চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভীতি না থাকাই সংক্রমণ মোকাবেলায় বড় চ্যালেঞ্জ

প্রতিদিনের হিসাবে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার এখন ১২ শতাংশের আশেপাশে।  সংক্রমণের এই হারকে কোনোভাবেই কম আশঙ্কার বলে মনে করছেন না ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা।

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ (সেকেন্ড ওয়েভ) আসার আগে সংক্রমণ কমেছে- এমন দাবি করাও ঠিক হবে না বলে মনে করেন তারা।

বিজ্ঞাপন

সংক্রমণের শুরু থেকেই প্রয়োজনের তুলনায় করোনা টেস্টের সংখ্যাও খুব কম বলে মন্তব্য করে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষ করোনাভীতির বাইরে চলে এসেছে, স্বাস্থ্যবিধি মানছে না।

বিজ্ঞাপন

আর এটাই সংক্রমণ মোকাবেলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে তারা মনে করছেন ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘সংক্রমিত রোগী শনাক্ত করতে না পারলে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। আমাদের দেশে করোনা টেস্টের হার অনেক অনেক কম। এ পর্যন্ত দেশে টেস্টের সংখ্যা এক কোটিও হয়নি।’

‘‘ভারতে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ভারতে জনসংখ্যা বেশী তাই তাদের সংক্রমণ বেশী হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে শনাক্তের বাইরে অনেক রোগী থেকে যাচ্ছে।’’

অধ্যাপক সুলতানা শাহানা বানু মনে করেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ করোনাভীতির বাইরে চলে এসেছে। সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। তাদেরকে স্বাস্থ্য বিধি মানানোর উদ্যোগও নেই তেমন। পরিবহন ব্যবস্থা, বাজার-ঘাট সব কোভিড পরিস্থিতির আগের অবস্থানে চলে গেছে।’

‘‘এখন সিম্পটম ছাড়া অনেক রোগী আছেন। তারা হয়তো করোনা টেস্ট করানোর তাগিদ অনুভব করছেন না। কিন্তু এরাই সংক্রমণ বাড়াচ্ছে বেশী। বেশী বেশী টেস্ট করানো গেলে লক্ষণবিহীন সংক্রমণগুলো শনাক্ত হতো। তাতে সংক্রমণ কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যেতো। কিন্তু এগুলো কিছুই হচ্ছে না।

অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু

করোনাভাইরাসে সংক্রমণের  সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবেলার জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পশ্চিমা দেশগুলো সেকেন্ড ওয়েভ বিষয়ে শঙ্কিত। আমাদেরকেও সতর্ক হতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং অন্যান্য সতর্কতাগুলো অনুসরণের জন্য বেশী বেশী উদ্যোগ নিতে হবে।’

‘‘‘কারোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার বাইরে থেকে গেলে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা যেমন সম্ভব না, তেমনি অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত কেউ করোনা সংক্রমিত হলে তার মৃত্যু ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। করোনা থেকে সেরে ওঠার ক্ষেত্রে রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’’

তার মতে, আগে থেকেই নমুনা পরীক্ষা না হলে এসব রোগীর জটিলতা অনেক বেড়ে যায়। তাদের চিকিৎসাও জটিল হয়ে পড়ে। এসব রোগীকে মৃত্যুর হাত থেকে ফেরানোও সম্ভব হয় না অনেক সময়।

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলামও করোনা সংক্রমণ কমেছে বলে মনে করছেন না।

তিনি বলেন: ২০ আগস্টের পর থেকে সংক্রমণের হার ২০ শতাংশ এর নীচে নেমে এসেছে। সেটা এখন ১২ শতাংশ বা তার আশেপাশে থাকছে। কিন্তু সংক্রমণ আসলেই ১২ শতাংশ সেটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না।

নজরুল ইসলাম বলছেন, যে ক’জনের টেস্ট করা হচ্ছে সেটা সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র পাওয়ার জন্য যথেষ্ট না। স্বাস্থ্য বিভাগ প্রতিদিন যে বুলেটিন প্রকাশ করছে; তাতে প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব না।

প্রকৃত চিত্র পেতে তিনি আরও এক থেকে দেড় সপ্তাহ অপেক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা সংক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ সম্পর্কে যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, সে বিষয়ে খুব সতর্ক থাকতে বলেছেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।

তার মতে, করোনাভাইরাসের প্রবণতা বুঝতে চাইলে লক্ষ করতে হবে যে, ঢাকার মিরপুর, উত্তরা, গুলশান, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডিতে এ শহরের তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ বসবাস করে না। অথচ রাজধানীর বেশীরভাগ সংক্রমণ এই পাঁচ এলাকায়। ধানমন্ডির পাশের এলাকা কলাবাগানে সংক্রমণ অনেক কম। এর কারণ কী খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়েছেন এই ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ।

তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেলো রাজধানীর বস্তিগুলোতে করোনা সংক্রমণ ৬ শতাংশ। বস্তি এলাকার বাইরে সংক্রমণ ৯ শতাংশ। বস্তিতে সংক্রমণ সবচেয়ে কম কেন? সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।

এর সাধারণ ব্যাখ্যায় অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেছেন, মানুষের শরীরে কোনো একটি ভাইরাস অবস্থান করলে নতুন কোনো ভাইরাস প্রবেশ করে না। ভাইরাসের এই প্রবণতার কারণে ধরে নেয়া যায়, বস্তিবাসী মানুষ এমনিতেই নানান অসুখ-বিসুখে ভোগে। তাদের সেসব অসুখের ভাইরাসের কারণে সম্ভবত করোনা সংক্রমণ ঘটাতে পারছে না।

বিষয়টি গবেষণার দাবি রাখে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সংক্রমণের মাত্রা যেমনই হোক বা সেকেন্ড ওয়েভ আসুক কিংবা না আসুক– করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের উপর সবচেয়ে জোর দিয়েছেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।

‘‘মাস্ক পরতে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস ধরে রাখতে হবে। হাঁচি-কাশির সময় নাক মুখ ঢেকে রাখার নীতি মানতে হবে, যতটা পারা যায় সামাজিক দূরত্ব মানতে হবে। ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে পরীক্ষা করে সংক্রমিতদের আলাদা করতে হবে।’’