চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস: মূক ও বধিরদের জন্য ‘স্বচ্ছ মাস্ক‘

কোভিড-১৯ করোনাভাইরাস মহামারীর সময় স্বাস্থ্যবিধির অন্যতম উপকরণ ফেস মাস্ক বা মুখোশ। মাস্ক প্রত্যেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সকল কাজের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। করোনার ঝুঁকি এড়াতে  মানুষ নিজ ঘরে, হাসপাতালে, সুপারমার্কেট যেখানেই কাজ করুন না কেন মাস্ক পরতে হচ্ছে। এতে করে দেখা যাচ্ছে না ঠোঁট, কিংবা তার কম্পন। ফলে বাজার-দোকানে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বধির কিংবা শ্রবণ-সমস্যায় যারা আক্রান্ত তারা পারছে না লিপ-রিডিং এর সুবিধা নিতে।

মূলত মূক এবং বধিরদের ক্ষেত্রে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ‘সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ’ আর ‘লিপ রিডিং’। তাঁদের অনেকটাই নির্ভর করতে হয় ‘লিপ রিডিং’-এর উপর। মানুষটি কী বলছেন, তা তারা ঠোঁটের ওঠানামা দেখে বুঝে নেন।

বিজ্ঞাপন

‘আপনি সম্ভবত ফরাসি ভাষায় কথা বলতে পারেন। মাস্ক পরা থাকলে আমি তা বুঝতে পারি না‘-বলছিলেন যুক্তরাজ্যের শিশু বিষয়ক চিকিৎসক ফিজ ইজাগারেন, যিনি দু’বছর বয়স থেকেই বধির।

বিজ্ঞাপন

‘যখন কেউ মাস্ক পরে আমি তার মুখের ভাষা পড়তে পারি না। তবে দুয়েকটি শব্দ এলোমেলোভাবে শুনতে পাই। যার কোনো অর্থ হয় না। যখন কেউ মাস্ক পরেন তখন আমি ঠোঁট ও মুখের ভাষা পড়তে পারি না। কাজেই বাক্য গঠনের মূল বিষয়গুলো আমি হারিয়ে ফেলছি‘-বলছিলেন তিনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী বিশ্বের ৪৬৬ মিলিয়ন লোক মূক ও শ্রবণ সমস্যাজনিত কারণে ভুগছে। যাদের জন্য প্রচলিত স্ট্যান্ডার্ড যেসব মাস্ক ব্যবহৃত হচ্ছে তা কার্যকর ও উপযোগী নয়।

এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প উদ্যোগ নিয়ে চলছে একাধিক প্রয়াস। দাতব্য সংস্থা এবং নির্মাতারা সবাই মিলে একটি নতুন রকমের সমাধান নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

বিবিসি বলছে, মেইন ডানস লা মেইন (হ্যান্ড ইন হ্যান্ড), এমনই একটি সংস্থা যা উত্তর ফ্রান্সের শেভেরিয়াসে অবস্থিত, যারা মূক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের সমর্থন করে ট্রান্সপারেন্ট মাস্ক বা স্বচ্ছ মুখোশ ডিজাইন করেছে।  ট্রান্সপারেন্ট এই মাস্ক পরলে ঠোঁট ও মুখ পরিষ্কার দেখা যায়।

এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন কেলি মোরেলন ও তার মা সিলভি। দুজনে মিলে নাক ঢাকা এবং মুখ ও ঠোঁট দৃশ্যমান করে তোলা এমন একটি মাস্কের ডিজাইন করেছেন, যা  সংক্রমণ এড়াতে পারে আবার যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহায়ক।

তারা বলছেন, এই মাস্ক পরে কথা বললে মুখের ভাষা স্পষ্ট পড়তে সক্ষম হবে বধির ও শ্রবণশক্তিহীনরা।  এতে করে লিপ রিডিং এর কোনো সমস্যা থাকে না। মূক-বধিরদের যোগাযোগ সমস্যার অনেকটাই সুরাহা হবে তাতে।

কেলি বিবিসিকে বলেছেন, এই মাস্কের মূল লক্ষ্য হলো বধির ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী লোকদের কারও সাথে কথা বলার সময় ঠোঁট পড়ার সুযোগ দেওয়া। এই মাস্ক অটিস্টিক ব্যক্তি, অক্ষরজ্ঞানহীন এবং শিশুদের ভীতি এড়াতেও উপযুক্ত হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হবে।

