চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস: সহজ কথা যায় না বলা সহজে

লিখেছেন রাজীব নন্দী, তাসনুভা তাহসিন, জাওয়াদ হোসাইন ও নাঈম উদ্দিন

চলমান করোনাক্রান্তিতে পুরো বিশ্ব টালমাটাল। এক অদৃশ্য ভাইরাসের গ্রাসে পৃথিবীর রীতিনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, জীবনবোধ সবই ‘হুট’ করে বদলে গেলো। করোনাক্রান্তির এই দুঃসময়ে বিশ্বের অধিকাংশ ধর্মীয় উপসনালয়গুলো ইতোমধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

কিন্তু ধর্ম একটি স্পর্শকাতর বিষয়। একে উৎসাহ দেয়া এবং অনুৎসাহিত করা দু’টোই সমাজে বিপদজনক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাই ধর্মীয় বিধিনিষেধের নোটিশ প্রচারে রাষ্ট্রকে হতে হয় অধিকতর সাবধান। সাম্প্রতিক ‘লক ডাউন’ পরিস্থিতিতেও ধর্ম সংক্রান্ত স্পর্শকাতর বার্তা জনতার দরবারে সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না। এই সংক্রান্ত প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে রয়ে যাচ্ছে ফাঁকফোকর। এই ফাঁকফোকর দিয়েই বিস্তৃত হচ্ছে গুজব। গুজব ডেকে আনে হুজুগ, সেই হুজুগে মানুষও বিচার-বিশ্লেষণ না করে প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে দ্বন্দ্ব সংঘাতের মত বিষয়গুলো প্রকট হচ্ছে এই ক্রান্তিলগ্নেও।

বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে মুসল্লিদের ঘরে নামাজ পড়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা জরুরি এক বিজ্ঞপ্তিতে (৬ এপ্রিল ২০২০) জানানো হছে, শুধু মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমরা মসজিদে নামাজ আদায় করবেন। এ সংক্রান্ত এক খবরে জানা গেছে, ‘ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, ভয়ানক করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে মসজিদের ক্ষেত্রে খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা ছাড়া অন্য সব মুসল্লিকে সরকারের পক্ষ থেকে নিজ নিজ বাসায় নামাজ আদায় করতে নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে। জুমার জামাতে অংশগ্রহণের পরিবর্তে ঘরে জোহরের নামাজ আদায়ের নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে। এতে আরও বলা হয়, মসজিদে জামাত চালু রাখার প্রয়োজনে খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা মিলে পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ অনধিক পাঁচ জন এবং জুমার জামাতে অনধিক ১০ জন শরিক হতে পারবেন। বাইরের মুসল্লি মসজিদে জামাতে অংশ নিতে পারবেন না। (সূত্র: করোনা ভাইরাস: মুসল্লিদের ঘরে নামাজ পড়ার নির্দেশ, ৬/৪/২০২০, জনকণ্ঠ)

বিজ্ঞাপন

এই বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায় নোটিশটি শব্দবহুল ও অত্যন্ত ব্যাখামূলক। সাধারণ মানুষ যে বিষয়গুলো ধৈর্য্য নিয়ে নাও পড়তে পারে। তাছাড়া যে বিষয়টি দৃষ্টিকটূ তা হলো এর কঠোরতা। এই নোটিশের ভাষাই এমন, যেখানে কঠোরভাবে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ফলে এই ভাষাভঙ্গী মানুষের মনে বিরুপ প্রতিক্রিয়ারও জন্ম দিতে পারে। ঝামেলার বিষয় হলো এমন কঠোরতামূলক নির্দেশনা মানু্ষকে ‘মিসগাইড’ করে এবং তাতেও ‘গুজব’র সৃষ্টি হয়।

করোনাক্রান্তিতে জনসমাগম এড়াতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও মসজিদ ব্যবহারের একটি নোটিশ দেখা যায়। কলকাতার একটি কলেজের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. উমা শঙ্কর পাণ্ডের হোয়াটসএপ বার্তায় এই নোটিশটি আমাদের হাতে আসে। সেই নোটিশেও পশ্চিমবঙ্গের মসজিদ ব্যবহারে অনুৎসাহিত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

