্প এমন এক পদ্ধতির কথা বললেন যা অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য ব্যাপার। তিনি বললেন, ‘এমন কোনো পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায় না যে, করোনা রোগীর শরীরে স্যানিটাইজার বা জীবাণুনাশক ইনজকেশন দিয়ে ফুসফুস পরিষ্কার করা যায়!

তিনি বিষয়টাকে আরও ব্যাখ্যা করে বললেন, “আমি দেখছি যে, জীবাণুনাশ দ্বারা এক মিনিটের মধ্যে ভাইরাস ছিটকে যায়। এমন কোনো উপায় কি নেই যে, জীবাণুনাশক ইনজেকশন দেহের ভেতরে দিয়ে ফুসফুস পরিষ্কার করা যায়? এটি আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে‘।

বক্তব্যের সময় ট্রাম্পকে খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছিলো। মার্কিন করোনা প্রতিরোধ টাস্কফোর্সের বড় বড় গবেষকরা তখন একে অপরের দিকে কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছিলেন। সবাই হয়তো এমন মেথডের কথা শুনে হতবিহ্বল!

মূলত জয়নাল হাজারীর মেথডের সঙ্গে প্রায়ই মিলে গেলেও ট্রাম্পের মেথড অবশ্য কিছুটা ভিন্ন। হাজারী ফুসফুস সরাসরি কেটে বের করে জীবাণুনাশক দিয়ে  সেটা পরিষ্কার করে পুনরায় দেহে স্থাপন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আর ট্রাম্প বলেছেন, শরীরে জীবাণুনাশক ইনজেকশন ঢুকিয়ে ফুসফুস পরিষ্কার করার কথা। সেক্ষেত্রে একটা জায়গায় দুজনের মেথডই সমান, মহান দুজন ব্যক্তিই মানবদেহের ফুসফুসকে ট্রার্গেট করেছেন!

ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে তার এই উদ্ভট মেথডের কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যেতে সময় লাগেনি।গবেষক ও বিজ্ঞানীরা তার বক্তব্যের তীব্র  প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অনেকে অবাক ও বিস্ময়ে ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন।

অধিকাংশ চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী বলেছেন, প্রেসিডেন্টের এমন পদ্ধতি প্রয়োগে মারাত্মক ফলাফল বয়ে আনবে।

মার্কিন পালমোনোলজিস্ট ড. ভিন গুপ্ত বলেছেন, শরীরে যেকোনো ধরণের পরিচ্ছন্ন করার  ইনজেকশন দেওয়ার বা খাওয়ানোর ধারণাটি দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং এটি বিপজ্জনক। এটি এমন একটি সাধারণ পদ্ধতি যখন কেউ নিজেকে হত্যা করতে চায়, তখন ব্যবহার করে থাকে।

পশ্চিম ভার্জিনিয়ার চার্লস্টনের  চিকিৎসক কাশিফ মাহমুদ টুইট করে বলেছেন, চিকিৎসক হিসাবে আমি কোভিড -১৯ এর চিকিৎসার জন্য ফুসফুসে জীবাণুনাশক ইনজেকশন দেওয়ার বা দেহের অভ্যন্তরে ইউভি বিকিরণ ব্যবহার করার পরামর্শ দিতে পারি না।

তিনি বলেন, “ট্রাম্পের কাছ থেকে চিকিৎসা পরামর্শ নেবেন না‘।

জুকারবার্গ সান ফ্রান্সিসকো জেনারেল হাসপাতালের একজন পালমোনোলজিস্ট জন বাল্মস সতর্ক  করে বলেছেন, যে এধরনের চিন্তার প্রয়োগ মারাত্মক ও বিধ্বংসী হবে। এটা সবচেয়ে খারাপ অবস্থা তৈরি করবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে  ভারত থেকে আমদানি করেছিলেন হাইড্রিক্সাইক্লোরোকুইন ড্রাগ।  ম্যালেরিয়ার এই ওষুধটি করোনাভাইরাসের জন্য কাজ করছে শোনার পর তিনি তড়িগড়ি করেই সেটি আমদানি করেন। পরে গবেষকরা দেখেন, করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে যারা এই ওষুধটি সেবন করছেন, তাদের মাঝে মৃত্যুর হার বেশি। উপকার নেই,বরং আরো ক্ষতিকর। পরবর্তী এই ওষুধের ব্যবহার ট্রাম্প বন্ধ করতে বাধ্য হন।

আসল ব্যাপার হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। ভাগ্যগুণে তিনি আজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু এমন সময় তার কপালে জুটেছে করোনার মতো মহামারী। এখন তিনি দিশেহারা। দিশেহারা হয়ে তিনি ধরেছেন জয়নাল হাজারীর পথ। প্রশ্ন জাগছে, দুই লিজেন্ড দুই প্রান্তে বসে কীভাবে একই রকমের পদ্ধতির কথা ভাবতে পারলেন এটাই হলো বিস্ময়! অনেকে হয়তো মজারছলে বললেন, এটাই সায়েন্স! কিন্তু তাদের এই ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি পৃথিবীর জন্য আসলেই হুমকিস্বরূপ।

আমরা চাই, করোনা হুমকির পাশাপাশি পৃথিবীর এমন অযাচিত কিছু হুমকিরও নির্মূল হবে। সুন্দর ও ভালো চিন্তার পৃথিবী এবং ভালো মানুষের একটি পৃথিবী ফিরে আসুক আবারও। প্রকৃতি তার প্রাণ ফিরে পাক নতুনভাবে। আমাদের পৃথিবী হোক উন্নত ও সুন্দর মানুষ এবং প্রকৃতির।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)