চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস: ভিআইপিদের সেবা এবং আমাদের বিবেকের বৈকল্য

গত দু’মাস ধরে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত যে শব্দটি আমাদের মনটাকে সারাক্ষণ আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তা হচ্ছে ‘নোভেল করোনা’ নামক এক প্রাণঘাতী ভাইরাস। সারা পৃথিবী আজ করোনার কারণে আতঙ্কিত,আক্রান্ত। এই লেখাটি যখন লিখছি, তখনই এই ভয়ালব্যাধির ছোবলে পৃথিবী থেকে অকালে ঝড়ে গেছে প্রায় পৌনে দুই লক্ষ মানুষের প্রাণ। বাংলাদেশ থেকে শতাধিক। প্রতিদিনই দীর্ঘায়িত হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।

করোনা এমনই এক ভয়াল মহামারী যার তাণ্ডবে কাঁপছে সারা বিশ্ব আর বাংলাদেশেও এর প্রকোপ বাড়ছে দিন দিন।মানুষ আজ আতঙ্কিত,সন্ত্রস্ত এবং ঘরে বন্দী। অভাবের তাড়নায় দিশেহারা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠী। চারিদিকে শুধু চাপা আতংক আর দীর্ঘশ্বাস। করোনার চিকিৎসা সেবা দিতে ইউরোপ, আমেরিকার মতো উন্নত রাস্ট্রগুলো পর্যন্ত হিমশিম খাচ্ছে আজ। এতকিছুর মধ্যে হঠাৎই ভিআইপি পরিসেবার নামে স্পেশাল হাসপাতাল প্রস্তুত করা কেন জানি এদেশের সাধারণ মানুষগুলোর অতি সাধারণ জীবনযাপনকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। কারণ সাংবিধানিকভাবেই এ ধরণের বৈষম্য করার অধিকার রাস্ট্রের নেই।

বিজ্ঞাপন

ভিআইপি পরিসেবার নামে কিছু মানুষকে বাড়তি সুবিধা প্রদান, তাদের জন্য আলাদা হাসপাতাল প্রস্তুতকরণ তাই আমাদের সাংবিধানিক চেতনার পরিপন্থী এবং প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার উৎস যে জনগণ সেই ধারনার ব্যত্যয় বলেই প্রতীয়মান হয়। কেননা আমাদের সংবিধানে পরিষ্কারভাবে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে।

খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং শিক্ষা মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার। এই মৌলিক অধিকার সকলের কাম্য। কিন্তু এই মৌলিক অধিকারটুকু অর্জন করতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ (ক) অনুচ্ছেদেও বলা হয়েছে, ‘জনগণের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।’

সুতরাং, চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র সকল নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করবে এটাই সংবিধানের নির্দেশনা। তাছাড়া, শুধুমাত্র এই সংকট মোকাবেলার জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে সেখানে ভিআইপি পরিসেবার নামে কিছু মানুষকে বিশেষ সুবিধা প্রদান রাষ্ট্রের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের বহিঃপ্রকাশ বলে ঠাওর করি।

আমাদের মত উন্নয়নশীল একটা দেশে যেখানে আমাদের এই করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সরকারকে ভর্তুকি গুনতে হবে অজস্র টাকা, যেখানে সাধারণ মানুষকে আইন করে ঘরে রাখতে হয়, সেখানে ভিআইপি পরিসেবার নামে আলাদা হাসপাতাল,আলাদা আইসিইউ রাষ্ট্রের মধ্যে নতুন এক অভিজাত শ্রেণিকে আরও সুবিধা দেবার নামে একটি বিশেষ শ্রেণিকে আরও ভিআইপি ভাবতে সাহায্য করা ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমাদের দেশে ভিআইপি কালচার নতুন কিছু নয়। অন্যকে ডিঙিয়ে আগে ফেরি পার হওয়া থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সব সুযোগ সুবিধায় তাদের অগ্রাধিকার। কিন্তু, সংবিধানের, ২৮ (১) অনুচ্ছেদ বলছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’

সংবিধানের ৭ (১) অনুচ্ছেদ বলছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’