দুই বাংলার সাম্প্রতিক সময়ের দু’টি নোটিশ লক্ষ করা যাক। একটি নোটিশে পশ্চিমবঙ্গের মসজিদসমূহ বন্ধ রাখতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নোটিশটিতে অতি সংক্ষেপে সাবলীলভাবে করণীয় বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে। অত্যন্ত কোমলভাবে এও বলা হয়েছে, ধর্মীয় বিধিনিষেধ পরিবর্তন করতে নয় বরং উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বর্ণনায় এই নির্দেশনার গুরুত্ব সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয়েছে।

আমরা জানি যোগাযোগের অন্যতম একটি সুপরিচিত মাধ্যম এই নোটিশ। সফল যোগাযোগ সম্পন্ন করতে নোটিশে দরকার সুন্দর ও সাবলীল শব্দচয়ন এবং বাক্য গঠন। কোন পণ্য গ্রাহকের কাছে বিক্রি করতে পণ্যটির যেভাবে সুন্দর উপস্থাপন করতে হয়, ঠিক সেভাবে একটি লিখিত বিজ্ঞপ্তিকে শব্দালঙ্কারে সাজিয়ে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। আর বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে যদি হয় ধর্মের মতো স্পর্শকাতর, তাহলে তার উপস্থাপন হতে হবে বিশেষ দক্ষতার প্রয়োগের সাথে। বিশ্ব মহামারীর এই দিনে সকল ধর্মপ্রাণ মানুষেরা যখন নিজ নিজ সৃষ্টিকর্তার উপসনালয়ে উপসনার উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন, তখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার সেখানে ‘সাময়িকভাবে না যাওয়ার’ আহ্বান জানিয়ে প্রেস-বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। আর সেই বিজ্ঞপ্তির ভাষারূপ ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, তারা কতটা বিনয়ী ও নম্রতার সাথে বিষয়টিকে উপস্থাপন করেন। যাদের কাছে এই বার্তাটি সর্বপ্রথম পাঠানো দরকার তাদেরকে উল্লেখ করে অনুরোধের সুরে বক্তব্যটি শুরু করেন। নির্দেশ সূচক কিংবা চাপিয়ে দেয়ার মত করে তুলে ধরা হয়নি। যেটি বিজ্ঞপ্তিটিতে ব্যবহৃত যোগাযোগ কৌশল এর অন্যতম একটি দিক। এবং পরবর্তীতে তারা এটি উল্লেখ করেন যে ঘোষণাটি সাময়িকের জন্য। আবেগপ্রবণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধর্মের হুকুম-আহকাম পরিবর্তন করার জন্য নয় এবং সেই আহকামগুলোর স্থায়িত্ব যে সৃষ্টির শেষ অব্দি বলবৎ থাকবে তা লিখে তাদের বিশ্বাসের জায়গাটিকে শক্ত করেন। সাথে সাথে আসন্ন রমজানেযাতে করে সুস্থ শরীরে রোজা পালন করতে পারেন তার জন্য প্রস্তুতির কথা বলে পাঠকদের মধ্যে সুন্দর সময়ের আগমনী বার্তা পৌঁছে দেন।

শুধু মসজিদে জুমার নামাজের ভিড় নয়, অপরাপর ধর্মের অনুসারীরাও এই প্রবণতা থেকে মুক্ত নয়। যেমন: ‘লোক সমাগমে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা উপেক্ষা করে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে অষ্টমীর স্নানে অংশ নিয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীর কয়েক হাজার পুণ্যার্থী। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে সমবেত হয়ে স্নানে অংশ নেন তারা। একই সঙ্গে ওই স্থানে বসেছে মেলা।’ (চিলমারীতে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অষ্টমীর স্নান, দেশ রূপান্তর, ২/৪/২০২০)

