চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি চার মাস পর আবারও আক্রান্ত হতে পারেন’

মো. রেজাউল করিম একজন ব্যবসায়ী। ৪০ বয়সী রেজা দীর্ঘদিন করোনাভাইরাস আক্রান্ত ছিলেন। একাধিকবার টেস্টের পরেও তার রিপোর্ট পজেটিভ আসে। পরের বার সেটা নেগেটিভ হয়।

রেজাউলের নিউমোনিয়াসহ ফুসফুসের সংক্রমণ হয়েছিল। সম্প্রতি তিনি মস্তিষ্কে সমস্যা অনুভব করছেন। শারিরীকভাবে খুব বেশী দুর্বলতার পাশাপাশি কোন কিছু মনে রাখতে সমস্যা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় কথা বলতে কষ্ট হয়। আবার ফোনে দীর্ঘ সময় কথা শুনতেও কষ্ট হয়।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন কেউ করোনা আক্রান্ত থাকছেন, কেউবা দ্বিতীয়বারের মতো পজেটিভ হচ্ছেন। কেন রোগী দীর্ঘদিন আক্রান্ত থাকছেন? চ্যানেল আই অনলাইন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন: দ্বিতীয়বার করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দেশে কম, যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের টেস্টের পজেটিভ নেগেটিভের জটিলতার যথার্থতার (অ্যাকুরিসি) জন্য এমনটা হচ্ছেন। পাশাপাশি ভাইরাসের পুরো অংশ মানব দেহে থেকে চলে যায় না, তাই তিন থেকে চার মাস পর তিনি পজেটিভ হতে পারেন। আবার আক্রান্তের দেহে অ্যান্টিবডি দেড় থেকে তিন মাসের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে শক্তিশালী ভাইরাসের ভিন্ন একটি উপাদান তিন-চার মাস পর আবার একই ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারে।

একবার আক্রান্ত হলে ধরে নিতে হবে তিনি সারা জীবনের জন্য নিরাপদ নন
কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা স্থায়ী সে বিষয়টি এখনো গবেষণাধীন জানিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘একবার করোনায় আক্রান্ত হলে ধরে নিতে হবে তিনি সারা জীবনের জন্য নিরাপদ নন। এ জন্য সতর্ক থাকতে হবে সব সময়। যারা আক্রান্ত হয়েছেন এবং যারা আক্রান্ত হননি সবার জন্য একই নিয়ম। শরীরের ব্যাপারে শুদ্ধ শিষ্টাচার মানতে হবে।’

অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ

তিনি বলেন, “শরীর নির্দিষ্ট ভাইরাসের জন্য নির্দিষ্ট প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলে, যাকে বলে ‘অ্যান্টিবডি’। অ্যান্টিবডি ভাইরাসের চারপাশে প্রোটিন বন্ধনী তৈরি করে। ফলে ভাইরাস কোষে ঢুকতে পারে না। অন্যদিকে ‘টি-সেল’ উৎপন্ন করে, যা আক্রান্ত কোষ মেরে ফেলে।’’

‘‘একবার আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হলে তখন করোনার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। শরীরে ইমিউনিটি থাকে বলেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। কিন্তু এই অ্যান্টিবডি কত দিন থাকে তা আমরা নিশ্চিত নই। চার মাসের বেশি হয়তো থাকে না; অর্থাৎ চার মাস পর আবার কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হতে পারে।’’

একই রোগী দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘‘দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, জাপান ও চীনে এমন অনেক রোগী পাওয়া গেছে, যারা একবার কোভিড থেকে সেরে ওঠে আবারও আক্রান্ত হয়েছেন। সংখ্যায় অনেক কম হলেও বাংলাদেশে এমন রোগী পাওয়া যাচ্ছে।’’

বাতাসে রয়েছে করোনাভাইরাসের হাজারটি শক্তিশালী উপাদান
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু বলেন, ‘‘বারবার পরিবর্তিত হয়ে করোনা ভাইরাসটি আরো বেশি শক্তিশালী হচ্ছে। যেহেতু ভাইরাসটি নতুন, এবং ভাইরাসটি সব সময়ই পরিবর্তন হচ্ছে। করোনাভাইরাস প্রচুর শক্তিশালী সুতরাং প্রথমবার ভাইরাসের যে শক্তিশালী দিকটি দিয়ে একজন আক্রান্ত হয়েছেন পরের বার অন্য শক্তিশালী দিক দিয়ে আক্রান্ত হয়ে বেশকিছু সময় লাগবে। সেটা দুই থেকে তিন মাস লাগতে পারে।’’

অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাতাসে ভাইরাসের অনেক শক্তিশালী উপাদান ঘুরছে। একজনের দেহে ভাইরাসের এক উপাদানের মাধ্যমে আক্রান্ত হলে পরের বার তার দেহে ভাইরাসের আরেকটি উপাদান ঢুকে আক্রান্ত হতে পারে। যেহেতু মানব দেহে অ্যান্টিবডি দেড় থেকে তিন মাসের পর আর থাকে না তাই একবার কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই তিন থেকে চারমাস পর ভাইরাসের ভিন্ন একটি উপাদানের মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারেন।’