বিজ্ঞাপন

১৯ (১) অনুচ্ছেদ বলছে, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবে।’

সুতরাং, সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং এই জনগণের কোনো উঁচু বা নীচু ভেদাভেদ নেই। এখানেও কিন্তু সংবিধানের লংঙ্ঘন হচ্ছে স্পষ্টভাবে।

বেশ কিছুদিন আগে তিতাস দাস নামে এক ছেলেকে একজন সরকারী কর্মকর্তাকে ভিআইপি প্রোটোকল দেবার জন্য অকালে প্রাণ দিতে হয়েছিল। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার জন্য একটি ফেরি ছাড়তে তিন ঘণ্টা দেরি করায় সংকটাপন্ন এক রোগী অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায়। সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষকে যখন ঢাকায় নেয়া হচ্ছিল, তখন মাদারীপুরের একটি ফেরিঘাটে দীর্ঘসময় আটকে ছিল অ্যাম্বুলেন্সটি। সারাদেশে তখন সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। কারণ, যদি প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ হয় তবে কেন একজন অসুস্থ মৃত্যু পথযাত্রী ব্যক্তিকে ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হবে? ঠিক তেমনি প্রজাতন্ত্রের সকল নাগরিক একই সুবিধা ভোগ করবেন।

সেসময় মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ থেকে একটি রুল জারি করা হয়েছিল, যেখানে উল্লেখ ছিল,

“একমাত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি ব্যতিত সকলেই অনান্য নাগরিকের মত সেবা পাবেন।”

মহামান্য আদালতের এই পর্যবেক্ষণ থেকে তাই বলাই যায় যে , করোনাকালীন এই ভিআইপি সেবা বিবেকের বিকারগ্রস্ততাকেই প্রকটরুপে প্রতীয়মান করে।

এই করেনাকালীন সময়ে যেখানে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে করোনা মোকাবেলা করবার কথা তা না করে এ কার জন্য বিশেষ সুবিধা? রাষ্ট্রের অধিকাংশ লোকের শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক না থাকলে ভিআইপিরা ভাল থাকবেন কি?

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গিকার ছিল বৈষম্যহীন এক সমাজ ব্যবস্থা। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রযন্ত্রের অত্যাচারের প্রতিবাদ আর শোষণ, জুলুমের প্রতিবাদে মানুষ সেদিন অস্ত্র ধরেছিল দেশকে মুক্ত করার জন্য। এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল যেখানে থাকবেনা কোনো ভেদাভেদ, শোষণ, বৈষম্য। কিন্তু,আজ যখন করোনা নামক এক যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করে যাচ্ছি,দল, মত, শ্রেণি, গোষ্ঠীর ভেদাভেদ ছেড়ে করোনা আমাদের জীবনকে গ্রাস করে নিচ্ছে, সেখানে কিছু মানুষ শুধুমাত্র আলাদা সুবিধা, আলাদা সেবা পেতে মরিয়া।আমাদের সক্ষমতার তুলনায় আইসিইউ বা অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়াই হয়ত অদূর ভবিষ্যতে কঠিন হয়ে যাবে সেখানে ভিআইপি প্রোটোকলের নামে বা পরিসেবার নামে এ এক প্রহসন সাধারণ মানুষের সাথে।

সত্যিকার অর্থে সুশাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন রাষ্ট্র তার নাগরিককে প্রকৃত নিরাপত্তা দিতে পারে। তাই, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নয়, বরং সম্মিলিতভাবে করোনার মোকাবেলা করা দরকার।তাই, এই করোনাকালীন সময়ে কাউকে ভিআইপি হিসেবে বিশেষ সুবিধা দেয়া অসাংবিধানিক, সম্পূর্ণভাবে অবৈধ, বৈষম্যমূলক এবং একই সাথে অনৈতিক ও অমানবিক দৃষ্টান্ত। তাই, আলাদা সেবা নয়, বরং সবার জন্য সঠিক এবং সময়োপযোগী সেবা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের মূখ্য দায়। আসুন সকলে সচেতন হই করোনাভাইরাস মোকাবেলায়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)