চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনায় ২০২০ সালে কী উত্থান-পতন হয়েছিল দেশের অর্থনীতিতে?

অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠার প্রত্যয় নিয়ে ২০২০ সালকে বরণ করলেও বিশ্ববাসীর সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে মহামারি করোনাভাইরাস। ফলে চরম অর্থনৈতিক মন্দায় পড়তে হয়েছে সারা বিশ্বকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর মত বাংলাদেশও রেহাই পায়নি করোনার ভয়াল থাবা থেকে। তবু আত্মবিশ্বাস আর সাহস নিয়ে ২০২০ সালের কালো অধ্যায় পার করেছে বাংলাদেশ। এ কারণে রেমিট্যান্সের উপর ভর করে কিছুটা শক্ত ভিত্তির উপর রয়েছে দেশের অর্থনীতি।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়ায় করোনা সংকটেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতি।

বিজ্ঞাপন

বিদায়ী ২০২০ সালে অর্থনীতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই-ই ছিল বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, করোনার মধ্যেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি মোটামুটি ভালো আছে। প্রবৃদ্ধি এখনও ইতিবাচক। এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স।

সাবেক তত্ত্বাবধারক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।
সাবেক তত্ত্বাবধারক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

এ ছাড়া সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজও ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়াতে সাহস যুগিয়েছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

বিজিএমইএর সাবেক একজন সভাপতি বলেন, কম দামের পোশাকের রপ্তানি বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি আছে। তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নতুন করে লকডাউন দেয়ায় শঙ্কাও বাড়ছে। আগামী কয়েক মাসে হয়তো ভাল কিছু হবে না বলে মনে করেন তিনি।

তবে যে রেমিট্যান্সে উপর ভর করে অর্থনীতি শক্ত হচ্ছে সেই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিদেশ থেকে ফিরে এসে আটকে পড়েছেন। নতুন করে যেতেও পারছেন না।

অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, স্বাভাবিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার লোক বিদেশে যেত। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৬ লাখ কর্মী যেত বিদেশে। কিন্তু করোনার কারণে এ বছরের মার্চের পর থেকে কোনো কর্মী বিদেশে যেতে পারেননি। বরং নানা কারণে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এসেছে তারা।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর‌্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কর্মী দেশে ফেরত এসেছেন।

কর্মী যেতে না পারা আর ফিরে আসা দুটো হিসেব করলে দেখা যায় প্রায় ১০ লাখের মত মানুষ বিদেশ যেতে পারেনি।

কিন্তু এরপরও দেশের ইতিহাসে রেকর্ড করেছে প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স। করোনায় বিশ্বের অনেক দেশে রেমিট্যান্স কমলেও বাংলাদেশে উল্টো বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২০ সালে রেমিট্যান্স এসেছে সাড়ে ২১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অথচ ২০১৯ সালে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৮ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ করোনা সংকটেও দেশে এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স আহরণ বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার।

প্রবাসীবাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন, রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেয়ায় এবং করোনার কারণে প্রবাসী শ্রমিকেরা তাদের কাছে অর্থ পুঞ্জিভূত না করে দেশে স্বজনদের পাঠিয়েছেন। এ কারণে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে।

রিজার্ভ ছাড়াল ৪৩ বিলিয়ন ডলার

রেমিট্যান্সের উপর ভর করে রেকর্ড গড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ দশমিক ১৭৩ বিলিয়ন ডলারে। যা পাকিস্তানের দ্বিগুণেরও বেশি।

এই রিজার্ভ দিয়ে প্রতি মাসে ৪ বিলিয়ন ডলার হিসেবে সাড়ে ১০ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা খাতকে সচল রাখতে সরকার ঘোষণা করেছিল সময়োপযোগী প্রণোদনা প্যাকেজ। এতে বড় ক্ষতির মুখ থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের অর্থনীতি।

ব্যবসায়ীদের সাহস যুগিয়েছে প্রণোদনা প্যাকেজ

করোনায় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে- এমন ধারণা নিয়েই সরকার প্রথম ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার একটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এরপর কয়েক ধাপে বেড়ে প্যাকেজের সংখ্যা দাঁড়ায় ২১টিতে। আর প্রণোদনা তহবিলের আকার বেড়ে হয় ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণনির্ভর ৭টি প্যাকেজের অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংক এই তহবিল থেকে ঋণ বিতরণ করছে। স্বল্প সুদে এসব প্যাকেজের তহবিল থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখতে পেরেছেন উদ্যোক্তারা।

এছাড়া আরো ১০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ আসছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার।