বিজ্ঞাপন

অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু বলেন, ‘‘সামাজিক দূরত্ব, হিউম্যান ও কমিউনিটি ট্রান্সমিশন, মাস্ক না পরা, যাতায়ত বন্ধ না করাসহ আমরা ইদানিং স্বাস্থ্যবিধি মানছি না। ফলে ভাইরাসটি এক মানুষ থেকে আরেক মানুষে গিয়ে বেঁচে থাকছে। সুতরাং একবার আক্রান্ত হলেই যে আপনি নিরাপদ তা কিন্তু নয়। তাই সব ধরণের সাবধানতা আরও বেশি মানতে হবে।’’

ভাইরাসের কিছু অংশ মানবদেহে থাকার ফলে মাস তিনেক পরেও টেস্ট পজিটিভ আসে
দেশে দ্বিতীয়বার করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা কেমন জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘দেশে দ্বিতীয়বার আক্রান্তের সংখ্যা খুবই কম। যাদের হচ্ছে তারা তিন থেকে চার মাস আগে একবার আক্রান্ত হয়েছিলেন। এটি আমাদের দেশে খুব উল্লেখযোগ্য না। দেশে যেটা উল্লেখযোগ্য তা হলো কেউ কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলে দেড় থেকে দুই মাস পরেও টেস্ট করালে পজেটিভ থেকে যাচ্ছে। এটি হয় ভাইরাসের অবশিষ্ট অংশ শরীরে থেকে যাওয়ার কারণে।’

ডা. লেলিন চৌধুরী

তিনি বলেন, ‘আর্টিফিসিয়্যাল টেস্ট যে পদ্ধতিতে করা হয় তাতে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পজেটিভ যথার্থ হয়। আমাদের দেশে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ টেস্ট পজেটিভ যথার্থ হয়। তার মানে যেটি পজেটিভ আসলো সেটি পজেটিভ কিন্তু যেটা নেগেটিভ সেটা কিন্তু নেগেটিভ না। সেটা দ্বিতীয় ও তৃতীয় টেস্টে পজেটিভ হতে পারে। এই পজেটিভ নেগেটিভ আসা নিয়ে অনেকে মনে করছে দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হয়েছেন। আমরা বেশ কিছু ক্ষেত্রে এমনটা লক্ষ্য করছি। তবে আমরা জানিয়ে দিচ্ছি টেস্টের পজেটিভ নেগেটিভের যে জটিলতা, তার যথার্থতার জন্যই এমনটা হচ্ছে।’

‘‘এটা রোগ হিসেবে ভাবার মতো সেরকম কেস আমরা এখনো পাইনি এবং বৈজ্ঞানিকভাবেও বাংলাদেশে সেটা প্রমাণিত হয়নি,’’ যোগ করেন ডা. লেলিন চৌধুরী।

অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার খান, নিয়মিত কিছু ব্যায়াম করুন
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘একবার কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলে নেগেটিভ রিপোর্ট আসার পরও বেশ কিছুদিন শারীরিক দুর্বলতা থাকে। এই দুর্বলতা কাটাতে অন্য কোনো সমস্যা না থাকলে উচ্চমানের আমিষজাতীয় খাবার বেশি খেতে পারেন।’

‘বেশি বেশি অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার খান। ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’, ‘ই’, বিটা ক্যারোটিন, লাইকোপেন ইত্যাদি সমৃদ্ধ খাবার খান।’

‘সবজির মধ্যে করলা, টমেটো, আলু, ক্যাপসিকাম, ফুলকপি, মটরশুঁটি, ফলের মধ্যে কমলালেবু, পেঁপে, আঙুর, আনার, জলপাই, আনারস ইত্যাদি বেশি খাবেন। গ্রিন টি, লাল চা, আদা চা বেশ উপকারী।’

কমলা লেবুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট জাতীয় উপাদান, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে

তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস ফুসফুসে আক্রমণ করে এর কার্যক্ষমতা কমিয়ে ফেলে। ফলে ফুসফুস বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়বার কোভিড আক্রান্ত হলে এই ফুসফুস মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই নিজেকে চাঙ্গা রাখতে এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত বেশ কিছু ধরনের ব্যায়াম করা দরকার।’

অধ্যাপক ডা. আজাদ বলেন, ‘‘কোভিড থেকে একবার সেরে উঠলেও ফলোআপ চিকিৎসা করাতে হবে ছয় মাস বা তারও বেশি সময়। পরবর্তী জটিলতা এড়াতে, বিশেষ করে যারা কিডনি, লিভার, হার্ট, ডায়াবেটিসের জটিলতায় ভুগছেন তারা নিয়মিত চেকআপ করান।’’

‘‘কিছু বেসিক টেস্ট, যেমন—ব্লাড কাউন্ট, লিভার ফাংশন, কিডনি ফাংশন, বুকের এক্স-রে ইত্যাদি পরীক্ষা করান। দুই মাস পরপর ইসিজি ও ইকো কার্ডিওগ্রাম করে হার্টের অবস্থা জানুন। মনে রাখবেন, অন্য রোগব্যাধি না থাকলে দ্বিতীয়বার আক্রান্তের ঝুঁকি কমে।’’