করোনা পরিস্থিতে এ পর্যন্ত বিশ্বে এ রোগের কোনো প্রতিষেধক বা চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি। তাই এখন আমাদের করণীয় হলো রোগটির ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো। এজন্য বলা হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে। সরকার ইতোমধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পাশাপাশি সমস্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারের। জনসমাগম ঘটে এমন যায়গাগুলোতে মানুষকে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে বারবার। তবে অনেক ধর্মপ্রাণ মুসল্লি করোনার ভয়াবহতা উপলদ্ধি করতে না পেরে এখনো মসজিদে জামায়াতে নামায আদায় করছেন। তাই সরকার একটি নোটিশের মাধ্যমে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জামায়াতে অনধিক ৫ জন এবং জুমার নামাযে ১০ জনের উপস্থিতি নির্ধারিত করে দিয়েছেন। তবে নোটিশের ভাষা আরেকটু নমনীয় হলে জনমনে এর গ্রহণযোগ্যতা বেশি হতো। জোরপূর্বক গ্রহণ করানো আর আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করানোর মধ্যে ফারাক আছে। যেহেতু ধর্ম যায়গাটা স্পর্শকাতর। সবাই কিভাবে গ্রহণ করবে সে ব্যাপারে দৃষ্টি দেওয়া হয়নি। নির্দেশনার পরিবর্তে অনুরধের সূরে বলা যেত। অন্যদিকে যে ৫ জন ১০ জন উপস্থিত হওয়া যাবে সেটি কারা নির্ধারণ করবে? এ নিয়ে বিপত্তি ঘটার সম্ভবনা রয়েছে। আমরা মনে করি, এমন পরিস্থিতি ঘরেই নামায পরা উত্তম। কেননা করোনাতে মৃত্যু ঝুঁকির পাশাপাশি পরিবার এবং প্রতিবেশির ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে নিজের জান বাঁচানো ফরয আর মসজিদে জামাতে নামায আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা এবং অপরের ক্ষতি হয় এমন কার্যকলাপ ইসলাম সমর্থন করে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, তোমরা নিজেদের কারণে ধ্বংসের মুখে পতিত হইয়ো না (সূরা বাক্বারা– ১৯৫)। এ আয়াত থেকে অনুধাবন করা যায় কোনো ব্যক্তি নিজের সুরক্ষার জন্য ঘরেই নামায আদায় করতে পারবে। কেননা মসজিদ থেকে যদি রোগের সংক্রমণ ঘটে তাহলে সে নিজের এবং সমাজেরই ক্ষতি করল।

ধর্মকে বলা হয়, ‘নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাস’ বা ‘জীবনে ধারণ করা যায় যা’। কিন্তু জীবনেই যখন হুমকির মুখে তখনও মানুষ ভুল করে যাচ্ছে। সুতরাং যে বিষয়গুলোতে জনস্বার্থ সম্পর্কিত নির্দেশনা দেয়া হয় সে বিষয়গুলো উপস্থাপনা পদ্ধতিও ‘সহজে পালনযোগ্য’ করে ব্যাখ্যা করা জরুরি। এক্ষেত্রে নোটিশে উপস্থাপিত তথ্যের যথাযথ উপস্থাপন ও তা গ্রহণযোগ্য তথা পালনযোগ্য করে ব্যাখ্যা দেয়া আবশ্যক। একটি সরকারি বা জনবিজ্ঞপ্তিতে বর্ণিত তথ্যদি যদি নির্দেশার্থে ব্যবহৃত হয় তাহলেও এর ভাষা, উপস্থাপন শৈলী হওয়া চায় সর্বজনগ্রাহ্য। যদি এসব নির্দেশনা হয় ধর্ম-সংক্রান্ত তাহলে তা কোমলভাবে উপস্থাপনের কোন বিকল্প নেই। নোটিশে বর্ণিত নির্দেশনার যথার্থতা কোথায় তাও স্পষ্ট হওয়া জরুরি। সংক্ষেপে ও সাবলীলভাবে নির্দেশনা আরোপ করলে তার গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ে। একটি দীর্ঘ নোটিশ পাঠককে একঘেয়েমি করে ফেলতে পারে, অতিরিক্ত বিশ্লেষণমূলক নোটিশও খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পায়না। তাছাড়া নির্দেশনামূলক নোটিশে কঠোরতা আরোপ নোটিশটির দুর্বলতাই প্রকাশ করে৷ সুতরাং এটা বলা যায় যে এহন পরিস্থিতিতে সংক্ষীপ্ত, সাবলীল ও কোমলভাবে উপস্থাপনীয় নোটিশই অধিক ফলপ্রসূ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)