‘যেকোনো অবস্থায় এই স্বচ্ছ মুখোশ আপনাকে একে অপরের হাসি দেখতে সহায়তা করবে এবং দুঃখের সময়ে মানুষের ভাব বোঝার জন্যও সহায়ক হবে‘।

বিজ্ঞাপন

যদিও কেলি এবং তার মা এখনো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তাদের এই মাস্ক তৈরি করতে পারছেন না। তবে তারা লোকজন কীভাবে তাদের নিজেদের মাস্ক তৈরি করতে পারে সে সম্পর্কে পরামর্শ দিচ্ছেন এবং অনলাইনে একাধিক নির্দেশিকা সাহায্যের জন্য আছে।

তারা বলছেন, আমরা দেখছি স্বাভাবিক মাস্কগুলো সমাজের একটা শ্রেণির মানুষকে অসহায়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই এমন উদ্যো।

মূলত যখন তারা মূক ও শ্রবণশক্তি রোগীদের সাথে কথা বলছেন তখন তা পরিধান করছেন এবং স্টাফদের সরবরাহ করা হচ্ছে। সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ দোভাষী, যারা আরও জটিল ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ লক্ষণ তৈরি করতে দেহের গতিবিধির পাশাপাশি মুখের ভাব এবং ঠোঁটের নড়াচড়া ব্যবহার করেন তাদের জন্য এটা উপযুক্ত হয়ে দেখা দিচ্ছে।

ডা. চেরি ব্লাউয়েট , যিনি প্রতিবন্ধী টাস্ক ফোর্সের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ব্রিগহ্যামে, তিনি বলছেন, কোভিড-১৯ আসার পর পিপিইর অতিরিক্ত ব্যবহার যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে, ফলে অনেকের জন্য এটি চ্যালেঞ্জ।

“তবে স্বচ্ছ মুখোশ দিয়ে আমরা রোগীদের কাছ থেকে দারুণ প্রতিক্রিয়া পেয়েছি এবং আমরা হাসপাতালের অন্যান্য অংশ, বিশেষত শিশুরোগ সংক্রান্ত কেবিন থেকে বেশি পরিমাণ সাড়া পাচ্ছি- এধরনের মাস্কের ব্যবহারে।

যদিও যুক্তরাজ্যে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা এখনো হাসপাতালে এমন মাস্ক সরবরাহ করছে না।

যুক্তরাজ্যের সারে ফ্রিম্লি পার্ক হাসপাতালের শিশুরোগ বিষয়ক চিকিৎসক ও রেজিস্ট্রার ফিজ ইজাগারেন যিনি নিজেও বধির, তিনি বলেছেন, সাধারণ মাস্কগুলো তাকে রোগীদের যাবতীয় তথ্য মৌখিকভ

লন্ডনে কর্মরত একজন বধির নার্স বিবিসিকে বলেছিলেন যে, একটি অভিজ্ঞতা আছে যেখানে একজন রোগী, যার শ্রবণশক্তি নেই, যখন তিনি কোনো প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করছিলেন তখন তাকে বা তার সহকর্মীদের বুঝতে সক্ষম হননি।

তিনি বলছেন, স্বচ্ছ মাস্ক এক্ষেত্রে আমাদের জন্য সহজ পদ্ধতি‘। এতে করে আমার কাজ আমি নিরাপদে ও যথাযথভাবে করতে সক্ষম হব। অন্যের উপর নির্ভর করার চেয়ে আমার আরও স্বাধীনতা থাকতে হবে।

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে প্রত্যেকের জন্য এই মাস্ক উপযুক্ত হতে পারে। ট্যাক্সি চালক বা এমনকি শিক্ষকদের মতো অন্যান্য পেশাগুলিও এই স্বচ্ছ মুখোশ কার্যকর বলে মনে করতে পারে।

মূলত প্রথমে মূক ও বধির সম্প্রদায়ের জন্য ডিজাইন করা হলেও এই মাস্ক প্রত্যেকের জীবনের জন্য কার্যকর হয়ে উঠছে।