চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনার এই আঁধার কাল, একজন মানস ঘোষ এবং কিছু কথা

এক
করোনা নিয়ে আর সবার মতো আমার ভেতরও কাজ করছে অজানা আতঙ্ক- শঙ্কা আর ভয়। কখন না জানি বিনা দোষে এই জিনিস (নিকট অতীতে এরকম বিনা দোষের এমনতর রাজকপাল আমার ভাগ্যে অনেকবারই উদয় হয়েছে…) আবার আমার ওপর না সওয়ার হয়!

আর রোগশোকের ব্যাপারে আমি বরাবরের মতোই ভীতু টাইপের। পৃথিবীর সব রোগ বুঝি আমাকেই খুঁজছে- এরকম ধারণা আছে আমার।

বিজ্ঞাপন

কয়েকদিন ধরে গলা ব্যাথা, একটু কাশি হয়, জ্বর-টর নেই। পরিচিত ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে আশ্বস্ত হয়েছি- তাদের দেয়া ওষুধ খেয়ে ঠিক আছি। আর বেশি ভীতু থাকার ফল হিসেবে প্রতিদিন গরম পানিতে কয়েকবার গারগল আর ভাপ নেই, লেবুর রস খাই, আদা- লবঙ্গ- দিয়ে গরম পানি, নরমাল পানির বদলে হাল্কা গরম পানি সেবন, জিঙ্ক ট্যাবলেট খাই, ভিটামিন সি যেন লেবেঞ্চুসের বিকল্প- তাতে আমি আশাপ্রদ ভালোই আছি। কিন্তু গলায় একটু ব্যাথা করল কি একটু খুশ খুশ কাশি হলো তাতেই আমি পেরেশান হয়ে যাই, এই বুঝি ‘তিনি’ সওয়ার হলেন আমার ওপর।

মোটের ওপর করোনা নিয়ে আতঙ্কেই ছিলাম।

এর মধ্যে রাত নয়টার দিকে অনুজ সাংবাদিক, প্রিয়ভাজন মানস ঘোষের সঙ্গে এ ব্যাপারে ওর এফবির ইনবক্সে আমার সমস্যার কথা বিস্তারিত জানিয়ে যোগাযোগ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে মানস লিখল: দাদা, একদম চিন্তা করবেন না। সমস্যা হলে যে কোনো সময়েই কল করবেন। সে তার নম্বর পাঠাল।

মানস এটিএন বাংলার বার্তা বিভাগের সিনিয়র নিউজ এডিটর- জানি খুব ব্যস্ত। ফোন করতেই কুশলাদি বিনিময়ের পর মানস বলল, দাদা, করোনার সবচেয়ে বড় ওষুধ হলো এ নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়া, চিন্তিত না হওয়া- বলে আমাকে সে এরপর টানা পনেরো-বিশ মিনিট করোনায় আক্রান্ত এবং এ সংক্রান্ত ওর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আর খুব কাছ থেকে দেখার নানা শিক্ষণীয় সব কথা বলল যা আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো কোনো কথা না বলে শুধু শুনে গেলাম।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে মানস আমাকে জানাল, তাকে প্রতিদিনই নিয়ম করে অফিস করতে হয়। এর মধ্যেও করোনায় আক্রান্ত গণমাধ্যম কর্মী ছাড়াও পরিচিত-অপরিচিতদের জন্য তাকে/তাদেরকে হাসপাতালে ছোটাছুটি করতে হয়। করোনার ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধা ছাড়াও সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়।

আবার দিন শেষে ঘরে ঢোকার আগে ঘরে থাকা মানুষজনের কাছ থেকে নিজেকে এবং তাকে সুরক্ষিত রাখতে কিসব সাবধানতা অবলম্বন করে ঘরে ঢুকতে হয় তার সবই মানস আমাকে সহজ, সাবলীল আর প্রাঞ্জল ভাষায় বুঝিয়ে বলল।

আমি তন্ময় হয়ে মানসের কথা শুনছিলাম- ও যখন আমার সঙ্গে কথা বলছিল আমার তখন মনে হচ্ছিল মানস যেন আমার বহুদিনের পুরনো স্বজন- কাছের মানুষ, আপনজন।

অথচ কে বলবে আজই আমি প্রথমবারের মতো তার সঙ্গে করোনা আতঙ্কে ভীত হয়ে শুধু এ থেকে কিভাবে নিজেকে সাবধানে রাখব- সেই কথা জানতে চেয়ে তাকে ফোন করেছিলাম!

দুই
তিন দশকের বেশি সময়কাল ধরে সাংবাদিকতা করছি। আমি এমন আন্তরিকতা আর ভালোবাসায় মোড়ানো মায়াময় কথা যে দুচারজন অনুজের কাছে শুনেছি সে অনায়াসে তাদের জায়গা দখল করে নিল। মানসের সঙ্গে কথা বলে আমার মধ্যে যে করোনা নিয়ে আতঙ্ক- শঙ্কা কিংবা ভয় ছিল সেটা মুহূর্তের মধ্যে পুরোপুরি উবে গেল না বটে তবে আমার বুকের ভেতর সে যে এক অফুরান শক্তি আর সাহসের আলো বুনে দিয়েছে তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। এই সাহসের পেছনে মানস ঘোষের যৌক্তিক আর আন্তরিক ভালোবাসা মিশ্রিত দায়িত্ব বোধ ছিল। এই দায়িত্ব বোধটাই মানস ঘোষ এবং তাঁর মতো কিছু গণমাধ্যম কর্মী আজ নির্বিকারভাবে এই আঁধার কালে আমার মতো আরও দশজনের বুকের মধ্যে, মনের মধ্যে সেই আশার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন, দিচ্ছেন এবং দেবেন।

করোনার এই আঁধার কালে- মানস ঘোষদের মতো কিছু মানুষের এই দায়িত্ববোধ আর এর আলো ছড়িয়ে পড়ুক দশ দিগন্তে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, সে আলো ছড়িয়ে পড়ে সব খানে…।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)