ব্যাংকিং খাতে ঘটেছে কয়েকটি আলোচিত ঘটনা

করোনার কারণে অর্থনীতিতে স্থবিরতা কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কম সুদের প্রণোদনা প্যাকেজ ও ঋণ পরিশোধ না করলেও খেলাপি না হওয়ার সুযোগ দেয়া ছিল অন্যতম।

বিজ্ঞাপন

তবে বছর জুড়ে আলোচনার শীর্ষে ছিল এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) আটকে রেখে গুলি করার ঘটনা, এনআরবি গ্লোবাল ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক এমডি প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদারের সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার অর্থপাচারসহ উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা।

এছাড়া দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশে পরিবর্তন করে গভর্নর ফজলে কবিরকে পদে বহাল রাখার ঘটনাও ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

ঋণ খেলাপিদের জন্যও ছিল সুসময়

করেনায় বছরজুড়ে অনেক সুবিধা পেয়েছে ঋণ খেলাপিরা। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়ে দিয়েছে, করোনার কারণে কিস্তি পরিশোধ না করলেও ২০২০ সালে নতুন করে কোনো ঋণখেলাপি হবে না। উল্টো নতুন ঋণ পেয়েছেন অনেকে।

জমজমাট ছিল অনলাইন ব্যবসা

করোনায় অনেকের সর্বনাশ হলেও কারো কারো হয়েছে পৌষ মাস। লকডাউন থাকায় ২/৩ মাসের মত বন্ধ ছিল দোকানপাট। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে বড় বড় শপিংমলগুলো। তবে এ সময় অনলাইন ব্যবসায় ব্যাপক উত্থান হয়েছে।

অনলাইন ব্যবসায়ীদের সগঠন ইক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল শেষে ই-কমার্সের বাজারের আকার বেড়ে হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকার মত, যা গত বছরের প্রায় দ্বিগুণ।

পুঁজিবাজারে উত্থান

২০১০ সালের ধসের পর নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও বহুদিন ধরে মন্দা অবস্থায় ছিল পুঁজিবাজার। মার্চের পর থেকে করোনার কারণে দুই মাসের বেশি সময় বন্ধ ছিল পুঁজিবাজার। এরপর কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে বাজার। মূল্যসূচকের পাশাপাশি বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণও। গত জুনে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ছিল ৪ হাজার পয়েন্টের নিচে। অথচ তা এখন সোয়া ৫ হাজার পয়েন্ট ছাড়িয়ে গেছে। আর লেনদেনও ছাঁড়িয়েছে হাজার কোটি টাকা।

রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ

কোনো সুখবরই ছিল না রপ্তানি আয়ে। দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের দেশগুলোতে করোনার প্রকোপ থাকায় দেশগুলো থেকে বহু ক্রয়াদেশ বাতিল করা হয়েছে। নতুন করেও তেমন ক্রয়াদেশ আসেনি। ফলে ২০২০ সালে বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে রপ্তানি আয়।

ইপিবির তথ্যমতে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রপ্তানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৫৯২ কোটি ৩৫ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে মাত্র ১ শতাংশ বেশি।

জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা স্বস্তি

অন্যান্য দেশের দেশের তুলনায় জিডিপি ছিল ইতিবাচক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছিল, ২০২০ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ৪ দশকি ৯ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। তবে এ সময় বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হলেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ।

তবে কিছুটা নেতিবাচক সংবাদ ছিল কয়েকটি খাতে। যেমন-

রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি

রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে এ বছর বকেয়া রাজস্ব আদায়, মনিটরিং বৃদ্ধি, রাজস্ব ফাঁকি রোধসহ অনেক পদক্ষেপ নিয়েছিল এনবিআর। তবুও ঘাটতির অঙ্ক দুইয়ের ঘরেই ছিল। নভেম্বর মাস শেষে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। কিন্তু গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ।

কমেছে আমদানি

চলতি অর্থবছরের (জুলাই-অক্টোবর) ৪ মাসে পণ্য আমদানি কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ। এ সময় এলসি কমেছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ। উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে মূলধনী যন্ত্রপাতিও।

বেসরকারি ঋণে ছিল পুরোপটুরি ভাটা

দীর্ঘদিন ধরে মন্দায় থাকার পরও বেসরকারি ঋণের গতি আরো কমেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অথচ গত অর্থবছরে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিদেশি বিনিয়োগে খরা

করোনার ধাক্কায় বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৪ মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ৭২ কোটি ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এটি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩১ শতাংশ কম। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ১০৪ কোটি ডলার।